মহেশখালী ঘিরে সরকারের জ্বালানি পরিকল্পনা আসলে কী?
মহেশখালীতে আরও তিন এলএনজি টার্মিনাল, প্রথমবার হবে স্থলে

দেশে এখন যে গ্যাস জ্বলছে, তার প্রায় প্রতি তিন ঘনফুটের একটির বেশি আসে একটি দ্বীপের সাগর ছুঁয়ে। সেই দ্বীপ কক্সবাজারের মহেশখালী।
সেই দ্বীপেই এবার যুক্ত হচ্ছে আরও তিনটি এলএনজি টার্মিনাল। সব কটি চালু হলে দেশের আমদানি করা গ্যাসের প্রায় পুরো ভারই বইবে এই এক উপজেলা।
রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে মাতারবাড়ী পরিদর্শনে গিয়ে এ পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার। তাঁর নেতৃত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ধলঘাটা, মাতারবাড়ী ও রাজঘাট এলাকা ঘুরে দেখে।
মুখ্য সচিব জানান, মহেশখালীর সমুদ্র উপকূলে একটি এবং মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক আরও দুটি টার্মিনাল হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে কাজ দৃশ্যমান হবে বলে আশা তাঁর।
এক দ্বীপে দেশের গ্যাসের ভার
দেশে বর্তমানে চালু দুটি ভাসমান টার্মিনালের (এফএসআরইউ) দুটিই মহেশখালীর সাগরে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এক দুপুরে টার্মিনাল দুটি থেকে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছিল, যেখানে মোট সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। একই সময়ে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬১ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ জাতীয় সরবরাহের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসছিল মহেশখালী দিয়ে।
অথচ চাহিদা আরও অনেক বেশি। পেট্রোবাংলার হিসাবে দেশে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট, ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি ঘনফুটে। অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় বেশি এলএনজি আমদানিও করা যাচ্ছে না।
এই ঘাটতি মেটাতেই নতুন টার্মিনালের পরিকল্পনা। সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, মহেশখালীর কুতুবজোমের গভীর সাগরে চীনা একটি কোম্পানির সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) প্রস্তাবে নতুন একটি ভাসমান টার্মিনাল হবে, যার প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণে ২৮ জুলাই নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
কুতুবজোম নামটি এতদিন খবরে আসত মূলত লবণচাষের সূত্রে। গত এপ্রিলেও ঝড়বৃষ্টিতে কুতুবজোম ও বড় মহেশখালীর লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এসেছিল। সেই উপকূলের সাগরেই এবার বসছে দেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান টার্মিনাল।
প্রতিমন্ত্রীর তথ্যমতে, নতুন এই টার্মিনালের ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার, যা বিদ্যমান দুটির চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। ২০২৮ সালের মাঝামাঝি থেকে এটি দিনে প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ করতে পারে। বড় জাহাজ ভিড়তে পারায় আমদানি খরচও কমবে। মুখ্য সচিবের দুই বছরের সময়সীমার সঙ্গে এই সময়সূচি মিলে যায়।
মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল আরও বড় পরিসরের। এর দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা হবে অন্তত ১০০ কোটি ঘনফুট, সঙ্গে থাকবে ৫ লাখ থেকে সাড়ে ৭ লাখ ঘনমিটারের মজুতাগার। এটি নির্মিত হবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি)। একই সক্ষমতার দ্বিতীয় স্থলভিত্তিক টার্মিনালটি হবে পরের ধাপে।
কাগজের হিসাবে সব কটি চালু হলে মহেশখালী দিয়ে দৈনিক প্রায় ৩৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আসার সক্ষমতা তৈরি হবে। সেটি দেশের বর্তমান মোট চাহিদার কাছাকাছি।
কেন স্থলে, কেন মজুত জরুরি
