বাজারে চালের দাম উর্ধ্বমুখী, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি এবং ভারতসহ উজানের দেশগুলো থেকে আসা ঢলে আমন ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে চাল উৎপাদনে প্রায় ৮ লাখ ৩৯ হাজার টন ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) সরকারের কাছে চাল আমদানি সহজ করার জন্য শুল্ক-কর পুরোপুরি তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
চাল বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য। দেশের গরিব মানুষের খাদ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ চালের জন্য ব্যয় হয়। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার এই সময়ে চালের দাম বৃদ্ধি জনগণের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
আমন বাংলাদেশের চাল উৎপাদনের দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অনুসারে, দেশে বছরে প্রায় চার কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে দেড় কোটি টন আমন। সাধারণত তিন সপ্তাহের মধ্যে আমন চাল বাজারে আসা শুরু করে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৬ আগস্ট থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় দুই দফা বন্যায় আট লাখ ৩৯ হাজার টন চাল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে এবারের আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হবে।
খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য ঘাটতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে, এবং যদি দেশের বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগস্ট মাসে ভয়াবহ বন্যার কারণে আমন চাষে যে প্রভাব পড়েছে, তা খুচরা বাজারে চালের দাম বৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খুচরায় প্রতি কেজি চালের দাম ৪ থেকে ৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় আমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল, যা দেশের মোট চালের প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপন্ন করে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সরকারি গুদামে এখন চালের মজুদ ১০ লাখ টনের নিচে চলে এসেছে, যা গত ১৫ আগস্টে ছিল প্রায় ১৪.৫ লাখ টন। সরকারিভাবে বিতরণ বাড়ানোর কারণে এই মজুদ কমে যাচ্ছে, এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন ১০ লাখ টন চাল আমদানি করার প্রয়োজন।
দেশের সরকারের উদ্যোগে খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য চাল আমদানিতে শুল্ক-কর ৬২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে, ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের তুলনায় এ শুল্কও অনেক বেশি। ব্যবসায়ীদের মতে, চাল আমদানি করা হলে তাদেরকে বর্তমান বাজারের দামের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি করতে হবে, যা তাদের জন্য লাভজনক নয়।
এমন পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিসি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুপারিশ করেছে যাতে চালের আমদানি শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়।
বাজার বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, মোটা চাল (ব্রি-১৮ ও পাইজাম) কেজিপ্রতি ৬.৯৬ শতাংশ দাম বেড়ে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এবং চিকন চাল (মিনিকেট ও নাজিরশাইল) কেজিপ্রতি ৪.১৭ শতাংশ বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, ধানের দাম বৃদ্ধি এবং রাইস মিল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণেই চালের দাম বেড়েছে।
এদিকে, কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যদি সরকার সঠিক সময়ে বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ না বাড়ায়, তাহলে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “আমনের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে বাইরের দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করা দরকার। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামে চাল বিক্রি হচ্ছে, আমদানিতে যে শুল্ক রয়েছে এটি দিয়ে ব্যবসায়ীরা লাভ করতে পারবেন না।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বছরে দেশে চার কোটি টনের মতো চাল উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে দেড় কোটি টন আসে আমন থেকে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যে বন্যা হয়েছে, তার প্রভাব খাদ্য নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি হবে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধির এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখন চালের পেছনে চলে যাচ্ছে। গরিব মানুষ যারা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি চরম বিপদের কারণ হতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন না করা হলে, বাংলাদেশে খাদ্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন, যাতে কৃষি খাতকে সমর্থন দিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
তবে, খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, “বন্যার কারণে এবার চাল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। চালের মজুদ বৃদ্ধির বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক হওয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে আমরা চিঠি দিয়েছি। আশা করছি, মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে উদ্যোগী হবে।”
এখন দেখার বিষয় হবে, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং মজুদ বৃদ্ধির জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।