সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে, উৎপাদনও দ্বিগুণ—সুগন্ধি চালের ভবিষ্যৎ কী?

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

দেশে সুগন্ধি চালের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে উৎপাদনও। বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এমনকি সাধারণ অতিথি আপ্যায়নেও পোলাও, বিরিয়ানি, পায়েস, ফিরনির মতো পদের জন্য সুগন্ধি চালের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চাহিদা বৃদ্ধির এই প্রবণতায় সাড়া দিয়ে কৃষকরাও সুগন্ধি ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, ফলে গত সাত বছরে এর উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে দেশে সুগন্ধি চালের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৭৯ হাজার টন, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার টনে। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আমন, আউশ ও বোরো—এই তিন মৌসুম মিলিয়ে মোট সুগন্ধি চাল উৎপন্ন হয়েছে ১৫ লাখ ৮০ হাজার ৮৪০ টন।

কৃষকদের মধ্যে সুগন্ধি ধান চাষের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো প্রচলিত সিদ্ধ চালের তুলনায় বেশি দাম পাওয়া। এছাড়া, সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই ধান শুকানোর ঝামেলা কম এবং দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায়, যা কৃষকদের জন্য সুবিধাজনক।

বেশি ফলন ও মুনাফার আশায় কৃষকরা বর্তমানে দেশি জাতের তুলনায় উচ্চ ফলনশীল (উফশী) সুগন্ধি ধান চাষে বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। যেখানে স্থানীয় জাতগুলোতে বিঘাপ্রতি ধান পাওয়া যায় ১৮৭ থেকে ২৯৯ কেজি, সেখানে উফশী জাত চাষ করে প্রতি বিঘায় ৪৪৮ থেকে ৮২১ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, নওগাঁ, রাজশাহী, পঞ্চগড়, রংপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, শেরপুর ও ঠাকুরগাঁও সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া সুগন্ধি ধান চাষের জন্য বেশ উপযোগী, যা বাণিজ্যিক উৎপাদনে সহায়তা করছে।

অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এবার সুগন্ধি চাল রপ্তানির পথে হাঁটতে চাইছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বছরে মোট ২৫ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি প্রদানের জন্য সুপারিশ করেছে। গত ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে নন-বাসমতী এই চালের সর্বনিম্ন রপ্তানিমূল্য প্রতি কেজি ১.৬ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে, যা দেশীয় মূল্যের চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি। রপ্তানিকারকদের কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য ন্যূনতম ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

বর্তমানে দেশের বাজারে মানভেদে খোলা সুগন্ধি চাল প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১২০ টাকায় এবং বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত চাল ১৫০ থেকে ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৩০২৫.৯২ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানিকৃত চালের গড় মূল্য ছিল প্রতি কেজি প্রায় ১.৫০ মার্কিন ডলার। বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরাই মূলত বাংলাদেশি সুগন্ধি চালের প্রধান ক্রেতা।

উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুগন্ধিসহ সব ধরনের চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। উৎপাদন বৃদ্ধি ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন সীমিত আকারে রপ্তানি পুনরায় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে, উৎপাদনও দ্বিগুণ—সুগন্ধি চালের ভবিষ্যৎ কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ মার্চ ২০২৫, ১৯:০৩

দেশে সুগন্ধি চালের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে উৎপাদনও। বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এমনকি সাধারণ অতিথি আপ্যায়নেও পোলাও, বিরিয়ানি, পায়েস, ফিরনির মতো পদের জন্য সুগন্ধি চালের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চাহিদা বৃদ্ধির এই প্রবণতায় সাড়া দিয়ে কৃষকরাও সুগন্ধি ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, ফলে গত সাত বছরে এর উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে দেশে সুগন্ধি চালের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৭৯ হাজার টন, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার টনে। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আমন, আউশ ও বোরো—এই তিন মৌসুম মিলিয়ে মোট সুগন্ধি চাল উৎপন্ন হয়েছে ১৫ লাখ ৮০ হাজার ৮৪০ টন।

কৃষকদের মধ্যে সুগন্ধি ধান চাষের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো প্রচলিত সিদ্ধ চালের তুলনায় বেশি দাম পাওয়া। এছাড়া, সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই ধান শুকানোর ঝামেলা কম এবং দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায়, যা কৃষকদের জন্য সুবিধাজনক।

বেশি ফলন ও মুনাফার আশায় কৃষকরা বর্তমানে দেশি জাতের তুলনায় উচ্চ ফলনশীল (উফশী) সুগন্ধি ধান চাষে বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। যেখানে স্থানীয় জাতগুলোতে বিঘাপ্রতি ধান পাওয়া যায় ১৮৭ থেকে ২৯৯ কেজি, সেখানে উফশী জাত চাষ করে প্রতি বিঘায় ৪৪৮ থেকে ৮২১ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, নওগাঁ, রাজশাহী, পঞ্চগড়, রংপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, শেরপুর ও ঠাকুরগাঁও সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া সুগন্ধি ধান চাষের জন্য বেশ উপযোগী, যা বাণিজ্যিক উৎপাদনে সহায়তা করছে।

অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এবার সুগন্ধি চাল রপ্তানির পথে হাঁটতে চাইছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বছরে মোট ২৫ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি প্রদানের জন্য সুপারিশ করেছে। গত ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে নন-বাসমতী এই চালের সর্বনিম্ন রপ্তানিমূল্য প্রতি কেজি ১.৬ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে, যা দেশীয় মূল্যের চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি। রপ্তানিকারকদের কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য ন্যূনতম ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

বর্তমানে দেশের বাজারে মানভেদে খোলা সুগন্ধি চাল প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১২০ টাকায় এবং বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত চাল ১৫০ থেকে ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৩০২৫.৯২ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানিকৃত চালের গড় মূল্য ছিল প্রতি কেজি প্রায় ১.৫০ মার্কিন ডলার। বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরাই মূলত বাংলাদেশি সুগন্ধি চালের প্রধান ক্রেতা।

উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুগন্ধিসহ সব ধরনের চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। উৎপাদন বৃদ্ধি ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন সীমিত আকারে রপ্তানি পুনরায় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।