২০১৮ সাল। খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত। বিএনপি তখন রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ে। মামলার পর মামলা, গ্রেপ্তারের পর গ্রেপ্তার। অনেকেই ভেবেছিলেন দলটি ভেঙে পড়বে। কিন্তু ভাঙেনি। কারণ একটাই- দেশের ভেতরে থেকে দলকে আগলে রেখেছিলেন একজন মানুষ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সেই মানুষটি আজ বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি
প্রায় ৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫টি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ।
এর আগে গত ২৪ জুলাই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচিত ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদ শেষের দেড় বছর আগেই পদত্যাগ করেন। এরপর চলতি মাসে তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করে দল। আনুষ্ঠানিক শপথের পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য বঙ্গভবনের বাসিন্দা হচ্ছেন তিনি।
ঠাকুরগাঁও থেকে বঙ্গভবন: দীর্ঘ এক পথ
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের কালিবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুলের। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী এবং দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য। রাজনীতির পরিবেশ ছিল ঘরেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এসএম হলের সাধারণ সম্পাদক, তারপর ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি। কারাগারেও যেতে হয়েছে সে সময়।
পড়াশোনা শেষে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে যোগ দিলেন প্রভাষক হিসেবে। কিন্তু রাজনীতির টান ছাড়লেন না। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পিএস হলেন। ১৯৮৬ সালে ন্যাপে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে পা রাখলেন। দুই বছরের মাথায় ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান। ১৯৯০-এ এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে এলেন। ২০০১-এ প্রথম সংসদ সদস্য, তারপর কৃষি প্রতিমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী।
তারপর এলো কঠিন সময়। দল কোণঠাসা, নেতৃত্ব কারাবন্দী বা নির্বাসিত। কিন্তু মির্জা ফখরুল রইলেন দেশে, রইলেন মাঠে। কয়েক দফা গ্রেপ্তার হলেন, হামলার শিকার হলেন। তবু সরলেন না। ২০১১-তে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, ২০১৬-তে পূর্ণ মহাসচিব।
‘ক্লিন ইমেজের’ রাজনীতিবিদ যা বললেন বিশ্লেষকরা
মির্জা ফখরুলকে নিয়ে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি বলা হয়, সেটি হলো- তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “দায়িত্ব পালনের সময় আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের অনেক ধরনের নেতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়, কিন্তু মির্জা ফখরুল এসব অভিযোগ থেকে মুক্ত ছিলেন।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, “অন্য দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি কখনো কটূক্তি করতেন না। সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলতেন।” এই কারণেই শুধু বিএনপিতে নয়, অন্যান্য দল ও সাধারণ মানুষের কাছেও তাঁর আলাদা একটি সম্মানজনক পরিচিতি গড়ে উঠেছে।
ছাত্রজীবনে নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছেন, আবৃত্তি করেছেন। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। দুই মেয়ে- একজন অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো, আরেকজন ঢাকায় শিক্ষক।
মহিউদ্দিন আহমদ বললেন, “রাষ্ট্রপতি পদটি একটি সম্মানজনক পদ। এ পদটি মির্জা ফখরুলের প্রাপ্যই ছিল।”
ঠাকুরগাঁওয়ের একটি পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষটি দেশের সর্বোচ্চ পদে বসলেন। পথটা সহজ ছিল না- ছিল কারাগার, হামলা, নির্যাতন। কিন্তু মাটি কামড়ে ছিলেন। এটাই বোধহয় তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
