সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

ভূমধ্যসাগরের নোনাজলে মিশে গেল ১৮ তরুণের ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

ইউরোপের রঙিন হাতছানি। সেই মোহে পড়ে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় ঘর ছেড়েছিলেন তারা। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নযাত্রা চিরতরে থমকে গেছে ভূমধ্যসাগরের অথৈ নোনাজলে। লিবিয়া থেকে রাবারের নৌকায় করে গ্রিস যাওয়ার পথে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে ১৮ বাংলাদেশির। স্বজনদের কাছে মৃতদেহগুলো পর্যন্ত ফেরেনি; দুদিন নৌকায় রাখার পর সাগরের বুকেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের নিথর দেহ। আর এদিকে সুনামগঞ্জ থেকে শুরু করে কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন কেবলই স্বজন হারানোর গগনবিদারী আর্তনাদ। বেঁচে ফেরা ২১ বাংলাদেশির চোখেমুখে এখন কেবলই মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসার ট্রমা।

স্বপ্নের সলিল সমাধি ও এক পিতার আহাজারি

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া মাঝপাড়া গ্রামের দুলন মিয়া। তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট নাঈম আহমেদ বাবাকে চায়ের দোকানে সাহায্য করতেন। কিন্তু চোখে ছিল ইউরোপের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে গত ৭ ডিসেম্বর দেশ ছাড়েন ২৪ বছরের এই তরুণ। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে দুলন মিয়া নিজের ১৬ শতকের বসতভিটা বন্ধক রেখে দালালকে তুলে দিয়েছিলেন ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু আজ তিনি একেবারেই নিঃস্ব। দুলন মিয়া ভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানান, ছেলে তো গেলই, এখন বাড়িঘরও হারালেন। ঋণ শোধ করে ভিটেমাটি উদ্ধার করার কোনো উপায় তার নেই, এমনকি ছেলের লাশটাও তিনি ছুঁয়ে দেখতে পারলেন না। দেশ ছাড়ার সময় ছেলের হাতে ৭০০ ডলার ও একটি মোবাইল ফোন দিয়েছিলেন তিনি। অন্যের ফোন থেকে মেসেজ পাঠিয়ে নাঈম জানাতেন খাবার ও পানির তীব্র কষ্টের কথা, দেশে ফেরার আকুতি। ২০ মার্চ আসে তার শেষ খুদে বার্তা, এরপর সব নীরব। কেবল নাঈম নন, জগন্নাথপুরের ইজাজুল হক, শায়েক আহমেদ, আমিনুর রহমান ও মো. আলীর পরিবারও ১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খুইয়ে আজ স্বজনহারা।

পথ হারানো নৌকায় বিভীষিকাময় ছয় দিন

জীবিত উদ্ধার হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীরা গ্রিসের কোস্টগার্ডকে জানিয়েছেন এক লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা। একটি ছোট নৌকায় ৪৩ জনকে গাদাগাদি করে তোলা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা এই রাবারের নৌকার চালক ছিলেন সুদানের এক নাগরিক। মাঝপথে তিনি মানচিত্র ও জিপিএস হারিয়ে ফেললে নৌকাটি দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে টানা ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে। ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানি। লিবিয়ার বন্দিশালায় আগে থেকেই অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা শরীরগুলো সমুদ্রের এই বৈরী পরিবেশ আর ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সইতে পারেনি। একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ২২ জন, যার মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি।

দালাল চক্রের লোভের বলি নিঃস্ব পরিবারগুলো

এই মরণযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র। নিহতদের পরিবার ও প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, এই দলটিকে লিবিয়ায় জড়ো করার পেছনে ভূমিকা রাখা দুজনকে এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার আজিজ মিয়া এবং ছাতক উপজেলার দুলাল মিয়া জনপ্রতি ১২ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে তারা বিদেশে আত্মগোপনে থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা জানিয়েছেন, গ্রিসে যাওয়ার পথে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়টি দূতাবাস নিশ্চিত করেছে এবং জড়িত দালালদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়াও স্থানীয় প্রশাসনকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন।

থামছে না মরণযাত্রা: পরিসংখ্যান কী বলছে?

এত প্রাণহানি, এত সতর্কতা, তবুও থামছে না ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপ যাওয়ার এই মরণখেলা। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মানব পাচারের ৩১৬টি মামলা তদন্তাধীন, যার মধ্যে ৩১টিই লিবিয়া-সংক্রান্ত। ব্র্যাকের তথ্যমতে, যুদ্ধ বা চরম দারিদ্র্যপীড়িত দেশ না হয়েও ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশিরা নিয়মিতভাবে শীর্ষ তালিকায় থাকছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই এক হাজার ৩৫৮ জন ইতালি এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রিসে প্রবেশ করেছে। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, মূলত শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকার মানুষ এই পথে বেশি পা বাড়ায়। দালালদের লোভনীয় ফাঁদে পড়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়। এই সংকট সমাধানে সাধারণ মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত অভিযান এবং অর্থের লেনদেন বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে ভূমধ্যসাগরের নোনাজল এভাবেই কেড়ে নেবে আরও শত শত তরুণের স্বপ্ন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

