সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

স্বাধীনতার ঘোষণার স্মৃতিবিজড়িত কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র ৫৪ বছরেও অবহেলিত

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে যেখান থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে মুক্তিকামী বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, চট্টগ্রামের সেই ঐতিহাসিক কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি তার ঐতিহাসিক মর্যাদা হারাতে বসেছে বলে মনে করছেন অনেকে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার কণ্ঠে ভেসে আসা স্বাধীনতার সেই ঘোষণা দেশের মানুষকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বার্তা পৌঁছে দিতেও রেখেছিল অপরিমেয় ভূমিকা। তবে, বর্তমানে নগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের বিপরীতে অবস্থিত এই কেন্দ্রটির ৯.৩৭ একর জমির ওপর থাকা টাওয়ার ও ভবন জীর্ণদশায় পতিত। বেতারের মূল অনুষ্ঠান এখন আগ্রাবাদ কেন্দ্র থেকে রেকর্ড হয়ে কালুরঘাটের ১০০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়।

চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শায়েস্তা খান (তৎকালীন চট্টগ্রাম কমার্স কলেজের প্রভাষক) স্মৃতিচারণ করে বলেন, “১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে আমি কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের ভাষণটি শুনতে পাই। সেই ঘোষণা মুক্তিসংগ্রামে আমাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।”

মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রুপ কমান্ডার শাহাবুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “তৎকালীন সময়ে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র রণাঙ্গনের খবরাখবর প্রচারে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজগুলোর সঙ্গে যোগাযোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।”

সরেজমিনে দেখা যায়, বেতারকেন্দ্রের নিচতলায় যে ‘১১১’ নম্বর কক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়েছিল, সেটির বাইরে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা কক্ষ (স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র)’ লেখা একটি ফলক থাকলেও ভেতরটা অনেকটা অবহেলিত। জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত মাইক্রোফোন, টেবিল, চেয়ার, রেডিও কনসোল ও মূল ট্রান্সমিটারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কালুরঘাট থেকে সরিয়ে ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে’ রাখা হয়েছে।

কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রের আবাসিক প্রকৌশলী ভাস্কর দেওয়ান জানান, “যে কক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেটি সংরক্ষিত আছে। প্রায় তিন বছর আগে কিছু সংস্কার কাজও হয়েছে।”

তবে, অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময়েও এই ঐতিহাসিক স্থাপনার সার্বিক উন্নয়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নাজুক সম্প্রচারযন্ত্র, প্রকৌশল ও জনবল সংকট লেগেই আছে। ২০০৩ সালে মূল ২৬ একর জমির একটি বড় অংশ ‘স্বাধীনতা পার্ক’ প্রতিষ্ঠার জন্য বরাদ্দ দেওয়ায় কেন্দ্রটির পরিসরও কমে আসে।

২০২২ সালের ২৭ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে বিএনপি এই ঐতিহাসিক স্থানে শ্রদ্ধা জানাতে চাইলেও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের পাল্টা কর্মসূচির কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়, যা এই স্থানটির রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও তুলে ধরে। জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদান রাখা এই ঐতিহাসিক বেতারকেন্দ্রটির যথাযথ সংরক্ষণ ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

স্বাধীনতার ঘোষণার স্মৃতিবিজড়িত কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র ৫৪ বছরেও অবহেলিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
১ জুন ২০২৫, ১৫:৩১

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে যেখান থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে মুক্তিকামী বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, চট্টগ্রামের সেই ঐতিহাসিক কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি তার ঐতিহাসিক মর্যাদা হারাতে বসেছে বলে মনে করছেন অনেকে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার কণ্ঠে ভেসে আসা স্বাধীনতার সেই ঘোষণা দেশের মানুষকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বার্তা পৌঁছে দিতেও রেখেছিল অপরিমেয় ভূমিকা। তবে, বর্তমানে নগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের বিপরীতে অবস্থিত এই কেন্দ্রটির ৯.৩৭ একর জমির ওপর থাকা টাওয়ার ও ভবন জীর্ণদশায় পতিত। বেতারের মূল অনুষ্ঠান এখন আগ্রাবাদ কেন্দ্র থেকে রেকর্ড হয়ে কালুরঘাটের ১০০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়।

চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শায়েস্তা খান (তৎকালীন চট্টগ্রাম কমার্স কলেজের প্রভাষক) স্মৃতিচারণ করে বলেন, “১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে আমি কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের ভাষণটি শুনতে পাই। সেই ঘোষণা মুক্তিসংগ্রামে আমাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।”

মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রুপ কমান্ডার শাহাবুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “তৎকালীন সময়ে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র রণাঙ্গনের খবরাখবর প্রচারে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজগুলোর সঙ্গে যোগাযোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।”

সরেজমিনে দেখা যায়, বেতারকেন্দ্রের নিচতলায় যে ‘১১১’ নম্বর কক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়েছিল, সেটির বাইরে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা কক্ষ (স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র)’ লেখা একটি ফলক থাকলেও ভেতরটা অনেকটা অবহেলিত। জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত মাইক্রোফোন, টেবিল, চেয়ার, রেডিও কনসোল ও মূল ট্রান্সমিটারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কালুরঘাট থেকে সরিয়ে ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে’ রাখা হয়েছে।

কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রের আবাসিক প্রকৌশলী ভাস্কর দেওয়ান জানান, “যে কক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেটি সংরক্ষিত আছে। প্রায় তিন বছর আগে কিছু সংস্কার কাজও হয়েছে।”

তবে, অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময়েও এই ঐতিহাসিক স্থাপনার সার্বিক উন্নয়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নাজুক সম্প্রচারযন্ত্র, প্রকৌশল ও জনবল সংকট লেগেই আছে। ২০০৩ সালে মূল ২৬ একর জমির একটি বড় অংশ ‘স্বাধীনতা পার্ক’ প্রতিষ্ঠার জন্য বরাদ্দ দেওয়ায় কেন্দ্রটির পরিসরও কমে আসে।

২০২২ সালের ২৭ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে বিএনপি এই ঐতিহাসিক স্থানে শ্রদ্ধা জানাতে চাইলেও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের পাল্টা কর্মসূচির কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়, যা এই স্থানটির রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও তুলে ধরে। জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদান রাখা এই ঐতিহাসিক বেতারকেন্দ্রটির যথাযথ সংরক্ষণ ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরা।