সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি, নিখোঁজ দেড় শতাধিক

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

সমুদ্রের ডাক শুনে বড় হয়েছেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি। শৈশবে কবে প্রথম নৌকায় ভেসে দরিয়ায় গিয়েছিলেন, চল্লিশোর্ধ মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি তা মনেও করতে পারেন না। দরিয়ার ভয় বলতে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির কাছে ছিল শুধু তুফান। সেই তুফান মোকাবিলা করে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বেশ কয়েকবার জীবন নিয়ে ঘরেও ফিরেছেন।

পোড় খাওয়া সেই মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির কাছে এখন দরিয়ায় তুফানের চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আরাকান আর্মি। যখন-তখন কোনো কারণ ছাড়াই সমুদ্র থেকে বাংলাদেশের জেলেদের নৌকাসহ অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি।

ছয় মাসের বেশি সময় আরাকান আর্মির হাতে বন্দি থাকার পর বাড়ি ফিরতে পারা সুঠাম দেহের মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি শরীরের চামড়া টেনে টেনে দাগ দেখিয়ে বিভীষিকার সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বলেন, হাড় আর চামড়া নিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন। শরীরে কোনো গোশত ছিল না। নির্যাতন করে আরাকান আর্মি মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির দুইটা দাঁত ভেঙে দিয়েছে।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহ পরীর দ্বীপের সৈকতে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি যখন কথা বলছিলেন, তখন পাশে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির দুই ছেলেও ছিল। ওই দুই ছেলেকেও মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির সঙ্গে গত বছরের (২০২৫ সালের) ৫ সেপ্টেম্বর অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল আরাকান আর্মি।

চলতি বছর (২০২৬ সালের) ১৬ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি ও তাঁর দুই ছেলে ছাড়া পেয়ে ফিরে আসেন। সন্তানসহ কেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝিদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তা এখনো মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির কাছে স্পষ্ট নয়।

ধরে নিয়ে যাওয়ার সেই দিনের কথা বলছিলেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি। মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি ঋণ করেই নতুন একটি ট্রলার তৈরি করেছিলেন। দুই ছেলেকে নিয়ে সেই ট্রলারে করে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি গিয়েছিলেন নাফ নদীতে মাছ ধরতে।

বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে, সে কারণে মাছ ধরতে গেলে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি সব সময় সতর্ক থাকতেন। সেদিনও মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি সতর্ক ছিলেন। বাংলাদেশের জলসীমাতেই মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি মাছ ধরছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি জানান, তাঁরা বাংলাদেশের অংশেই ছিলেন, আরাকান সীমান্তে ঢোকেননি। কিন্তু আরাকান আর্মি স্পিডবোট নিয়ে ধাওয়া করে। আরাকান আর্মির স্পিডবোট আর মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির ট্রলার। পালানোর তো সুযোগ নেই। অস্ত্রের মুখে দুই ছেলেসহ তাঁদের চারজনকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি।

দীর্ঘ ছয় মাস আরাকান আর্মির হাতে বন্দি ছিলেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি। মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি একা নন, আরও অনেকেই আছেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়া বেশি কষ্টের। দিনরাতে শুধু এক বেলা খাওয়া জোটে কপালে। দুই ছেলের কষ্ট দেখে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি মনকে ধরে রাখতে পারতেন না। আরকান আর্মির নির্যাতনে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির দুইটা দাঁত পড়ে গেছে।

মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বলছিলেন, তিনি ও তাঁর দুই ছেলে ফিরে এসেছেন। কিন্তু মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির ট্রলারটি ফেরত দেয়নি আরাকান আর্মি। অনেক ঋণ করে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি ট্রলারটি তৈরি করেছিলেন।

কেন ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখল, কেন নির্যাতন করল কিংবা কেনইবা ছেড়ে দিল—তা মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির কাছে মোটেও স্পষ্ট নয়। এখন একদিকে পরিবারের দায়, অন্যদিকে ঋণ শোধের চাপ। এই দুই চাপ সামাল দিতে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝিকে আবার সেই বিপদ মাথায় নিয়ে সমুদ্রে নামতে হচ্ছে। মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বলেন, এখন তাঁরা অসহায়। মাছ ধরার কাজ ছাড়া তো আর কিছু পারেন না। এটি ছাড়া পরিবার চালানো কোনোমতেই সম্ভব নয়।

