পর্যটকদের জন্য তৈরি হলরুমে সারি সারি ডেস্ক। প্রতিটি ডেস্কে মনিটর, কি-বোর্ড, মাউস। একপাশে স্তূপ করা প্রায় দুই হাজার আইফোন। সাউন্ডপ্রুফ করা ছয়টি আলাদা কক্ষ। বাইরে থেকে দেখলে সবই স্বাভাবিক মনে হয়—সমুদ্রের পাশে একটি রিসোর্ট। কিন্তু ভেতরে চলছিল অন্য এক অপারেশন।
কক্সবাজারের হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে গত ২৫ আগস্ট অভিযান চালিয়ে এই দৃশ্য দেখতে পায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। রিসোর্টের আড়ালে গড়ে ওঠা এই কম্পিউটার ল্যাব থেকে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছিল বলে ধারণা তদন্তকারীদের।
ভুয়া পরিচয়ে রিসোর্ট দখল
পুলিশ জানায়, চীনা নাগরিক ঝান ইউয়ান ফান ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে চারটি স্থাপনা ভাড়া নেন। মেরিনা বিচ ভিলা ছাড়াও উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লু রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি আবাসিক ভবনও ছিল এই চক্রের দখলে। এসব স্থাপনায় ২৫০ থেকে ৩০০ চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক অবস্থান করছিলেন।
রিসোর্টগুলো ভাড়া নেওয়ার পর পুরোনো ব্যবস্থাপনা বদলে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো হয়। নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যান্য জনবলও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন তাঁরা। মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, নাম-পরিচয় থেকে শুরু করে রিসোর্ট ভাড়া নেওয়া পর্যন্ত সবকিছুতেই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেছেন বিদেশিরা। যেটা আমরা ধরতে পারিনি।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। কিন্তু বাংলাদেশে অবস্থানের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁরা সন্তোষজনক কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
দিনে কম্পিউটার ল্যাব, রাতে আবাসিক হোটেল
তদন্তে উঠে আসে কার্যক্রম পরিচালনার একটি নির্দিষ্ট ছন্দ। মেরিনা বিচ ভিলার কম্পিউটার ল্যাবেই দিনের কাজ সারতেন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা। কাজ শেষে তাঁরা ড্রিম হলিডে, অর্কিড-ব্লু ও ইলিয়াস ব্রাদার্সের আবাসিক ভবনে ফিরে যেতেন।
গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। তবে আগেভাগে সংকেত পেয়ে যান চক্রের সদস্যরা। অভিযানের আগেই তাঁরা পালিয়ে যান। পেছনে রয়ে যায় অপারেশনের পুরো সরঞ্জাম—১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস, ২৪টি কানেকশন বোর্ড এবং কয়েকটি নোট খাতা ও ডায়েরি। পাওয়া যায় গ্রামীণফোন ও রবির সিমও।
এরপর বৃহস্পতিবার রাতে পাঁচ চীনা ও এক তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শুক্রবার বিকেলে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠান। রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়, যেখানে আরও চারজন আসামির নাম উল্লেখ রয়েছে, তবে তাঁরা পলাতক। ৩০০ চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
চীনা দূতাবাসও মানল সংশ্লিষ্টতার কথা
২৬ আগস্ট ঢাকার চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রিসোর্ট পরিদর্শনে আসে। পুলিশের দাবি, দূতাবাসের প্রতিনিধিরা মৌখিকভাবে জানান, সংশ্লিষ্ট চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা প্রতারণা ও অনলাইনভিত্তিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
দুই দিন পর কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) নয় সদস্যের দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তাদের মূল্যায়ন আরও স্পষ্ট—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন, ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা ও আত্মসাতের মতো অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।
দুই হাজার আইফোনের রহস্য এখনও অমীমাংসিত
সব প্রশ্নের কেন্দ্রে এখন একটাই বিষয়—এক হাজার ৯৩৮টি আইফোন কেন, কোন কাজে, কোন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার হতো? মামলার বাদী রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত বলেন, আইফোনসহ এসব সরঞ্জাম তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হতো বলে ধারণা। তবে ফোনগুলো কী কাজে ও কোন ধরনের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার হয়েছে, তা ফরেনসিক পরীক্ষার পরই জানা যাবে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এই আইফোনগুলো অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্কের অংশ কি না সেটিই এখন জানার বিষয়। কম্পিউটার ল্যাবে কী কাজ চলত, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো অনলাইন প্রতারণা চক্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না, এসব তথ্যের খোঁজ করতে হবে দ্রুত।
ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলই এখন বলে দেবে, কক্সবাজারের পর্যটনের আড়ালে ঠিক কতটা গভীর ছিল এই প্রতারণার শিকড়।
