প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিনন্দন বার্তায় উঠে এসেছে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৫৫৫টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা বা ‘এন্ট্রি ইনটু ফোর্স’ (ইআইএফ) পেতে যাচ্ছে। ট্রাম্প তাঁর বার্তায় এই চুক্তিকে উভয় দেশের শ্রমিক ও কৃষকদের জন্য কল্যাণকর বলে উল্লেখ করলেও, দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
দেশীয় কৃষকদের জন্য এটি কতটা কল্যাণকর হবে, তা বিশ্লেষণ করতে গেলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ও গন্তব্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৬৩টি মৌলিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যসহ সাত শতাধিক কৃষিপণ্য রপ্তানি করে, যার অন্যতম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু এই চুক্তির আওতায় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ঢাকা প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার (৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার) কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি ডলার, যেখানে বাংলাদেশ রপ্তানি করে ৬০০ কোটি ডলার এবং আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য।
চুক্তির আওতায় আগামী পাঁচ বছরের প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম এবং এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৬ লাখ মেট্রিক টন বা ১২৫ কোটি ডলারের সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া তুলা আমদানির পরিকল্পনাও করা হয়েছে। চুক্তির পরপরই মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) শুল্কমুক্ত সুবিধায় বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ১ হাজার ৫৫৫টি পণ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জীবন্ত ভেড়া, ছাগল, হাঁস-মুরগি, হিমায়িত মাছ ও মাংস, কাঁকড়া, চিংড়ি, দুগ্ধজাত পণ্য, শাকসবজি এবং ফলমূল। অর্থাৎ, দেশের কৃষক ও খামারিরা যেসব পণ্য উৎপাদন করেন, তার বেশিরভাগই এখন বিনা শুল্কে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হবে, যা স্থানীয় বাজারকে চরম প্রতিযোগিতার মুখে ফেলবে।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত এক আলোচনায় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী জানান, চুক্তিতে তৈরি পোশাক খাতে সুতা বা তুলা আমদানির শর্তে ‘শূন্য শুল্ক’ সুবিধার কথা বলা হলেও, এটি পুরো মূল্যের ওপর নাকি কেবল সুতার দামের ওপর, তা স্পষ্ট নয়। এর ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি বাড়ার সম্ভাবনা নেই। উল্টো এই সুবিধা পেতে গিয়ে কৃষি, জ্বালানি ও অস্ত্র কেনায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল ছাড় দিতে হয়েছে। চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বা বিনিয়োগ আনতে এটি বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং ইপিজেডে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের শর্ত বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এই চুক্তিকে জনস্বার্থবিরোধী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ বলে মন্তব্য করেছেন গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি জানান, এই চুক্তির পেছনে কেবল বাণিজ্য নয়, ভূরাজনৈতিক উপাদানও কাজ করেছে এবং এটি করতে গিয়ে জনগণের স্বার্থকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। একই সুরে কথা বলেন গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক। তাঁর মতে, এই চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থকে বিপন্ন করবে এবং কৃষি, জ্বালানি, বিমান ও অস্ত্র কেনার প্রতিশ্রুতি দেশের জন্য নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।
চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। এটি বাস্তবায়নের আগে উভয় দেশের সংসদে পাস করতে হবে এবং বাংলাদেশকে আইন সংশোধন করতে হবে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে পাল্টা শুল্ক আরোপের বৈধতা নিয়ে মামলাও হয়েছে। এমতাবস্থায় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দেশীয় বাজার ও অর্থনীতিকে রক্ষায় নতুন নির্বাচিত সরকারকে অত্যন্ত পেশাদারত্ব ও কৌশলের সঙ্গে বিষয়টি সামাল দিতে হবে। অন্যথায় এই চুক্তি হিতে-বিপরীত হতে পারে।
