সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

পুরনো পণ্যে নতুন ট্যাগের কারসাজি: চট্টগ্রামের ঈদ বাজারে চলছে প্রতারণা

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

ঈদ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে চট্টগ্রামের বাজারগুলোতে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। পোশাক থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, সবক্ষেত্রেই ক্রেতাদের ঠকানোর নানা ফন্দিফিকির আঁটছে এই অসাধু চক্র। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী পুরনো কাপড়, জুতা, ব্যাগে নতুন ট্যাগ লাগিয়ে সেগুলোকে ‘নতুন কালেকশন’ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। ‘ঈদ কালেকশন’, ‘বিশেষ ছাড়’ জাতীয় চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা।

চট্টগ্রামের কাপড়ের দোকানগুলোতে ‘ফিক্সড প্রাইস’ নামে যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেটি আসলে ক্রেতাদের জন্য একটি ফাঁদ। দোকানদাররা ইচ্ছামতো দাম বসিয়ে দিচ্ছেন, যা বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি। ক্রেতারা দর কষাকষির সুযোগ না পেয়ে বাধ্য হচ্ছেন সেই দামেই পণ্য কিনতে। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ব্যবসায়ীরা আমদানি খরচের কয়েকগুণ বেশি দাম নিচ্ছেন ক্রেতাদের কাছ থেকে। অনেক দোকানে পণ্যের গায়ে দাম লেখা থাকছে না। তার বদলে থাকছে দোকানের নিজস্ব কোড। ফলে ক্রেতারা পণ্যের আসল দাম জানতে পারছেন না, প্রতারিত হচ্ছেন।

চট্টগ্রামের অভিজাত মার্কেটগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। এখানে পণ্যের দাম যেন আকাশছোঁয়া। যে পণ্য পাইকারি বাজারে এক হাজার টাকায় পাওয়া যায়, সেই একই পণ্য অভিজাত মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও চলছে ওজনে কারচুপির মতো ঘটনা।

মাঝে মাঝে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জরিমানা করছে ঠিকই, কিন্তু তাতে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। রিয়াজউদ্দিন বাজারের সেলিম পাঞ্জাবি মিউজিয়ামে অভিযান চালিয়ে পুরনো দেশি পাঞ্জাবিতে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগিয়ে বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা একই ধরনের প্রতারণা করে যাচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, “ব্যবসায়ীদের নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করার কোনো অধিকার নেই। এই অধিকার কেবল উৎপাদক বা আমদানিকারকের। রিয়াজউদ্দিন বাজারের সেলিম পাঞ্জাবি মিউজিয়ামে আমরা অভিযান চালিয়ে দেখেছি, তারা দেশি পাঞ্জাবিতে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগিয়ে বিক্রি করছে। আমদানির কাগজপত্র দেখাতে বললে তারা ব্যর্থ হয়। এমন প্রতারণা বন্ধে আমাদের অভিযান চলবে।”

মিমি সুপার মার্কেটে আসা ক্রেতা সাদ্দাম হোসেন বলেন, “টেরিবাজারে যে থ্রি-পিসের দাম ১৫০০-২০০০ টাকা, এখানে সেই একই জিনিস ৫০০০-৬০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাচ্ছে, দেখার কেউ নেই।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা পাইকারি বাজার থেকে মাল কিনি। এরপর পরিবহন খরচ, দোকানের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন—এসব যোগ করে একটা লাভ রেখে দাম নির্ধারণ করি। তবে, কেউ কেউ হয়তো বেশি লাভ করতে চায়।”

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে নিয়মিত মনিটরিং দরকার। শুধু রমজান বা ঈদকে সামনে রেখে নয়, সারা বছরই বাজার তদারকি করতে হবে। কাপড়ের দাম নির্ধারণের জন্য একটি নীতিমালা থাকা উচিত।”

বস্ত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় থাকলেও, এর দাম নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে অভিযান চালায়, কিন্তু তাতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল আসে না। খাদ্যপণ্যের দাম নির্ধারণে বিএসটিআই-এর ভূমিকা থাকলেও, পোশাকের ক্ষেত্রে তাদের কোনো তৎপরতা নেই।

অভিজাত মার্কেটগুলোতে ‘ফিক্সড প্রাইস’-এর নামে যে প্রতারণা চলছে, তা বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, টেরিবাজার, হকার্স মার্কেটের তুলনায় মিমি সুপার মার্কেট, সানমার শপিং সেন্টারের মতো অভিজাত দোকানগুলোতে একই পণ্যের দাম অনেক বেশি।

এই পরিস্থিতিতে ক্রেতারা প্রশাসনের কাছে বাজার মনিটরিং জোরদার করা, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো কাপড়ের দামও নির্ধারণ এবং ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে, আসন্ন ঈদে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

