চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের যে ছয়টি দেশের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি তীব্র গরম বা ‘এক্সট্রিম হিট’-এর শিকার হবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের গবেষকদের পরিচালিত একটি নতুন আন্তর্জাতিক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (২৯ জানুয়ারি) প্রখ্যাত জার্নাল ‘নেচার সাসটেইনেবিলিটি’-তে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে তীব্র তাপপ্রবাহ জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। গবেষকদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে চরম উষ্ণতার শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
গবেষণার তথ্যমতে, যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি বৃদ্ধি পায়, তবে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪১ শতাংশ বা আনুমানিক ৩.৭৯ বিলিয়ন মানুষ চরম তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করবে। ২০১০ সালে এই হার ছিল ২৩ শতাংশ বা ১.৫৪ বিলিয়ন মানুষ।
গবেষক দলটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন জলবায়ু ও জনসংখ্যা মডেল ব্যবহার করে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ (সিডিডি) সূচকের মাধ্যমে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছে। এই সূচকটি মূলত নিরাপদ অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বজায় রাখতে কতটা শীতলীকরণের প্রয়োজন, তা পরিমাপ করে। যেসব অঞ্চলে বছরে ৩,০০০-এর বেশি সিডিডি রেকর্ড করা হয়, সেগুলোকে ‘চরম তাপ-প্রবণ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ফিলিপাইনের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ তীব্র গরমের ঝুঁকিতে রয়েছে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ও প্রধান লেখক ড. জেসুস লিজানা বলেন, জাতীয় গড় তাপমাত্রা অনেক সময় মানুষের মুখোমুখি হওয়া প্রকৃত ঝুঁকিকে আড়াল করে রাখে। বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ এমন এলাকায় বাস করে যেখানে বার্ষিক কুলিং চাহিদা ৩,০০০ সিডিডি ছাড়িয়ে যায়। এর অর্থ হলো, এখানকার মানুষ দীর্ঘস্থায়ী এবং বিপজ্জনক তাপের সংস্পর্শে থাকছে, যা তাদের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার ওপর প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপুর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার দিকে আন্তর্জাতিক নজর থাকলেও এই নতুন গবেষণায় ‘তীব্র গরম’কে একটি অতিরিক্ত ও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহর ও গ্রামীণ এলাকায় যেখানে শীতলীকরণ বা ফ্যানের সুবিধা সীমিত, সেখানে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘক্ষণ তীব্র গরমে থাকলে হিটস্ট্রোক, কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদরোগ এবং কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এর সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ে বয়স্ক, শিশু এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে, যেখানে জনসংখ্যার বড় একটি অংশ খোলা আকাশের নিচে বা কম বাতাস চলাচলকারী পরিবেশে কায়িক পরিশ্রমের কাজ করে, সেখানে তীব্র গরম শ্রম-উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়াতে পারে।
অক্সফোর্ডের গবেষণায় আরও ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম শীতলীকরণ বা এসির চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে। এর ফলে ‘কুলিং ট্র্যাপ’ বা শীতলীকরণ ফাঁদ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এসির চাহিদা মেটাতে যদি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে, তবে তা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করবে এবং যে গরম থেকে বাঁচতে মানুষ এসি ব্যবহার করবে, সেই গরমকেই আরও বাড়িয়ে তুলবে। গবেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
