ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি যখন সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগেই বিরোধী জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এই ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে এই চর্চা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২০৯টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন মন্ত্রিসভার শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ৭৭টি আসন নিয়ে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট।
শনিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই–শাল্লা) আসনের প্রার্থী শিশির মনির ঘোষণা দেন, ‘‘আমরা একটি শ্যাডো ক্যাবিনেট গঠন করব, ইনশাআল্লাহ।’’
তার এই ঘোষণার পর রোববার সকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও একই সুরে কথা বলেন। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রম তদারকিতে ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করার জন্য তারাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ আসলে কী?
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, শ্যাডো ক্যাবিনেট হলো বিরোধী দলের নেতার নেতৃত্বে গঠিত জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি দল। এরা সরকারি মন্ত্রিসভার সমান্তরালে ছায়ার মতো দায়িত্ব পালন করেন। শ্যাডো ক্যাবিনেটের প্রতিটি সদস্যকে দলের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন, সংসদে প্রশ্ন তোলেন এবং প্রয়োজনে চ্যালেঞ্জ জানান। এভাবে বিরোধী দল নিজেদের একটি ‘অপেক্ষমাণ সরকার’ বা বিকল্প সরকার হিসেবে তুলে ধরে।
ওয়েস্টমিনিস্টার ধারার গণতন্ত্রে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় এই রীতি নিয়মিত চর্চা হয়। সেখানে ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারি সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা বা বিধান নেই। এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দলের নিজস্ব উদ্যোগ ও সদিচ্ছার বিষয়। অতীতে বিভিন্ন সময় বড় রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলে থাকাকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু নেতাকে খাতভিত্তিক দায়িত্ব দিলেও তা কখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি ও তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখেন অনেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্যাডো ক্যাবিনেট শুধু সমালোচনার হাতিয়ার নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য একটি বড় প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র। এর মাধ্যমে দলীয় নেতারা প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট ও নীতিনির্ধারণ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বাংলাদেশে যদি সংসদীয় সংস্কৃতি আরও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে এই উদ্যোগ গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
