সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

ভুক্তভোগী ও মূল অপহরণকারীরাও বলল নির্দোষ, তবু জেলে গেলেন আইআইইউসি শিক্ষার্থী!

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

প্রতিবেশীর বিপদে সাড়া দেওয়াই কাল হলো আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) এক শিক্ষার্থীর। অপহরণকারীদের হাত থেকে প্রতিবেশীকে রক্ষা করতে গিয়ে উল্টো পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে অপহরণ মামলায় ফেঁসে যান তিনি। ভুক্তভোগী পরিবার এবং গ্রেপ্তার হওয়া মূল অপহরণকারীরা বারবার নির্দোষ বলার পরও শুধু সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে ওই শিক্ষার্থীকে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। অবশেষে ছয় দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেও এই ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি ও তাঁর পরিবার।

জানা যায়, গত ৬ মার্চ রাতে চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ থানা এলাকার বাসিন্দা ও তৈরি পোশাক কারখানা প্যাসিফিক জিনসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবেদীন আল মামুন এবং তাঁর গাড়িচালক মো. শহীদুল ইসলামকে বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা নিজেদের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’র সদস্য পরিচয় দেয়। আবেদীন আল মামুনের স্ত্রী ফাতেমা আক্তারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তারা, যার মধ্যে ৫ লাখ টাকা নগদে আদায় করে এবং বাকি ১৫ লাখ টাকার চেক লিখে নেয়।

আবেদীন আল মামুনের স্ত্রী আয়েশা আক্তার (চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী) জানান, অপহরণকারীরা বাসায় এলে তিনি সাহায্যের জন্য প্রতিবেশী ওই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে ফোন করেন। ফোন পেয়ে শিক্ষার্থী দ্রুত ছুটে আসেন এবং তাঁর স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে অপহরণকারীরা আবেদীন আল মামুনকে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি নিজেই ওই শিক্ষার্থীর হাত ধরে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যান। ভুক্তভোগী আবেদীন আল মামুনও একই কথা জানিয়েছেন।

ঘটনার সময় পুলিশকে কেন ফোন করা হয়নি, এ প্রশ্নের উত্তরে আয়েশা আক্তার বলেন, অপহরণকারীরা তাঁর স্বামীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল (উল্লেখ্য, আবেদীন আল মামুন কোতোয়ালি থানার একটি মামলার আসামি)। তাই তাঁরাই শিক্ষার্থীকে পুলিশে ফোন করতে নিষেধ করেন। পরে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ওই শিক্ষার্থীকে ধরে আনলে তাঁরা থানায় গিয়ে বারবার তাঁর নির্দোষ হওয়ার কথা বললেও পুলিশ কর্ণপাত করেনি।

অপহরণের খবর পেয়ে নগর পুলিশ তল্লাশি শুরু করলে অপহরণকারীরা ফয়’স লেক চক্ষু হাসপাতালের সামনে আবেদীন আল মামুন ও তাঁর চালককে ছেড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে নাজমুল আবেদীন, নইমুল আমিন, আরাফাত হোসেন এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে। মামলার বাদী ও অপহৃত চালক শহীদুল ইসলাম জানান, তিনি শুধু এজাহারে সই করেছেন, বাকি সব পুলিশই লিখেছে এবং ওই শিক্ষার্থী নির্দোষ, তাঁকে ফোন করে আনা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার হওয়া মূল তিন আসামি নাজমুল, নইমুল ও আরাফাত ৮ মার্চ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁরা প্রত্যেকেই আদালতকে জানান, এই অপহরণের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ভুক্তভোগীর স্ত্রীর ফোনেই তিনি ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তাঁরা ১০-১৫ দিন ধরে পরিকল্পনা করে টাকার লোভে এই অপহরণ করেন।

এই জবানবন্দি এবং ভুক্তভোগী, তাঁর স্ত্রী ও মামলার বাদীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিক ১২ মার্চ ওই শিক্ষার্থীর জামিন মঞ্জুর করেন। আদেশে তিনি উল্লেখ করেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ও সাক্ষ্য প্রমাণে শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আকবর শাহ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাজ্জাদ হোসেনও জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীকে তিনি ভালো ছেলে হিসেবে জানেন এবং তদন্তে তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

বারবার নির্দোষ বলার পরও কেন শিক্ষার্থীকে আসামি করা হলো, জানতে চাইলে আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আখতারুজ্জামান বলেন, “ফুটেজে ছিল তাই ধরা হয়েছে। তদন্তে যা হওয়ার হবে।” প্রাথমিক যাচাই-বাছাই কেন করা হয়নি, সে বিষয়ে তিনি সদুত্তর দেননি।

নগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) রইছ উদ্দিন জানিয়েছেন, তদন্তে দোষী প্রমাণিত না হলে মামলা থেকে ওই শিক্ষার্থীর নাম বাদ দেওয়া হতে পারে।

ছয় দিনের কারাবাস এবং মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তিনি বাসা থেকে বের হচ্ছেন না এবং কাউকে মুখ দেখাতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর ব্যবসায়ী বাবা বলেন, “প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে গিয়ে ছেলে নিজেই বিপদে পড়ল। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “আসামি আটকের পর পুলিশের আরও সতর্কভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেলেও কার কী ভূমিকা, তা নিরূপণ করা জরুরি ছিল।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

ভুক্তভোগী ও মূল অপহরণকারীরাও বলল নির্দোষ, তবু জেলে গেলেন আইআইইউসি শিক্ষার্থী!

