সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

ব্যালট যাবে আগের রাতে: ফিরছে কি ‘রাতের ভোটে’র পুরোনো শঙ্কা?

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের একটি সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভোট গ্রহণের আগের দিনই কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। অথচ ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘রাতের ভোট’-এর অভিজ্ঞতার পর, ২০২৩ সালে হাবীবুল আউয়াল কমিশন স্বচ্ছতা ফেরাতে ভোটের দিন সকালে ব্যালট পাঠানোর নিয়ম চালু করেছিল। বর্তমান কমিশনের পুরোনো নিয়মে ফিরে যাওয়ার এই পদক্ষেপে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে—তবে কি আবারও ফিরছে অনিয়মের সুযোগ?

এবারের নির্বাচনে ভোট গ্রহণ ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। তাই সময়ের সমন্বয় করতে ভোট গ্রহণ শুরুর সময় সকাল ৮টার পরিবর্তে সাড়ে ৭টা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লজিস্টিক সুবিধার কথা চিন্তা করেই মূলত আগের দিন ব্যালট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তে মোটেও স্বস্তি পাচ্ছেন না নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

বিলুপ্ত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সভাপতি ও প্রখ্যাত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কারচুপির সুযোগ বন্ধে ভোটের দিন সকালে ব্যালট পাঠানো একটি ‘মীমাংসিত ব্যাপার’ ছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, “জয়ী হতে মরিয়া ব্যক্তিরা ২০১৮ সালের রাতের ভোটের অভিজ্ঞতা আগামীতে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারেন। যদি বাস্তবে রাতে অনিয়ম নাও হয়, পরাজিত প্রার্থীরা নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে রাতের ভোটের অভিযোগ তুলতে পারেন। তাই নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত রাখতে ব্যালট সকালেই পাঠানো উচিত।”

অতীতের পরিসংখ্যান ও অভিজ্ঞতা এই শঙ্কার ভিত্তি মজবুত করে। নূরুল হুদা কমিশনের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আগের রাতেই ব্যালট বাক্সে ভরার নজিরবিহীন অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তখন পুলিশ ও র‍্যাবের সহায়তায় রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা রাতভর ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করেছিলেন। ওই নির্বাচনে দেখানো হয়েছিল ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন, অথচ বাস্তবে কেন্দ্রগুলো ছিল ভোটারশূন্য। এমনকি ২১২টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার মতো অবিশ্বাস্য তথ্যও তখন দেওয়া হয়েছিল। সেই কলঙ্ক মুছতেই হাবীবুল আউয়াল কমিশন সকালে ব্যালট পাঠানোর প্রথা চালু করে, যার ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকৃত ভোটের হার কমে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে, যা ছিল বাস্তবসম্মত।

মজার বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞদের এমন উদ্বেগের বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের দিন ব্যালট পাঠানোয় বড় কোনো অসুবিধা দেখছেন না। তাঁর মতে, “যেখানে দিনের ভোট রাতে হওয়ার শঙ্কা থাকে, সেখানেই কেবল ঝুঁকি। কিন্তু এখন দিনের ভোট রাতে হওয়ার আশঙ্কা নেই।”

একই সুরে কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, “দশকের পর দশক নির্বাচনের আগের দিনই ব্যালট পাঠানো হতো। শেখ হাসিনা রাতের ভোট চালু করে এই পদ্ধতিতে অবিশ্বাস তৈরি করে গেছেন। যদি নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের আচরণ নিরপেক্ষ হয়, তবে আগের দিন ব্যালট পাঠানো নিয়ে জামায়াতের আপত্তি নেই।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখলেও, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার ছিদ্রগুলো বন্ধ করা জরুরি। ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, যেখানে সুযোগ রাখা হয়, সেখানেই অনিয়মের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে, নাকি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে বিতর্কমুক্ত নির্বাচনের স্বার্থে সকালে ব্যালট পাঠানোর সিদ্ধান্তে ফিরে আসে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

