জ্বালানি তেল চুরি রোধে বহু প্রতীক্ষিত ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন চালুর মাত্র তিন মাসের মাথায় সরকারি মালিকানাধীন যমুনা অয়েল কোম্পানির ফতুল্লা ডিপো থেকে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল গায়েব হয়ে গেছে। মজুত ট্যাংকের ধারণক্ষমতা সনদে (ক্যালিব্রেশন) জালিয়াতির মাধ্যমে অভিনব কৌশলে এই বিপুল পরিমাণ তেল চুরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল চুরির এই ঘটনা পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। গত জুনে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে সরাসরি তেল সরবরাহ শুরু হয়, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার পর্যায়ে চুরি এবং অপচয় রোধ করা। কিন্তু শুরুতেই এমন ঘটনা ঘটায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
যেভাবে ঘটল তেলেসমাতি
যমুনা অয়েল কোম্পানির সূত্রমতে, চুরির মূল কারসাজি করা হয়েছে ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ডিজেল ট্যাংকের ধারণক্ষমতা নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ট্যাংক ব্যবহারের আগে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) থেকে এর ধারণক্ষমতার সনদ নিতে হয়। অভিযোগ, খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স এস এম নুরুল হক’-এর সহায়তায় ২২ নম্বর পুরোনো ট্যাংকটির সনদ নবায়নের সময় এবং ২৩ নম্বর নতুন ট্যাংকটির সনদ তৈরির শুরুতেই কাগজে-কলমে ধারণক্ষমতা কমিয়ে দেখানো হয়।
এর ফলে পাইপলাইন থেকে ট্যাংকে তেল এলেও পরিমাপের সময় কাগজে-কলমে তেল কম দেখা যায়। বাস্তবে যে অতিরিক্ত তেল ট্যাংকে মজুত থাকে, সেটিই ধাপে ধাপে সরিয়ে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সনদে ২২ নম্বর ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ছিল ৭২ লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৭ লিটার। কিন্তু এ বছর নবায়ন করা সনদে একই গভীরতায় ধারণক্ষমতা দেখানো হয়েছে ৭২ লাখ ৮ হাজার ১২৯ লিটার। অর্থাৎ, একটি ট্যাংকেই প্রায় ৫৮ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
এই বিশাল গরমিলের বিষয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস এম নুরুল হকের স্বত্বাধিকারী আন্দালিব বিন হক এটিকে ‘মুদ্রণজনিত ভুল’ হতে পারে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, সক্ষমতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ তারতম্য হতে পারে, যা ৭ হাজার লিটারের মতো। প্রায় ৬০ হাজার লিটার কমার বিষয়টি তিনি নিশ্চিত নন।
তদন্ত কমিটি গঠন ও অনাস্থা
যমুনার অপারেশন বিভাগের চিঠি অনুযায়ী, দুই ধাপে এই তেল ঘাটতি হয়েছে। প্রথম ধাপে (২৪ জুন-৪ জুলাই) ২ লাখ ৬২ হাজার ৮০৪ লিটার এবং দ্বিতীয় ধাপে (১৪-২২ সেপ্টেম্বর) ১ লাখ ১২ হাজার ৬১৪ লিটার।
বিষয়টি নজরে আসার পর যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ একটি ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং ট্যাংক দুটির সক্ষমতা পুনরায় যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে। তবে যমুনারই একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই অভ্যন্তরীণ তদন্ত নিয়ে সন্দিহান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, “নিজেদের চুরি নিজেরাই তদন্ত করলে সত্য কখনো উদ্ঘাটন হবে না। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বা জ্বালানি বিভাগের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি দিয়ে এর অনুসন্ধান করা উচিত।”
এই বিষয়ে কথা বলার জন্য যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরত-ই ইলাহীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দেখেও কোনো উত্তর দেননি।