ভয় লাগে না? আবার যদি আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়? এমন প্রশ্ন শুনে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বললেন, ভয় পেলে তো পেটে ভাত জুটত না। নিয়ে গেলে আর কী করার আছে! কতজনকেই তো আরাকান আর্মি নিয়ে যাচ্ছে। সবাই তো ফিরছেও না।

চারজন ফিরলেও আমান উল্লাহ ফেরেননি

মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অংশটি রাখাইন রাজ্য। যুদ্ধে জর্জরিত এ রাজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা এখন নিয়ন্ত্রণ করছে আরাকান আর্মি। সশস্ত্র এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বাংলাদেশি জেলে অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটছে।

এর মধ্যে দুটি নৌকা থেকে ১২ মার্চ তিনজন এবং ১৭ মার্চ আরও চারজনকে শাহপরীর দ্বীপসংলগ্ন নদীর মোহনা থেকে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায় বলে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির ভাষ্য। ধরে নিয়ে যাওয়া অনেক জেলেকে মুক্তিও দিয়েছে আরাকান আর্মি। জেলেদের ভাষ্য, শুরুর দিকে যাঁদের ধরে নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের অনেকেই মুক্তি পেয়ে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন।

সেই সময় অপহৃত ট্রলারও ফেরত দিত আরাকান আর্মি। কিন্তু এখন জেলে-মাঝি ফিরে এলেও মাছ ধরার ট্রলার কিংবা মালামাল ফেরত দিচ্ছে না। ট্রলারভর্তি মাছ মিয়ানমারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ফিরে আসা জেলেদের অনেকেই নির্যাতনের অভিযোগও করছেন।

এখন পর্যন্ত কতজন জেলে অপহৃত হয়েছেন, কত জেলে ফিরে এসেছেন, কত জেলে আরাকার আর্মির হাতে আটক আছেন, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। তবে জেলে সমিতি ও ট্রলার মালিক সমিতির ধারণা, আরাকান আর্মির হাতে আটক থাকা জেলের সংখ্যা দেড়শর কাছাকাছি হবে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সমুদ্রে মাছ ধরার সময় চার সঙ্গী ও ট্রলারসহ জেলে আমান উল্লাহকে (৫০) ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। জেলে আমান উল্লাহর বাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মাঝেরপাড়ায়। ১৬ ফেব্রুয়ারি চার সঙ্গীকে ছেড়ে দিলেও আরাকান আর্মি জেলে আমান উল্লাহকে মুক্তি দেয়নি।

জেলে আমান উল্লাহর ছেলে জিল্লুর রহমান বলেন, বাবা আমান উল্লাহ বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেটাও জিল্লুর রহমান জানেন না। বাবা আমান উল্লাহ না থাকায় জিল্লুর রহমানের সংসারে কোনো শান্তি নেই। পরিবার খুব আর্থিক কষ্টের মধ্যে আছে। বাবা আমান উল্লাহকে উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন জিল্লুর রহমান।

অভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জিল্লুর রহমান। জিল্লুর রহমান বলেন, যাঁরা ফিরে এসেছেন তাঁদের সঙ্গে জিল্লুর রহমানের কথা হয়েছে। সেই জেলেরা জিল্লুর রহমানকে জানিয়েছেন, আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যাওয়ার পর একেকজনকে একেক জায়গায় রাখে। তাঁরা চারজন এক ক্যাম্পে ছিলেন। তাঁদের চারজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমান উল্লাহর ব্যাপারে তাঁরা আর কিছু জানেন না।

একই অবস্থা টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সাজেদা বেগমের। সাজেদা বেগমের স্বামী আবদুস শুকুর ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আরাকান আর্মির হাতে বন্দি। সাজেদা বেগম বলছিলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে স্বামী আবদুস শুকুর অপহৃত হওয়ার পর বিজিবি ও উপজেলা প্রশাসনকে সাজেদা বেগম লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে আরকান আর্মির বন্দিশালা থেকে ৭৩ জেলে ফিরে এলেও সাজেদা বেগমের স্বামী আবদুস শুকুর ফেরেননি। ছয় মাসের মধ্যে একবারও স্বামী আবদুস শুকুরের সঙ্গে সাজেদা বেগমের যোগাযোগ হয়নি।

সাজেদা বেগম বলেন, নিজের দেশের সীমানার মধ্যে মাছ ধরাও এখন নিরাপদ না। আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়। সরকার নিরাপত্তা দিতে পারে না। অবিলম্বে স্বামী আবদুস শুকুরকে উদ্ধারে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান সাজেদা বেগম।

