দেশের পুঁজিবাজারে চলমান সংকট ও লাগাতার দরপতনে বিনিয়োগকারীরা ক্রমশ ক্ষোভ ও হতাশার সম্মুখীন হচ্ছেন। গত আড়াই মাসে প্রায় ১৭ শতাংশ সূচক পতনের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের মূলধনও হ্রাস পেয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী শ্রেণির মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা বেড়ে চলেছে।
বিনিয়োগকারীরা দাবি করছেন, বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলছেন।
গতকাল রোববার বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম এক সাক্ষাৎকারে জানান, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটলেও পুঁজিবাজারে তার প্রভাব এখনো দৃশ্যমান হয়নি। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি খাতে উন্নতি হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে এবং বিদেশি বিনিয়োগও পুনরায় আসবে। তবে এই বক্তব্যের মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না থাকার আক্ষেপ রয়ে গেছে।
পুঁজিবাজারের অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘদিনের অনিয়ম
গত ১৫ বছরে ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ঘটে এসেছে। এতে ভালো কোম্পানির অভাব, দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি, অপরাধের সঠিকভাবে তদন্ত না হওয়া, বাজারে কারসাজি করা প্রভৃতি ঘটনা নিয়মিতভাবে ঘটেছে।
এসব অনিয়মের কারণে পুঁজিবাজারের প্রকৃত স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিএসইসি ২০২৩ সালে পুঁজিবাজারে কৃত্রিম ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে যা বাজারের প্রকৃত স্বরূপে পরিবর্তন ঘটায়। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নির্বাচন শেষ হলে বিএসইসি ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয় এবং এরপরই বড় ধরনের দরপতন শুরু হয়।
নতুন সরকারের আগমন ও বিনিয়োগকারীদের আশা
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হারায় পুরনো সরকার এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। বিনিয়োগকারীদের মাঝে আশার সঞ্চার হয় যে, নতুন সরকার ও কমিশন পুঁজিবাজারের নানামুখী সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। নতুন সরকারের শুরুর দিনগুলোতে পুঁজিবাজারের সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
তবে কয়েকদিনের মধ্যেই আবারও বাজারের পতন শুরু হয় এবং বিনিয়োগকারীদের সেই আশার আলো ধীরে ধীরে নিভে যায়। ডিএসইর সূচক ৭৮৬ পয়েন্ট বাড়লেও লাগাতার দরপতনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়ে যেতে থাকে।
টানা দরপতন এবং বিএসইসির তদন্ত কমিটি গঠন
গত কয়েক মাস ধরে পুঁজিবাজারে শতাধিক পয়েন্টেরও বেশি সূচক পতন একাধিকবার দেখা গেছে। গতকাল ডিএসইর সূচক ১৪৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৯৬৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে বিএসইসি গতকাল দরপতনের কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে কারণ অনুসন্ধান এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সুপারিশ প্রদান করতে বলা হয়েছে। পুঁজিবাজারের অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং বাজারে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে কমিটিকে।
বিনিয়োগকারীদের প্রতিবাদ ও রাজপথে আন্দোলন
চলমান দরপতন ও বিএসইসির কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করছেন। চলতি অক্টোবর মাসের শুরু থেকেই বিনিয়োগকারীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
গত ৩ অক্টোবর ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা বিএসইসির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয়। গতকালও মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বিনিয়োগকারীরা মানববন্ধন করে। আজ সোমবার ডিএসইর পুরোনো ভবনের সামনে পুনরায় কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
বাজারের আস্থা ফেরাতে বিভিন্ন অংশীজনের পরামর্শ
অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশেকুর রহমান বলেন, বাজারের আস্থাহীনতা এবং আতঙ্ক থেকেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। মার্জিন ঋণ নিয়ে যারা বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের ফোর্সড সেলের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সহসভাপতি রিয়াদ মতিন বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসেনি এবং কিছু বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়েছে।’
বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
ট্রেজার সিকিউরিটিজের শীর্ষ কর্মকর্তা মোস্তফা মাহবুব উল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যখন বাজার সংকটময় অবস্থায় ছিল, তখন সবাই চুপ ছিল। এখন যখন কিছুটা পরিবর্তন আসছে, তখন সবাই অধৈর্য হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, ব্যাংকিং খাতের কিছু উন্নতি হয়েছে এবং পুঁজিবাজার সংস্কার চলছে। এই সংস্কারের সুফল শিগগিরই পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করেন।
বিএসইসি ও ডিএসইর বক্তব্য
পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থার জন্য ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের ভুল সিদ্ধান্ত ও অনিয়মের ফলাফল। নীতিগত অসংগতিগুলো সমাধান করতে সময় লাগছে।’ তিনি জানান, ব্যক্তিগত করদাতাদের ক্যাপিটাল গেইনের ওপর কর, লেনদেনের ওপর কর ও ব্রোকারেজ হাউসের লোকসান কমানোর বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
বিএসইসির মুখপাত্র রেজাউল করিম বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও তারল্য বৃদ্ধির জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও করব। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী সুবিধার জন্য সুপারিশ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে আইসিবির সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের কাছে আর্থিক বরাদ্দের সুপারিশও করা হয়েছে।’