সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

মাইলেজ কম, ট্যাংকে জং, ভেজাল তেলে নাকাল গ্রাহক

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

গাড়ির মাইলেজ কমে যাওয়া, তেলের ট্যাংকে জং ধরে ছিদ্র হওয়া এবং কার্বোরেটর নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা। তাদের অভিযোগ, বাজারে সরবরাহ করা পেট্রল ও অকটেনের মান আগের মতো নেই, মিশে থাকছে ভেজাল।

ভুক্তভোগী গ্রাহক ও মেকানিকদের পাশাপাশি পেট্রলপাম্প মালিক সমিতিও জ্বালানি তেলের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর ডিপো থেকেই নিম্নমানের বা ভেজাল মিশ্রিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা নির্ধারিত মান বজায় রেখেই তেল সরবরাহ করে।

সরকারি কর্মকর্তা হাসান মূর্তাজা জানান, তার নিশান এক্সট্রেইল হাইব্রিড গাড়িতে আগে প্রতি লিটার অকটেনে ৮-৯ কিলোমিটার মাইলেজ পেলেও গত দুই মাস ধরে পাচ্ছেন মাত্র ৫-৬ কিলোমিটার। গাড়িতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নোয়াখালীর ফখরে আলমের ২৫ হাজার কিলোমিটার চলা মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংক মরিচা ধরে ছিদ্র হয়ে গেছে, নষ্ট হয়েছে কার্বোরেটরও। মেকানিক মো. সুমন জানান, ইদানিং অল্প দিনেই নতুন বাইকের ট্যাংকেও এমন সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা আগে হতো না। তার ধারণা, তেলে মেশানো কোনো রাসায়নিকের কারণে এমনটা হচ্ছে।

যশোরের সাজেদ রহমান বলেন, আগে ৫০০ টাকার অকটেনে (৪.২ লিটার) শহরে ১৫০ কিলোমিটার চললেও এখন ১২০-১৩০ কিলোমিটারের বেশি চলে না।

বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, সদস্যরা প্রায়ই ভেজাল তেলের অভিযোগ করছেন এবং তারা বিপিসিকে তা জানাচ্ছেন। আরেক অংশের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, “বিএসটিআই এসে পাম্পে জরিমানা করে, ডিপোতে যায় না। অথচ ডিপো থেকে পাতলা তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এক বছর ধরে তেলের মানে সমস্যা হচ্ছে।”

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন গত ১২ অক্টোবর বিপিসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, তিনটি তেল কোম্পানির সরবরাহ করা তেলের মানে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে এবং পেট্রল ও অকটেনের মান খারাপ হওয়ায় গাড়ির ট্যাংকে জং ধরছে। এর আগে বাংলাদেশ জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতিও খুলনার দৌলতপুরে পদ্মা অয়েলের ডিপো থেকে সরবরাহ করা পেট্রলের তীব্র গন্ধ ও নিম্নমান নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছিল।

জ্বালানি তেল খাতের সূত্র বলছে, ডিপোগুলোতে এখন তেলে ভেজাল মিশিয়ে চুরির প্রবণতা বেড়েছে। বাইরে থেকে কম দামের ভেজাল তেল এনে পেট্রল ও অকটেনের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে, যাতে কিছু ট্যাংকার ও পাম্প মালিকও জড়িত।

বিএসটিআইয়ের সীমাবদ্ধতা

পেট্রলপাম্পগুলোতে অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) মূলত তেলের মাপে কম দেওয়া হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করে। তেলের মান পরীক্ষার মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি তাদের কাছে থাকে না বলে পাম্প মালিকরা জানান।

বিএসটিআইয়ের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “পাম্প থেকে নমুনা নিয়ে নিম্নমানের তেল পাওয়া গেলে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। জবাবে তারা বলে, ডিপো থেকে এ তেল সংগ্রহ করেছে।” তিনি জানান, তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও বিএসটিআই থেকে লাইসেন্স নেয়নি, ফলে ডিপোতে তেল পরীক্ষা করা যায় না।

বিপিসির চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান বলেন, “বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মান বজায় রেখেই তেল সরবরাহ করা হয়। বিপণনপ্রক্রিয়ার মাঝপথে কোথাও ভেজাল মেশানো হতে পারে বা অবৈধ তেল ঢুকতে পারে। ভেজাল রোধে পেট্রলপাম্পে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। ডিপোতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।”

তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, “নিম্নমানের ভেজাল তেল সরবরাহ করে জনগণের সঙ্গে, ভোক্তার সঙ্গে সরকার তামাশা করছে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