ভূমধ্যসাগরের নোনাজলে মিশে গেল ১৮ তরুণের ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৪

ইউরোপের রঙিন হাতছানি। সেই মোহে পড়ে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় ঘর ছেড়েছিলেন তারা। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নযাত্রা চিরতরে থমকে গেছে ভূমধ্যসাগরের অথৈ নোনাজলে। লিবিয়া থেকে রাবারের নৌকায় করে গ্রিস যাওয়ার পথে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে ১৮ বাংলাদেশির। স্বজনদের কাছে মৃতদেহগুলো পর্যন্ত ফেরেনি; দুদিন নৌকায় রাখার পর সাগরের বুকেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের নিথর দেহ। আর এদিকে সুনামগঞ্জ থেকে শুরু করে কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন কেবলই স্বজন হারানোর গগনবিদারী আর্তনাদ। বেঁচে ফেরা ২১ বাংলাদেশির চোখেমুখে এখন কেবলই মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসার ট্রমা।

স্বপ্নের সলিল সমাধি ও এক পিতার আহাজারি

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া মাঝপাড়া গ্রামের দুলন মিয়া। তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট নাঈম আহমেদ বাবাকে চায়ের দোকানে সাহায্য করতেন। কিন্তু চোখে ছিল ইউরোপের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে গত ৭ ডিসেম্বর দেশ ছাড়েন ২৪ বছরের এই তরুণ। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে দুলন মিয়া নিজের ১৬ শতকের বসতভিটা বন্ধক রেখে দালালকে তুলে দিয়েছিলেন ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু আজ তিনি একেবারেই নিঃস্ব। দুলন মিয়া ভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানান, ছেলে তো গেলই, এখন বাড়িঘরও হারালেন। ঋণ শোধ করে ভিটেমাটি উদ্ধার করার কোনো উপায় তার নেই, এমনকি ছেলের লাশটাও তিনি ছুঁয়ে দেখতে পারলেন না। দেশ ছাড়ার সময় ছেলের হাতে ৭০০ ডলার ও একটি মোবাইল ফোন দিয়েছিলেন তিনি। অন্যের ফোন থেকে মেসেজ পাঠিয়ে নাঈম জানাতেন খাবার ও পানির তীব্র কষ্টের কথা, দেশে ফেরার আকুতি। ২০ মার্চ আসে তার শেষ খুদে বার্তা, এরপর সব নীরব। কেবল নাঈম নন, জগন্নাথপুরের ইজাজুল হক, শায়েক আহমেদ, আমিনুর রহমান ও মো. আলীর পরিবারও ১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খুইয়ে আজ স্বজনহারা।

পথ হারানো নৌকায় বিভীষিকাময় ছয় দিন

জীবিত উদ্ধার হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীরা গ্রিসের কোস্টগার্ডকে জানিয়েছেন এক লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা। একটি ছোট নৌকায় ৪৩ জনকে গাদাগাদি করে তোলা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা এই রাবারের নৌকার চালক ছিলেন সুদানের এক নাগরিক। মাঝপথে তিনি মানচিত্র ও জিপিএস হারিয়ে ফেললে নৌকাটি দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে টানা ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে। ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানি। লিবিয়ার বন্দিশালায় আগে থেকেই অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা শরীরগুলো সমুদ্রের এই বৈরী পরিবেশ আর ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সইতে পারেনি। একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ২২ জন, যার মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি।

দালাল চক্রের লোভের বলি নিঃস্ব পরিবারগুলো

এই মরণযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র। নিহতদের পরিবার ও প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, এই দলটিকে লিবিয়ায় জড়ো করার পেছনে ভূমিকা রাখা দুজনকে এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার আজিজ মিয়া এবং ছাতক উপজেলার দুলাল মিয়া জনপ্রতি ১২ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে তারা বিদেশে আত্মগোপনে থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা জানিয়েছেন, গ্রিসে যাওয়ার পথে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়টি দূতাবাস নিশ্চিত করেছে এবং জড়িত দালালদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়াও স্থানীয় প্রশাসনকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন।

থামছে না মরণযাত্রা: পরিসংখ্যান কী বলছে?

এত প্রাণহানি, এত সতর্কতা, তবুও থামছে না ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপ যাওয়ার এই মরণখেলা। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মানব পাচারের ৩১৬টি মামলা তদন্তাধীন, যার মধ্যে ৩১টিই লিবিয়া-সংক্রান্ত। ব্র্যাকের তথ্যমতে, যুদ্ধ বা চরম দারিদ্র্যপীড়িত দেশ না হয়েও ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশিরা নিয়মিতভাবে শীর্ষ তালিকায় থাকছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই এক হাজার ৩৫৮ জন ইতালি এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রিসে প্রবেশ করেছে। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, মূলত শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকার মানুষ এই পথে বেশি পা বাড়ায়। দালালদের লোভনীয় ফাঁদে পড়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়। এই সংকট সমাধানে সাধারণ মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত অভিযান এবং অর্থের লেনদেন বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে ভূমধ্যসাগরের নোনাজল এভাবেই কেড়ে নেবে আরও শত শত তরুণের স্বপ্ন।