সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

চট্টগ্রামে এক দশকে পশু কোরবানি বেড়েছে ৭৯%, সংকট নেই

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

চট্টগ্রামে প্রতিবছর ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত এক দশকে এই হার বেড়েছে ৭৯ শতাংশ। এক সময় যেখানে পুরো চট্টগ্রাম জেলায় ৫ লাখ পশু কোরবানি হতো, সেখানে আসন্ন ঈদুল আজহায় পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি। তবে ক্রমবর্ধমান এই চাহিদা মেটাতে সক্ষম স্থানীয় খামারিরা, এমনটাই জানাচ্ছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। পশুর যোগান নিয়ে এবার কোনো ঘাটতির সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১০ সালের পর থেকেই চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১১ সালে যেখানে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৭৬৭টি পশু কোরবানি হয়েছিল, পরের তিন বছর তা বেড়ে যথাক্রমে ৪ লাখ ৫৬ হাজার, ৪ লাখ ৬০ হাজার এবং ৪ লাখ ৮৭ হাজারে পৌঁছায়। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ৫ লাখের মাইলফলক অতিক্রম করে। এরপরের বছরগুলোতেও কোরবানির হার বাড়তেই থাকে এবং সর্বশেষ গত ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৮ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৮টি পশু কোরবানি দেওয়া হয়।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ চলতি বছর চট্টগ্রামে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি পশু কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬৭ হাজার ২৯৭টি বেশি। বিপুল এই চাহিদা বৃদ্ধি সত্ত্বেও পশুর কোনো সংকট হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে পশু পালনের হার অনেক বেড়েছে এবং স্থানীয় খামারিরাই কোরবানির পশুর বড় যোগানদাতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, “চাহিদা বাড়লেও পশুর সংকট হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এখানে পশুপালনের হারও অনেক বেড়েছে। এবার আসন্ন কোরবানির ঈদের চাহিদার বিপরীতে ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২টি পশু স্থানীয় খামারিদের কাছে মজুদ আছে।” তিনি জানান, হিসেব অনুযায়ী ঘাটতি থাকছে মাত্র ৩৫ হাজার ৩৭৮টি পশু, যা আশপাশের জেলাগুলো থেকেই সহজে পূরণ হয়ে যাবে। এছাড়া প্রতি কোরবানির মৌসুমে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকেও বড় বড় বেপারিরা চট্টগ্রামে প্রচুর পশু নিয়ে আসেন। ফলে সব মিলিয়ে কোরবানির পশুর যোগান পর্যাপ্ত থাকবে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় খামারিদের কাছে মজুদ থাকা মোট ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২টি পশুর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ২৯টি ষাঁড়, ১ লাখ ২১ হাজার ৬৭০টি বলদ, ৪৯ হাজার ১১৪টি গাভি এবং ৬৪ হাজার ১৬৩টি মহিষ। এছাড়া ২ লাখ ৫ হাজার ১৭৪টি ছাগল এবং ৫৫ হাজার ৬৯৭টি ভেড়া কোরবানিযোগ্য হিসেবে প্রস্তুত রয়েছে। উপজেলাভিত্তিক চাহিদার ক্ষেত্রে সন্দ্বীপে এবার সর্বোচ্চ ৮৫ হাজার ২৫টি পশুর চাহিদা রয়েছে, আর বোয়ালখালীতে সর্বনিম্ন ২৯ হাজার ৭৪২টি পশুর প্রয়োজন হতে পারে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৭৫৭টি।

এদিকে পশুর পর্যাপ্ত যোগানের খবরে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও, খামারিদের মধ্যে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তারা বলছেন, গত এক বছর ধরে পশুখাদ্য, ঔষধপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রীর দাম বেড়েছে। ফলে পশুর উৎপাদন ব্যয় গত বছরের চেয়ে এবার বেশি হয়েছে। মিরসরাইয়ের ওয়াহেদপুর এলাকার খামারি হুসাইন বিন আজাদ বলেন, “বাজারে খাদ্যসহ সবকিছুর দাম বাড়তি। গত বছরের তুলনায় এবার পশুর পেছনে খরচ বেশি হয়েছে। সেক্ষেত্রে এবার কোরবানির পশুর দাম কিছুটা বেশি হওয়া স্বাভাবিক।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি উত্তরাঞ্চল থেকে অতিরিক্ত পশু বাজারে আসে, তাহলে স্থানীয় খামারিরা লোকসানে পড়তে পারেন।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, খাদ্য ও ওষুধের দাম কিছু সময় কিছুটা বেশি ছিল। তবে তার আশা, এর ফলে খামারিদের খুব বেশি উচ্চমূল্য নিতে হবে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের কোরবানির বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই একটি “উইন-উইন সিচ্যুয়েশন” থাকবে, যাতে দুই পক্ষই লাভবান হতে পারেন।

সব মিলিয়ে, ক্রমবর্ধমান চাহিদা সত্ত্বেও স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে চট্টগ্রামে এবার কোরবানির পশুর যোগান নিয়ে কোনো বড় ধরনের সংকট দেখছে না প্রাণিসম্পদ বিভাগ। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে পশুর দামে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, যা ক্রেতা-বিক্রেতার দর কষাকষির ওপর নির্ভর করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

