চট্টগ্রাম নগরে প্রকাশ্যে গুলি করা অস্ত্রধারীদের এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারে ‘এস ড্রাইভ’ নামে বিশেষ অভিযান চালালেও ছয় দিনে কাউকে আটক করা যায়নি। এতে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও পুলিশ বলছে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশের সোর্স দুর্বল হয়ে পড়া এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও কৌশলে সন্ত্রাসীদের এগিয়ে থাকায় তাদের ধরতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে থানা-পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ শাখাগুলোও অপরাধীদের নজরদারিতে রাখে। এ জন্য সোর্স নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে। সন্ত্রাসীদের পেছনে কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রযুক্তি ও সোর্সের মাধ্যমে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে সন্ত্রাসীদের অবস্থান শনাক্ত করা সহজ হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। ওই সময় বাসাটিতে পুলিশের পাঁচ সদস্য পাহারায় ছিলেন। গুলিতে বাসার জানালার কাচ ভেঙে যায়। এর আগে ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল। কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এ ঘটনায় জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন সন্ত্রাসী দুই হাতে দুটি পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ছে। বাকি তিনজনের মধ্যে একজনের হাতে ছিল সাবমেশিনগান (এসএমজি), একজনের কাছে চাইনিজ রাইফেল এবং আরেকজনের কাছে শটগান। মোস্তাফিজুর রহমানের দাবি, কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যেই এই গুলি চালানো হয়।
ঘটনার এত দিন পার হলেও শুক্রবার পর্যন্ত অস্ত্রধারী কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের দাবি, সন্ত্রাসীরা পাহাড়ি এলাকায় চলে গেছে, তবে তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো নগরের কোথাও থাকতে পারে। অস্ত্র বা সন্ত্রাসীদের অবস্থান এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় হতাশ স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জানান, তারা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন, কখন কী হয়ে যায় সেই শঙ্কায়।
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ জানান, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। নিয়মিত বিশেষ অভিযান চলছে, তাই নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
পুলিশের চলা বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ফল মেলেনি। জুয়াড়ি, কিশোর গ্যাং সদস্য ও মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হলেও গুলি করা সন্ত্রাসীদের কাউকে ধরা যায়নি। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ দিনের অভিযানে ২৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর মধ্যে গত সোমবার রাতে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী এলাকা থেকে ইসতিয়াক হাসান ও মো. জসিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার দুজন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী।
তবে এই দাবি অস্বীকার করেছেন সাজ্জাদ আলী। সংবাদমাধ্যমকে ফোনে তিনি জানান, ইসতিয়াক ২০২৩ সালে চালিতাতলীতে তার (সাজ্জাদের) বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর মামলার আসামি। তিনি কীভাবে তার সহযোগী হন, সেই প্রশ্ন তোলেন সাজ্জাদ।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি চালিতাতলী এলাকায় সাজ্জাদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তদন্ত শেষে নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক আরিফুর রহমান ইসতিয়াক হাসানসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। বর্তমানে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
এর আগে গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় জনসংযোগ চলাকালে গুলি করে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা নামের একজনকে হত্যা করা হয়। নিহত সরোয়ারের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা ছিল। নেতা-কর্মীদের ভিড়ের মধ্যে খুব কাছ থেকে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় প্রশিক্ষিত কোনো শুটার জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করে পুলিশ। তবে বাঁহাতি সেই শুটার কে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
নিহত সরোয়ারের ভাই আজিজ উদ্দিন জানান, চার মাস পার হলেও বাঁ হাতে গুলি করা সেই অস্ত্রধারীকে এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। উল্টো বড় সাজ্জাদ তাঁদের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