একটি দ্বীপের ওপর এত নির্ভরতার ঝুঁকিও আছে। গত ২১ জুলাই এক দুর্ঘটনায় মহেশখালীর একটি ভাসমান টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরতে সময় লাগে প্রায় দুই মাস। সেই সময় গ্যাস রেশনিং করতে হয়েছে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ নানা খাতে।
এখানেই স্থলভিত্তিক টার্মিনালের গুরুত্ব। সাগরে ভাসমান ইউনিট আবহাওয়া ও দুর্ঘটনায় সহজে বন্ধ হয়। স্থলে বড় মজুতাগার থাকলে সংকটের দিনেও কয়েক দিনের গ্যাস হাতে রাখা যায়।
কাজও এগোচ্ছে। পেট্রোবাংলার প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি ২৮ জুন লেনদেন উপদেষ্টা নিয়োগে আগ্রহপত্র আহ্বান করে। সেই দরপ্রস্তাব এখন মূল্যায়নের পর্যায়ে, এরপর ঠিকাদার বাছাই শুরু হবে।
বিকল্প প্রস্তাবও এসেছে। রাশিয়ার নোভাটেকের মধ্যপ্রাচ্য শাখা সাগরতলে স্থাপিত গ্র্যাভিটি-বেসড কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে, যার আনুমানিক খরচ ৯৫ কোটি ডলার। প্রচলিত স্থলভিত্তিক টার্মিনালের খরচ ধরা হচ্ছে প্রায় ১২০ কোটি ডলার। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে তাদের কাঠামো ৩০ থেকে ৩৬ মাসে তৈরি সম্ভব, প্রচলিত টার্মিনালে লাগে ৪৮ থেকে ৬০ মাস। তবে এসব হিসাব প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব, স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।
পাশেই এগোচ্ছে আরও বড় প্রকল্প। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংসদে জানিয়েছেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ২০২৯ সালের মধ্যে চালু হবে। বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র আর গ্যাস টার্মিনাল একসঙ্গে হলে শিল্পকারখানার জন্য পূর্ণ একটি জ্বালানি করিডর তৈরি হবে মাতারবাড়ীতে।
উন্নয়নের পাশে মানুষের ঠিকানা
এত বড় রূপান্তরের কেন্দ্রে আছেন দ্বীপের মানুষ। লবণচাষি, জেলে, পানচাষি। জমি দিয়েছেন অনেকে, সাগরের ভাঙনে ঘর হারিয়েছেন আরও অনেকে।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন সাইরার ডেইল গ্রামে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৬০০ ঘর সাগরে বিলীন হয়েছে। গত জুলাইয়ে টেকসই বেড়িবাঁধ ও বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনের দাবিতে মানববন্ধনও করেন স্থানীয়রা। সেখানে বক্তারা বলেছেন, তাঁরা উন্নয়নের সুফল চান, তবে উন্নয়নের কারণে কেউ গৃহহীন হলে তাঁর দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
এদিনের পরিদর্শনে সেই দাবির জবাবও মিলেছে। মুখ্য সচিব বলেন, “মাতারবাড়িতে বিভিন্ন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা হবে। পাশাপাশি তাদের মধ্যে উপযুক্তদের চাকরিসহ আরও নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।”
এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে অতীতের শিক্ষাও কাজে লাগতে পারে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণের প্রায় ২৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৪ সালে মামলা হয়েছিল, যার বিচার এখনো চলছে। নতুন টার্মিনালের জমি ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ডিজিটাল রাখা গেলে সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়ানো সহজ হবে।
টার্মিনাল পরিচালনায় দরকার হবে দক্ষ টেকনিশিয়ান, নিরাপত্তাকর্মী, নৌযান চালক। এখন থেকেই দ্বীপের তরুণদের প্রশিক্ষণ শুরু হলে দুই বছর পর কাজের সুযোগটা স্থানীয়রাই নিতে পারবেন।
পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ এবং প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মহেশখালী দেশের গ্যাসের দরজা হয়ে উঠছে। সেই দরজার পাশে যাঁরা প্রজন্ম ধরে বাস করছেন, তাঁদের ঘর আর জীবিকা টিকে থাকলেই এই উন্নয়ন পূর্ণতা পাবে।





আপনার মতামত লিখুন