ঘরে ঘরে কান্নার রোল

টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন জেলেপাড়ায় অনেক পরিবারই এখন আরাকান আর্মির আতঙ্কে ভুগছে। পরিবারের কর্তা বা সন্তান সাগরে মাছ ধরতে গেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত ওই পরিবারগুলো দুশ্চিন্তায় থাকে। স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন তাঁরা।

শাহ পরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়ার মাহামুদুল্লাহর ট্রলারে করে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মাছ শিকারে যান মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম, মোহাম্মদ আব্বাস ও আবুল হোসন। এক মাসের বেশি সময় পার হলেও মাহামুদুল্লাহর ট্রলারে যাওয়া মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম, মোহাম্মদ আব্বাস ও আবুল হোসনের কোনো খোঁজ নেই।

নিখোঁজ জেলে মোহাম্মদ আব্বাসের স্ত্রী শামসুন্নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, স্বামী মোহাম্মদ আব্বাস এবং মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম ও আবুল হোসন বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন—তা শামসুন্নাহার জানেন না। আরকান আর্মি বাংলাদেশের জেলেদের ধরে নিয়ে গেলে অনেক সময় মিয়ানমারের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে জেলেদের ছবি প্রকাশিত হয়। এখনো পর্যন্ত মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম, মোহাম্মদ আব্বাস ও আবুল হোসনের ছবি কেউ কোথাও দেখেননি।

শামসুন্নাহার বলেন, দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে শামসুন্নাহারের কষ্টের জীবন যাচ্ছে। স্বামী মোহাম্মদ আব্বাসই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। ছেলেমেয়েরা শুধু জিজ্ঞেস করে, বাবা মোহাম্মদ আব্বাস কবে আসবে।

একই পাড়ার নিখোঁজ জেলে আবুল হোসেনের স্ত্রী খুরশিদা বেগম বলেন, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য আবুল হোসেনকে হারিয়ে এখন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন খুরশিদা বেগম। স্বামী আবুল হোসেনের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন খুরশিদা বেগম। টাকার অভাবে খুরশিদা বেগমের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

জেলেরা কি মিয়ানমারে ঢুকছেন?

ফিরে আসা অনেক জেলে এবং মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই নাফ সীমানায় মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু তার পরও কিছু জেলে ট্রলার নিয়ে সেখানে মাছ ধরতে যান এবং বিপদে পড়েন।

শাহ পরীর দ্বীপ বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান বলেন, নাফ নদীর মোহনায় নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় ডুবোচরের কারণে বাংলাদেশ অংশে পানির গভীরতা কমে গেছে। কিন্তু মিয়ানমারের জলসীমা ঘেঁষে পানির গভীরতা বেশি থাকায় অনেকে ভাটার সময় সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন বলে মোহাম্মদ হাসান জানান।

তবে এর বাইরে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে। মাছ ধরার সময় তীব্র স্রোতে কখনো কখনো নৌকা ভেসে মিয়ানমারের অংশে চলে যায়। একই কথা বলেছেন নৌকার মাঝি নুরুল আলম। মাঝি নুরুল আলমের ভাষায়, আগেও বিভিন্ন সময় বাস্তবতার কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু তখন মিয়ানমার আটকায়নি। এখন আরাকান আর্মি আসার পরে কড়াকড়ি শুরু করেছে বলে মাঝি নুরুল আলম জানান।

সমিতির সভাপতি গফুর আলম বলেন, রাখাইন রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নাফ নদের মিয়ানমার অংশে মাছ ধরায় একধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মি বাংলাদেশি জেলেদেরও মাছ ধরার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করছে বলে গফুর আলম অভিযোগ করেন।

গফুর আলম আরও বলেন, সাগর থেকে মাছ ধরে ফেরার সময় অস্ত্রের মুখে জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। জেলেরা এখন সাগরে যেতে ভয় পান। এভাবে চলতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ করে দিতে হবে।

গফুর আলমের দাবি, বিভিন্ন সময় নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে ট্রলারসহ ধরে নিয়ে যাওয়া অন্তত ১৪০ জেলে আরাকান আর্মির হাতে জিম্মি রয়েছেন। ওই জেলেদের কারও কোনো খোঁজখবর গফুর আলমরা পাচ্ছেন না। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হচ্ছে না। যত দ্রুত সম্ভব আটক জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান গফুর আলম।

