সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য: সীসা দূষণে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য, ঝুঁকিতে ৩৬ লাখ শিশু

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে বাংলাদেশে ভয়াবহ সীসা দূষণ সংকট তৈরি হয়েছে। এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে শিশুরা, বিষাক্ত হয়ে উঠছে খাদ্য ও পানি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআর,বি এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র।

প্রতি বছর এসব যানবাহন থেকে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টন সীসা, অ্যাসিড ও ব্যাটারি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, যার সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা

আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের এক গবেষণায় ঢাকা ও এর আশপাশের ৫০০ শিশুর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতিটি শিশুর রক্তেই সীসার উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিপদসীমার (প্রতি লিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম) ওপরে। ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা কারখানা এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা অন্যদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

আইসিডিডিআর,বি-এর প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. মো. মাহবুবুর রহমান জানান, সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। এটি শিশুদের মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতি করে, আইকিউ কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি শেখার অক্ষমতা তৈরি করে। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা নিয়ে বসবাস করছে।

অবৈধ রিসাইক্লিং ও পরিবেশ দূষণ

বিআরটিএ-র তথ্যমতে, সারা দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলছে। এসব যানবাহনের ব্যাটারির মেয়াদ থাকে মাত্র ৬ থেকে ১২ মাস। ফলে ঘনঘন ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত ব্যাটারির প্রায় ৭০ শতাংশই অনিরাপদ পরিবেশে এবং কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই ভাঙা হয়। ঢাকা ও অন্যান্য শিল্প এলাকায় খোলা আকাশের নিচে হাতে ব্যাটারি ভেঙে সীসা গলানো হয়, যা বাতাস, মাটি ও পানিতে মিশে যাচ্ছে।

পরিবেশ গবেষকরা জানান, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকার বর্জ্য শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীতে মিশছে। এমনকি দেশের জাতীয় মাছ ইলিশেও সীসা, ক্যাডমিয়াম ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন সতর্ক করে বলেন, এটি এখন আর কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট।

শুধু পরিবেশ দূষণই নয়, ব্যাটারিচালিত এসব বাহন সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। সিপিডি-র গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ২০.৫২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ২১.০১ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও সিরাজগঞ্জের মতো শহরগুলোতে অবৈধ এসব যানের কারণে তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ চালকদের হাতে এসব গাড়ি থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় ব্যাটারি রিসাইক্লিং ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অনিরাপদ ও অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির (যেমন নিকেল-জিংক ব্যাটারি) দিকে ঝুঁকতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে হাইওয়েতে থ্রি-হুইলার নিষিদ্ধ এবং ঢাকায় লাইসেন্সবিহীন রিকশা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনার মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বুয়েটের নকশায় নিরাপদ ই-রিকশা চালুর পাইলট প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে।

তবে ইউথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান মনে করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে এখনই কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য: সীসা দূষণে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য, ঝুঁকিতে ৩৬ লাখ শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:৫৪

অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে বাংলাদেশে ভয়াবহ সীসা দূষণ সংকট তৈরি হয়েছে। এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে শিশুরা, বিষাক্ত হয়ে উঠছে খাদ্য ও পানি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআর,বি এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র।

প্রতি বছর এসব যানবাহন থেকে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টন সীসা, অ্যাসিড ও ব্যাটারি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, যার সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা

আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের এক গবেষণায় ঢাকা ও এর আশপাশের ৫০০ শিশুর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতিটি শিশুর রক্তেই সীসার উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিপদসীমার (প্রতি লিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম) ওপরে। ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা কারখানা এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা অন্যদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

আইসিডিডিআর,বি-এর প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. মো. মাহবুবুর রহমান জানান, সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। এটি শিশুদের মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতি করে, আইকিউ কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি শেখার অক্ষমতা তৈরি করে। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা নিয়ে বসবাস করছে।

অবৈধ রিসাইক্লিং ও পরিবেশ দূষণ

বিআরটিএ-র তথ্যমতে, সারা দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলছে। এসব যানবাহনের ব্যাটারির মেয়াদ থাকে মাত্র ৬ থেকে ১২ মাস। ফলে ঘনঘন ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত ব্যাটারির প্রায় ৭০ শতাংশই অনিরাপদ পরিবেশে এবং কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই ভাঙা হয়। ঢাকা ও অন্যান্য শিল্প এলাকায় খোলা আকাশের নিচে হাতে ব্যাটারি ভেঙে সীসা গলানো হয়, যা বাতাস, মাটি ও পানিতে মিশে যাচ্ছে।

পরিবেশ গবেষকরা জানান, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকার বর্জ্য শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীতে মিশছে। এমনকি দেশের জাতীয় মাছ ইলিশেও সীসা, ক্যাডমিয়াম ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন সতর্ক করে বলেন, এটি এখন আর কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট।

শুধু পরিবেশ দূষণই নয়, ব্যাটারিচালিত এসব বাহন সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। সিপিডি-র গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ২০.৫২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ২১.০১ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও সিরাজগঞ্জের মতো শহরগুলোতে অবৈধ এসব যানের কারণে তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ চালকদের হাতে এসব গাড়ি থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় ব্যাটারি রিসাইক্লিং ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অনিরাপদ ও অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির (যেমন নিকেল-জিংক ব্যাটারি) দিকে ঝুঁকতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে হাইওয়েতে থ্রি-হুইলার নিষিদ্ধ এবং ঢাকায় লাইসেন্সবিহীন রিকশা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনার মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বুয়েটের নকশায় নিরাপদ ই-রিকশা চালুর পাইলট প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে।

তবে ইউথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান মনে করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে এখনই কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।