মাইলেজ কম, ট্যাংকে জং, ভেজাল তেলে নাকাল গ্রাহক

নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ অক্টোবর ২০২৫, ১০:৫৭

গাড়ির মাইলেজ কমে যাওয়া, তেলের ট্যাংকে জং ধরে ছিদ্র হওয়া এবং কার্বোরেটর নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা। তাদের অভিযোগ, বাজারে সরবরাহ করা পেট্রল ও অকটেনের মান আগের মতো নেই, মিশে থাকছে ভেজাল।

ভুক্তভোগী গ্রাহক ও মেকানিকদের পাশাপাশি পেট্রলপাম্প মালিক সমিতিও জ্বালানি তেলের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর ডিপো থেকেই নিম্নমানের বা ভেজাল মিশ্রিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা নির্ধারিত মান বজায় রেখেই তেল সরবরাহ করে।

সরকারি কর্মকর্তা হাসান মূর্তাজা জানান, তার নিশান এক্সট্রেইল হাইব্রিড গাড়িতে আগে প্রতি লিটার অকটেনে ৮-৯ কিলোমিটার মাইলেজ পেলেও গত দুই মাস ধরে পাচ্ছেন মাত্র ৫-৬ কিলোমিটার। গাড়িতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নোয়াখালীর ফখরে আলমের ২৫ হাজার কিলোমিটার চলা মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংক মরিচা ধরে ছিদ্র হয়ে গেছে, নষ্ট হয়েছে কার্বোরেটরও। মেকানিক মো. সুমন জানান, ইদানিং অল্প দিনেই নতুন বাইকের ট্যাংকেও এমন সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা আগে হতো না। তার ধারণা, তেলে মেশানো কোনো রাসায়নিকের কারণে এমনটা হচ্ছে।

যশোরের সাজেদ রহমান বলেন, আগে ৫০০ টাকার অকটেনে (৪.২ লিটার) শহরে ১৫০ কিলোমিটার চললেও এখন ১২০-১৩০ কিলোমিটারের বেশি চলে না।

বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, সদস্যরা প্রায়ই ভেজাল তেলের অভিযোগ করছেন এবং তারা বিপিসিকে তা জানাচ্ছেন। আরেক অংশের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, “বিএসটিআই এসে পাম্পে জরিমানা করে, ডিপোতে যায় না। অথচ ডিপো থেকে পাতলা তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এক বছর ধরে তেলের মানে সমস্যা হচ্ছে।”

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন গত ১২ অক্টোবর বিপিসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, তিনটি তেল কোম্পানির সরবরাহ করা তেলের মানে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে এবং পেট্রল ও অকটেনের মান খারাপ হওয়ায় গাড়ির ট্যাংকে জং ধরছে। এর আগে বাংলাদেশ জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতিও খুলনার দৌলতপুরে পদ্মা অয়েলের ডিপো থেকে সরবরাহ করা পেট্রলের তীব্র গন্ধ ও নিম্নমান নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছিল।

জ্বালানি তেল খাতের সূত্র বলছে, ডিপোগুলোতে এখন তেলে ভেজাল মিশিয়ে চুরির প্রবণতা বেড়েছে। বাইরে থেকে কম দামের ভেজাল তেল এনে পেট্রল ও অকটেনের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে, যাতে কিছু ট্যাংকার ও পাম্প মালিকও জড়িত।

বিএসটিআইয়ের সীমাবদ্ধতা

পেট্রলপাম্পগুলোতে অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) মূলত তেলের মাপে কম দেওয়া হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করে। তেলের মান পরীক্ষার মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি তাদের কাছে থাকে না বলে পাম্প মালিকরা জানান।

বিএসটিআইয়ের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “পাম্প থেকে নমুনা নিয়ে নিম্নমানের তেল পাওয়া গেলে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। জবাবে তারা বলে, ডিপো থেকে এ তেল সংগ্রহ করেছে।” তিনি জানান, তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও বিএসটিআই থেকে লাইসেন্স নেয়নি, ফলে ডিপোতে তেল পরীক্ষা করা যায় না।

বিপিসির চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান বলেন, “বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মান বজায় রেখেই তেল সরবরাহ করা হয়। বিপণনপ্রক্রিয়ার মাঝপথে কোথাও ভেজাল মেশানো হতে পারে বা অবৈধ তেল ঢুকতে পারে। ভেজাল রোধে পেট্রলপাম্পে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। ডিপোতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।”

তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, “নিম্নমানের ভেজাল তেল সরবরাহ করে জনগণের সঙ্গে, ভোক্তার সঙ্গে সরকার তামাশা করছে।”