এ জন্য মিয়ানমার সীমান্তে নাফ নদী ও সাগরপথে সীমানা চিহ্নিত না থাকাকে ‘মূল সমস্যা’ বলে মনে করেন সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, নাফ নদীর মোহনা এখন কেবল সীমান্ত নয়; এটি হয়ে উঠেছে জেলেদের জীবিকার ঝুঁকি। প্রায় সময় নাফ নদীর মোহনা থেকে জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি।

ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম আরও বলেন, সীমানা চিহ্নিত না থাকায় জেলেরা বুঝতে পারেন না কোন সীমানায় আছেন। এ ছাড়া অনেক সময় জোয়ারের পানিতে ভেসে জেলেরা মিয়ানমারের সীমানায় চলে যান। প্রশাসন ঘাটে গিয়ে জেলেদের সতর্ক করছে। কিন্তু তার পরও কাজ হচ্ছে না বলে আব্দুস সালাম উল্লেখ করেন।

‘সতর্ক থাকতে হবে’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্য দখলের পর প্রায়ই নাফ নদী ও সাগর থেকে বাংলাদেশি জেলেদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম জানান, এখন মিয়ানমারে কত জেলে আটক রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কারণ, অনেক সময় আটক জেলে পরিবারগুলো উপজেলা প্রশাসনকে জানায় না। ধরে নিয়ে যাওয়া জেলেদের ফেরত আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম নিশ্চিত করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, তাঁরা আশাবাদী, অপহৃত জেলেরা দ্রুত ফিরে আসবেন। তবে জেলেদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন তাঁরা বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রম না করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি, নিখোঁজ দেড় শতাধিক

নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৭

সমুদ্রের ডাক শুনে বড় হয়েছেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি। শৈশবে কবে প্রথম নৌকায় ভেসে দরিয়ায় গিয়েছিলেন, চল্লিশোর্ধ মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি তা মনেও করতে পারেন না। দরিয়ার ভয় বলতে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির কাছে ছিল শুধু তুফান। সেই তুফান মোকাবিলা করে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বেশ কয়েকবার জীবন নিয়ে ঘরেও ফিরেছেন।

পোড় খাওয়া সেই মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির কাছে এখন দরিয়ায় তুফানের চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আরাকান আর্মি। যখন-তখন কোনো কারণ ছাড়াই সমুদ্র থেকে বাংলাদেশের জেলেদের নৌকাসহ অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি।

ছয় মাসের বেশি সময় আরাকান আর্মির হাতে বন্দি থাকার পর বাড়ি ফিরতে পারা সুঠাম দেহের মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি শরীরের চামড়া টেনে টেনে দাগ দেখিয়ে বিভীষিকার সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বলেন, হাড় আর চামড়া নিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন। শরীরে কোনো গোশত ছিল না। নির্যাতন করে আরাকান আর্মি মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির দুইটা দাঁত ভেঙে দিয়েছে।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহ পরীর দ্বীপের সৈকতে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি যখন কথা বলছিলেন, তখন পাশে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির দুই ছেলেও ছিল। ওই দুই ছেলেকেও মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির সঙ্গে গত বছরের (২০২৫ সালের) ৫ সেপ্টেম্বর অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল আরাকান আর্মি।

চলতি বছর (২০২৬ সালের) ১৬ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি ও তাঁর দুই ছেলে ছাড়া পেয়ে ফিরে আসেন। সন্তানসহ কেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝিদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তা এখনো মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির কাছে স্পষ্ট নয়।

ধরে নিয়ে যাওয়ার সেই দিনের কথা বলছিলেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি। মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি ঋণ করেই নতুন একটি ট্রলার তৈরি করেছিলেন। দুই ছেলেকে নিয়ে সেই ট্রলারে করে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি গিয়েছিলেন নাফ নদীতে মাছ ধরতে।

বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে, সে কারণে মাছ ধরতে গেলে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি সব সময় সতর্ক থাকতেন। সেদিনও মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি সতর্ক ছিলেন। বাংলাদেশের জলসীমাতেই মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি মাছ ধরছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি জানান, তাঁরা বাংলাদেশের অংশেই ছিলেন, আরাকান সীমান্তে ঢোকেননি। কিন্তু আরাকান আর্মি স্পিডবোট নিয়ে ধাওয়া করে। আরাকান আর্মির স্পিডবোট আর মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির ট্রলার। পালানোর তো সুযোগ নেই। অস্ত্রের মুখে দুই ছেলেসহ তাঁদের চারজনকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি।