চট্টগ্রামে এক দশকে পশু কোরবানি বেড়েছে ৭৯%, সংকট নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ মে ২০২৫, ২২:২০

চট্টগ্রামে প্রতিবছর ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত এক দশকে এই হার বেড়েছে ৭৯ শতাংশ। এক সময় যেখানে পুরো চট্টগ্রাম জেলায় ৫ লাখ পশু কোরবানি হতো, সেখানে আসন্ন ঈদুল আজহায় পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি। তবে ক্রমবর্ধমান এই চাহিদা মেটাতে সক্ষম স্থানীয় খামারিরা, এমনটাই জানাচ্ছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। পশুর যোগান নিয়ে এবার কোনো ঘাটতির সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১০ সালের পর থেকেই চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১১ সালে যেখানে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৭৬৭টি পশু কোরবানি হয়েছিল, পরের তিন বছর তা বেড়ে যথাক্রমে ৪ লাখ ৫৬ হাজার, ৪ লাখ ৬০ হাজার এবং ৪ লাখ ৮৭ হাজারে পৌঁছায়। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ৫ লাখের মাইলফলক অতিক্রম করে। এরপরের বছরগুলোতেও কোরবানির হার বাড়তেই থাকে এবং সর্বশেষ গত ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৮ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৮টি পশু কোরবানি দেওয়া হয়।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ চলতি বছর চট্টগ্রামে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি পশু কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬৭ হাজার ২৯৭টি বেশি। বিপুল এই চাহিদা বৃদ্ধি সত্ত্বেও পশুর কোনো সংকট হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে পশু পালনের হার অনেক বেড়েছে এবং স্থানীয় খামারিরাই কোরবানির পশুর বড় যোগানদাতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, “চাহিদা বাড়লেও পশুর সংকট হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এখানে পশুপালনের হারও অনেক বেড়েছে। এবার আসন্ন কোরবানির ঈদের চাহিদার বিপরীতে ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২টি পশু স্থানীয় খামারিদের কাছে মজুদ আছে।” তিনি জানান, হিসেব অনুযায়ী ঘাটতি থাকছে মাত্র ৩৫ হাজার ৩৭৮টি পশু, যা আশপাশের জেলাগুলো থেকেই সহজে পূরণ হয়ে যাবে। এছাড়া প্রতি কোরবানির মৌসুমে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকেও বড় বড় বেপারিরা চট্টগ্রামে প্রচুর পশু নিয়ে আসেন। ফলে সব মিলিয়ে কোরবানির পশুর যোগান পর্যাপ্ত থাকবে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় খামারিদের কাছে মজুদ থাকা মোট ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২টি পশুর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ২৯টি ষাঁড়, ১ লাখ ২১ হাজার ৬৭০টি বলদ, ৪৯ হাজার ১১৪টি গাভি এবং ৬৪ হাজার ১৬৩টি মহিষ। এছাড়া ২ লাখ ৫ হাজার ১৭৪টি ছাগল এবং ৫৫ হাজার ৬৯৭টি ভেড়া কোরবানিযোগ্য হিসেবে প্রস্তুত রয়েছে। উপজেলাভিত্তিক চাহিদার ক্ষেত্রে সন্দ্বীপে এবার সর্বোচ্চ ৮৫ হাজার ২৫টি পশুর চাহিদা রয়েছে, আর বোয়ালখালীতে সর্বনিম্ন ২৯ হাজার ৭৪২টি পশুর প্রয়োজন হতে পারে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৭৫৭টি।

এদিকে পশুর পর্যাপ্ত যোগানের খবরে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও, খামারিদের মধ্যে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তারা বলছেন, গত এক বছর ধরে পশুখাদ্য, ঔষধপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রীর দাম বেড়েছে। ফলে পশুর উৎপাদন ব্যয় গত বছরের চেয়ে এবার বেশি হয়েছে। মিরসরাইয়ের ওয়াহেদপুর এলাকার খামারি হুসাইন বিন আজাদ বলেন, “বাজারে খাদ্যসহ সবকিছুর দাম বাড়তি। গত বছরের তুলনায় এবার পশুর পেছনে খরচ বেশি হয়েছে। সেক্ষেত্রে এবার কোরবানির পশুর দাম কিছুটা বেশি হওয়া স্বাভাবিক।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি উত্তরাঞ্চল থেকে অতিরিক্ত পশু বাজারে আসে, তাহলে স্থানীয় খামারিরা লোকসানে পড়তে পারেন।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, খাদ্য ও ওষুধের দাম কিছু সময় কিছুটা বেশি ছিল। তবে তার আশা, এর ফলে খামারিদের খুব বেশি উচ্চমূল্য নিতে হবে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের কোরবানির বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই একটি “উইন-উইন সিচ্যুয়েশন” থাকবে, যাতে দুই পক্ষই লাভবান হতে পারেন।

সব মিলিয়ে, ক্রমবর্ধমান চাহিদা সত্ত্বেও স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে চট্টগ্রামে এবার কোরবানির পশুর যোগান নিয়ে কোনো বড় ধরনের সংকট দেখছে না প্রাণিসম্পদ বিভাগ। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে পশুর দামে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, যা ক্রেতা-বিক্রেতার দর কষাকষির ওপর নির্ভর করবে।