সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

চট্টগ্রামে অরক্ষিত নালা-খাল যেন মরণফাঁদ, ৪ বছরে ১২ মৃত্যু

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

চট্টগ্রাম নগরীর সড়কের পাশে থাকা অরক্ষিত নালা ও খালগুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে; গত চার বছরে এসব নালা-খালে পড়ে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সর্বশেষ শুক্রবার রাতে সাত মাস বয়সী এক শিশু খালে পড়ে মারা যাওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চললেও নালা-খালের পাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) সূত্র বলছে, নগরীতে সড়কের পাশে উন্মুক্ত নালা-নর্দমা ও খালের কিনারায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ কিলোমিটার। নগরীর ৫৭টি খাল ও প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার নালাসহ মোট ১৬০০ কিলোমিটার নালা-খালের বেশিরভাগেরই সুরক্ষিত দেয়াল নেই।

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, শিশু সেহরিশসহ গত চার বছরে নালা-খালে পড়ে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে চট্টগ্রামের মেয়র গলির চশমাহিল এলাকায় খালে পড়ে অটোরিকশাচালক ও এক যাত্রী, মুরাদপুরে সালেহ উদ্দিন আহমদ, আগ্রাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়া এবং নাম না জানা ১২ বছরের শিশু কামাল মারা যান।

২০২৩ সালে ফতেহপুর ইসলামি হাটসংলগ্ন বাদামতলা এলাকার নালায় পড়ে কলেজছাত্রী নিপা পালিত (২০), ২৭ আগস্ট আগ্রাবাদের রঙ্গিপাড়ায় নালায় পড়ে শিশু ইয়াছিন আরাফাত এবং ৩ সেপ্টেম্বর নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন সিডিএ আবাসিক এলাকার খালে নেমে শিশু আবদুল্লাহর (৫) মৃত্যু হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ২৭ মে চট্টগ্রাম নগরের আছদগঞ্জে খালে পড়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছিল।

সর্বশেষ শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) রাতে নগরীর চকবাজার থানার কাপাসগোলা এলাকায় একটি রিকশা থেকে মা ও নানীর সঙ্গে বিরজা খালে পড়ে যায় সাত মাস বয়সী শিশু সেহরিশ। বাকি দুজনকে উদ্ধার করা গেলেও শিশুটি নিখোঁজ ছিল। শনিবার সকালে চাক্তাই খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর ওই খালের পাশে বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে।

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চসিক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ১৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার চারটি প্রকল্প চলমান আছে। এর মধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও উন্মুক্ত নালা-খালের পাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরিতে আলাদা বাজেট বা কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার আই ইউ এ চৌধুরী শিশুটির মৃত্যুকে ‘মর্মান্তিক’ উল্লেখ করে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় থাকা ড্রেন বা নালায় পানির স্রোত বেশি থাকে। তিনি বলেন, “খাল বা ড্রেনগুলোর চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কাজ করছি।”

তবে নগর পরিকল্পনাবিদ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার মনে করেন, জোড়াতালি দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। তিনি বলেন, “নগরীতে যে উন্মুক্ত নালা বা খালগুলো আছে তাতে বেষ্টনী দিতে হবে।…চসিককে এ বেষ্টনী নির্মাণ ও উন্মুক্ত নালা বা খালগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করে কাজ করতে হবে।”

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন শিশুটির মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “নালা বা খালের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে কাজ করব। সেনাবাহিনী জলাবদ্ধতা নিরসনে যে কাজগুলো করছে সেখানে রিটেইনিং ওয়াল ও নিরাপত্তা বেষ্টনী দ্রুত নির্মাণে কাজ করছে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

চট্টগ্রামে অরক্ষিত নালা-খাল যেন মরণফাঁদ, ৪ বছরে ১২ মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ এপ্রিল ২০২৫, ০০:২১

চট্টগ্রাম নগরীর সড়কের পাশে থাকা অরক্ষিত নালা ও খালগুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে; গত চার বছরে এসব নালা-খালে পড়ে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সর্বশেষ শুক্রবার রাতে সাত মাস বয়সী এক শিশু খালে পড়ে মারা যাওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চললেও নালা-খালের পাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) সূত্র বলছে, নগরীতে সড়কের পাশে উন্মুক্ত নালা-নর্দমা ও খালের কিনারায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ কিলোমিটার। নগরীর ৫৭টি খাল ও প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার নালাসহ মোট ১৬০০ কিলোমিটার নালা-খালের বেশিরভাগেরই সুরক্ষিত দেয়াল নেই।

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, শিশু সেহরিশসহ গত চার বছরে নালা-খালে পড়ে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে চট্টগ্রামের মেয়র গলির চশমাহিল এলাকায় খালে পড়ে অটোরিকশাচালক ও এক যাত্রী, মুরাদপুরে সালেহ উদ্দিন আহমদ, আগ্রাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়া এবং নাম না জানা ১২ বছরের শিশু কামাল মারা যান।

২০২৩ সালে ফতেহপুর ইসলামি হাটসংলগ্ন বাদামতলা এলাকার নালায় পড়ে কলেজছাত্রী নিপা পালিত (২০), ২৭ আগস্ট আগ্রাবাদের রঙ্গিপাড়ায় নালায় পড়ে শিশু ইয়াছিন আরাফাত এবং ৩ সেপ্টেম্বর নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন সিডিএ আবাসিক এলাকার খালে নেমে শিশু আবদুল্লাহর (৫) মৃত্যু হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ২৭ মে চট্টগ্রাম নগরের আছদগঞ্জে খালে পড়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছিল।

সর্বশেষ শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) রাতে নগরীর চকবাজার থানার কাপাসগোলা এলাকায় একটি রিকশা থেকে মা ও নানীর সঙ্গে বিরজা খালে পড়ে যায় সাত মাস বয়সী শিশু সেহরিশ। বাকি দুজনকে উদ্ধার করা গেলেও শিশুটি নিখোঁজ ছিল। শনিবার সকালে চাক্তাই খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর ওই খালের পাশে বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে।

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চসিক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ১৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার চারটি প্রকল্প চলমান আছে। এর মধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও উন্মুক্ত নালা-খালের পাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরিতে আলাদা বাজেট বা কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার আই ইউ এ চৌধুরী শিশুটির মৃত্যুকে ‘মর্মান্তিক’ উল্লেখ করে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় থাকা ড্রেন বা নালায় পানির স্রোত বেশি থাকে। তিনি বলেন, “খাল বা ড্রেনগুলোর চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কাজ করছি।”

তবে নগর পরিকল্পনাবিদ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার মনে করেন, জোড়াতালি দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। তিনি বলেন, “নগরীতে যে উন্মুক্ত নালা বা খালগুলো আছে তাতে বেষ্টনী দিতে হবে।…চসিককে এ বেষ্টনী নির্মাণ ও উন্মুক্ত নালা বা খালগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করে কাজ করতে হবে।”

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন শিশুটির মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “নালা বা খালের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে কাজ করব। সেনাবাহিনী জলাবদ্ধতা নিরসনে যে কাজগুলো করছে সেখানে রিটেইনিং ওয়াল ও নিরাপত্তা বেষ্টনী দ্রুত নির্মাণে কাজ করছে।”