ব্যালট যাবে আগের রাতে: ফিরছে কি ‘রাতের ভোটে’র পুরোনো শঙ্কা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:১১

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের একটি সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভোট গ্রহণের আগের দিনই কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। অথচ ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘রাতের ভোট’-এর অভিজ্ঞতার পর, ২০২৩ সালে হাবীবুল আউয়াল কমিশন স্বচ্ছতা ফেরাতে ভোটের দিন সকালে ব্যালট পাঠানোর নিয়ম চালু করেছিল। বর্তমান কমিশনের পুরোনো নিয়মে ফিরে যাওয়ার এই পদক্ষেপে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে—তবে কি আবারও ফিরছে অনিয়মের সুযোগ?

এবারের নির্বাচনে ভোট গ্রহণ ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। তাই সময়ের সমন্বয় করতে ভোট গ্রহণ শুরুর সময় সকাল ৮টার পরিবর্তে সাড়ে ৭টা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লজিস্টিক সুবিধার কথা চিন্তা করেই মূলত আগের দিন ব্যালট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তে মোটেও স্বস্তি পাচ্ছেন না নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

বিলুপ্ত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সভাপতি ও প্রখ্যাত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কারচুপির সুযোগ বন্ধে ভোটের দিন সকালে ব্যালট পাঠানো একটি ‘মীমাংসিত ব্যাপার’ ছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, “জয়ী হতে মরিয়া ব্যক্তিরা ২০১৮ সালের রাতের ভোটের অভিজ্ঞতা আগামীতে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারেন। যদি বাস্তবে রাতে অনিয়ম নাও হয়, পরাজিত প্রার্থীরা নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে রাতের ভোটের অভিযোগ তুলতে পারেন। তাই নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত রাখতে ব্যালট সকালেই পাঠানো উচিত।”

অতীতের পরিসংখ্যান ও অভিজ্ঞতা এই শঙ্কার ভিত্তি মজবুত করে। নূরুল হুদা কমিশনের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আগের রাতেই ব্যালট বাক্সে ভরার নজিরবিহীন অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তখন পুলিশ ও র‍্যাবের সহায়তায় রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা রাতভর ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করেছিলেন। ওই নির্বাচনে দেখানো হয়েছিল ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন, অথচ বাস্তবে কেন্দ্রগুলো ছিল ভোটারশূন্য। এমনকি ২১২টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার মতো অবিশ্বাস্য তথ্যও তখন দেওয়া হয়েছিল। সেই কলঙ্ক মুছতেই হাবীবুল আউয়াল কমিশন সকালে ব্যালট পাঠানোর প্রথা চালু করে, যার ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকৃত ভোটের হার কমে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে, যা ছিল বাস্তবসম্মত।

মজার বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞদের এমন উদ্বেগের বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের দিন ব্যালট পাঠানোয় বড় কোনো অসুবিধা দেখছেন না। তাঁর মতে, “যেখানে দিনের ভোট রাতে হওয়ার শঙ্কা থাকে, সেখানেই কেবল ঝুঁকি। কিন্তু এখন দিনের ভোট রাতে হওয়ার আশঙ্কা নেই।”

একই সুরে কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, “দশকের পর দশক নির্বাচনের আগের দিনই ব্যালট পাঠানো হতো। শেখ হাসিনা রাতের ভোট চালু করে এই পদ্ধতিতে অবিশ্বাস তৈরি করে গেছেন। যদি নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের আচরণ নিরপেক্ষ হয়, তবে আগের দিন ব্যালট পাঠানো নিয়ে জামায়াতের আপত্তি নেই।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখলেও, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার ছিদ্রগুলো বন্ধ করা জরুরি। ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, যেখানে সুযোগ রাখা হয়, সেখানেই অনিয়মের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে, নাকি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে বিতর্কমুক্ত নির্বাচনের স্বার্থে সকালে ব্যালট পাঠানোর সিদ্ধান্তে ফিরে আসে।