পুরনো পণ্যে নতুন ট্যাগের কারসাজি: চট্টগ্রামের ঈদ বাজারে চলছে প্রতারণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ মার্চ ২০২৫, ১৫:০৬

ঈদ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে চট্টগ্রামের বাজারগুলোতে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। পোশাক থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, সবক্ষেত্রেই ক্রেতাদের ঠকানোর নানা ফন্দিফিকির আঁটছে এই অসাধু চক্র। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী পুরনো কাপড়, জুতা, ব্যাগে নতুন ট্যাগ লাগিয়ে সেগুলোকে ‘নতুন কালেকশন’ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। ‘ঈদ কালেকশন’, ‘বিশেষ ছাড়’ জাতীয় চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা।

চট্টগ্রামের কাপড়ের দোকানগুলোতে ‘ফিক্সড প্রাইস’ নামে যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেটি আসলে ক্রেতাদের জন্য একটি ফাঁদ। দোকানদাররা ইচ্ছামতো দাম বসিয়ে দিচ্ছেন, যা বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি। ক্রেতারা দর কষাকষির সুযোগ না পেয়ে বাধ্য হচ্ছেন সেই দামেই পণ্য কিনতে। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ব্যবসায়ীরা আমদানি খরচের কয়েকগুণ বেশি দাম নিচ্ছেন ক্রেতাদের কাছ থেকে। অনেক দোকানে পণ্যের গায়ে দাম লেখা থাকছে না। তার বদলে থাকছে দোকানের নিজস্ব কোড। ফলে ক্রেতারা পণ্যের আসল দাম জানতে পারছেন না, প্রতারিত হচ্ছেন।

চট্টগ্রামের অভিজাত মার্কেটগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। এখানে পণ্যের দাম যেন আকাশছোঁয়া। যে পণ্য পাইকারি বাজারে এক হাজার টাকায় পাওয়া যায়, সেই একই পণ্য অভিজাত মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও চলছে ওজনে কারচুপির মতো ঘটনা।

মাঝে মাঝে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জরিমানা করছে ঠিকই, কিন্তু তাতে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। রিয়াজউদ্দিন বাজারের সেলিম পাঞ্জাবি মিউজিয়ামে অভিযান চালিয়ে পুরনো দেশি পাঞ্জাবিতে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগিয়ে বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা একই ধরনের প্রতারণা করে যাচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, “ব্যবসায়ীদের নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করার কোনো অধিকার নেই। এই অধিকার কেবল উৎপাদক বা আমদানিকারকের। রিয়াজউদ্দিন বাজারের সেলিম পাঞ্জাবি মিউজিয়ামে আমরা অভিযান চালিয়ে দেখেছি, তারা দেশি পাঞ্জাবিতে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগিয়ে বিক্রি করছে। আমদানির কাগজপত্র দেখাতে বললে তারা ব্যর্থ হয়। এমন প্রতারণা বন্ধে আমাদের অভিযান চলবে।”

মিমি সুপার মার্কেটে আসা ক্রেতা সাদ্দাম হোসেন বলেন, “টেরিবাজারে যে থ্রি-পিসের দাম ১৫০০-২০০০ টাকা, এখানে সেই একই জিনিস ৫০০০-৬০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাচ্ছে, দেখার কেউ নেই।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা পাইকারি বাজার থেকে মাল কিনি। এরপর পরিবহন খরচ, দোকানের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন—এসব যোগ করে একটা লাভ রেখে দাম নির্ধারণ করি। তবে, কেউ কেউ হয়তো বেশি লাভ করতে চায়।”

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে নিয়মিত মনিটরিং দরকার। শুধু রমজান বা ঈদকে সামনে রেখে নয়, সারা বছরই বাজার তদারকি করতে হবে। কাপড়ের দাম নির্ধারণের জন্য একটি নীতিমালা থাকা উচিত।”

বস্ত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় থাকলেও, এর দাম নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে অভিযান চালায়, কিন্তু তাতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল আসে না। খাদ্যপণ্যের দাম নির্ধারণে বিএসটিআই-এর ভূমিকা থাকলেও, পোশাকের ক্ষেত্রে তাদের কোনো তৎপরতা নেই।

অভিজাত মার্কেটগুলোতে ‘ফিক্সড প্রাইস’-এর নামে যে প্রতারণা চলছে, তা বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, টেরিবাজার, হকার্স মার্কেটের তুলনায় মিমি সুপার মার্কেট, সানমার শপিং সেন্টারের মতো অভিজাত দোকানগুলোতে একই পণ্যের দাম অনেক বেশি।

এই পরিস্থিতিতে ক্রেতারা প্রশাসনের কাছে বাজার মনিটরিং জোরদার করা, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো কাপড়ের দামও নির্ধারণ এবং ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে, আসন্ন ঈদে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।