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ এপ্রিল ২০২৫, ১৮:০৫

প্রতিবেশীর বিপদে সাড়া দেওয়াই কাল হলো আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) এক শিক্ষার্থীর। অপহরণকারীদের হাত থেকে প্রতিবেশীকে রক্ষা করতে গিয়ে উল্টো পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে অপহরণ মামলায় ফেঁসে যান তিনি। ভুক্তভোগী পরিবার এবং গ্রেপ্তার হওয়া মূল অপহরণকারীরা বারবার নির্দোষ বলার পরও শুধু সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে ওই শিক্ষার্থীকে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। অবশেষে ছয় দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেও এই ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি ও তাঁর পরিবার।

জানা যায়, গত ৬ মার্চ রাতে চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ থানা এলাকার বাসিন্দা ও তৈরি পোশাক কারখানা প্যাসিফিক জিনসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবেদীন আল মামুন এবং তাঁর গাড়িচালক মো. শহীদুল ইসলামকে বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা নিজেদের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’র সদস্য পরিচয় দেয়। আবেদীন আল মামুনের স্ত্রী ফাতেমা আক্তারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তারা, যার মধ্যে ৫ লাখ টাকা নগদে আদায় করে এবং বাকি ১৫ লাখ টাকার চেক লিখে নেয়।

আবেদীন আল মামুনের স্ত্রী আয়েশা আক্তার (চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী) জানান, অপহরণকারীরা বাসায় এলে তিনি সাহায্যের জন্য প্রতিবেশী ওই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে ফোন করেন। ফোন পেয়ে শিক্ষার্থী দ্রুত ছুটে আসেন এবং তাঁর স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে অপহরণকারীরা আবেদীন আল মামুনকে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি নিজেই ওই শিক্ষার্থীর হাত ধরে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যান। ভুক্তভোগী আবেদীন আল মামুনও একই কথা জানিয়েছেন।

ঘটনার সময় পুলিশকে কেন ফোন করা হয়নি, এ প্রশ্নের উত্তরে আয়েশা আক্তার বলেন, অপহরণকারীরা তাঁর স্বামীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল (উল্লেখ্য, আবেদীন আল মামুন কোতোয়ালি থানার একটি মামলার আসামি)। তাই তাঁরাই শিক্ষার্থীকে পুলিশে ফোন করতে নিষেধ করেন। পরে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ওই শিক্ষার্থীকে ধরে আনলে তাঁরা থানায় গিয়ে বারবার তাঁর নির্দোষ হওয়ার কথা বললেও পুলিশ কর্ণপাত করেনি।

অপহরণের খবর পেয়ে নগর পুলিশ তল্লাশি শুরু করলে অপহরণকারীরা ফয়’স লেক চক্ষু হাসপাতালের সামনে আবেদীন আল মামুন ও তাঁর চালককে ছেড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে নাজমুল আবেদীন, নইমুল আমিন, আরাফাত হোসেন এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে। মামলার বাদী ও অপহৃত চালক শহীদুল ইসলাম জানান, তিনি শুধু এজাহারে সই করেছেন, বাকি সব পুলিশই লিখেছে এবং ওই শিক্ষার্থী নির্দোষ, তাঁকে ফোন করে আনা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার হওয়া মূল তিন আসামি নাজমুল, নইমুল ও আরাফাত ৮ মার্চ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁরা প্রত্যেকেই আদালতকে জানান, এই অপহরণের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ভুক্তভোগীর স্ত্রীর ফোনেই তিনি ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তাঁরা ১০-১৫ দিন ধরে পরিকল্পনা করে টাকার লোভে এই অপহরণ করেন।

এই জবানবন্দি এবং ভুক্তভোগী, তাঁর স্ত্রী ও মামলার বাদীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিক ১২ মার্চ ওই শিক্ষার্থীর জামিন মঞ্জুর করেন। আদেশে তিনি উল্লেখ করেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ও সাক্ষ্য প্রমাণে শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আকবর শাহ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাজ্জাদ হোসেনও জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীকে তিনি ভালো ছেলে হিসেবে জানেন এবং তদন্তে তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

বারবার নির্দোষ বলার পরও কেন শিক্ষার্থীকে আসামি করা হলো, জানতে চাইলে আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আখতারুজ্জামান বলেন, “ফুটেজে ছিল তাই ধরা হয়েছে। তদন্তে যা হওয়ার হবে।” প্রাথমিক যাচাই-বাছাই কেন করা হয়নি, সে বিষয়ে তিনি সদুত্তর দেননি।

নগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) রইছ উদ্দিন জানিয়েছেন, তদন্তে দোষী প্রমাণিত না হলে মামলা থেকে ওই শিক্ষার্থীর নাম বাদ দেওয়া হতে পারে।

ছয় দিনের কারাবাস এবং মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তিনি বাসা থেকে বের হচ্ছেন না এবং কাউকে মুখ দেখাতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর ব্যবসায়ী বাবা বলেন, “প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে গিয়ে ছেলে নিজেই বিপদে পড়ল। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “আসামি আটকের পর পুলিশের আরও সতর্কভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেলেও কার কী ভূমিকা, তা নিরূপণ করা জরুরি ছিল।”