দীর্ঘ ছয় মাস আরাকান আর্মির হাতে বন্দি ছিলেন মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি। মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি একা নন, আরও অনেকেই আছেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়া বেশি কষ্টের। দিনরাতে শুধু এক বেলা খাওয়া জোটে কপালে। দুই ছেলের কষ্ট দেখে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি মনকে ধরে রাখতে পারতেন না। আরকান আর্মির নির্যাতনে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির দুইটা দাঁত পড়ে গেছে।

মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বলছিলেন, তিনি ও তাঁর দুই ছেলে ফিরে এসেছেন। কিন্তু মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির ট্রলারটি ফেরত দেয়নি আরাকান আর্মি। অনেক ঋণ করে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি ট্রলারটি তৈরি করেছিলেন।

কেন ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখল, কেন নির্যাতন করল কিংবা কেনইবা ছেড়ে দিল—তা মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝির কাছে মোটেও স্পষ্ট নয়। এখন একদিকে পরিবারের দায়, অন্যদিকে ঋণ শোধের চাপ। এই দুই চাপ সামাল দিতে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝিকে আবার সেই বিপদ মাথায় নিয়ে সমুদ্রে নামতে হচ্ছে। মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বলেন, এখন তাঁরা অসহায়। মাছ ধরার কাজ ছাড়া তো আর কিছু পারেন না। এটি ছাড়া পরিবার চালানো কোনোমতেই সম্ভব নয়।

ভয় লাগে না? আবার যদি আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়? এমন প্রশ্ন শুনে মোহাম্মদ ইলিয়াস মাঝি বললেন, ভয় পেলে তো পেটে ভাত জুটত না। নিয়ে গেলে আর কী করার আছে! কতজনকেই তো আরাকান আর্মি নিয়ে যাচ্ছে। সবাই তো ফিরছেও না।

চারজন ফিরলেও আমান উল্লাহ ফেরেননি

মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অংশটি রাখাইন রাজ্য। যুদ্ধে জর্জরিত এ রাজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা এখন নিয়ন্ত্রণ করছে আরাকান আর্মি। সশস্ত্র এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বাংলাদেশি জেলে অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটছে।

এর মধ্যে দুটি নৌকা থেকে ১২ মার্চ তিনজন এবং ১৭ মার্চ আরও চারজনকে শাহপরীর দ্বীপসংলগ্ন নদীর মোহনা থেকে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায় বলে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির ভাষ্য। ধরে নিয়ে যাওয়া অনেক জেলেকে মুক্তিও দিয়েছে আরাকান আর্মি। জেলেদের ভাষ্য, শুরুর দিকে যাঁদের ধরে নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের অনেকেই মুক্তি পেয়ে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন।

সেই সময় অপহৃত ট্রলারও ফেরত দিত আরাকান আর্মি। কিন্তু এখন জেলে-মাঝি ফিরে এলেও মাছ ধরার ট্রলার কিংবা মালামাল ফেরত দিচ্ছে না। ট্রলারভর্তি মাছ মিয়ানমারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ফিরে আসা জেলেদের অনেকেই নির্যাতনের অভিযোগও করছেন।

এখন পর্যন্ত কতজন জেলে অপহৃত হয়েছেন, কত জেলে ফিরে এসেছেন, কত জেলে আরাকার আর্মির হাতে আটক আছেন, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। তবে জেলে সমিতি ও ট্রলার মালিক সমিতির ধারণা, আরাকান আর্মির হাতে আটক থাকা জেলের সংখ্যা দেড়শর কাছাকাছি হবে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সমুদ্রে মাছ ধরার সময় চার সঙ্গী ও ট্রলারসহ জেলে আমান উল্লাহকে (৫০) ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। জেলে আমান উল্লাহর বাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মাঝেরপাড়ায়। ১৬ ফেব্রুয়ারি চার সঙ্গীকে ছেড়ে দিলেও আরাকান আর্মি জেলে আমান উল্লাহকে মুক্তি দেয়নি।

জেলে আমান উল্লাহর ছেলে জিল্লুর রহমান বলেন, বাবা আমান উল্লাহ বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেটাও জিল্লুর রহমান জানেন না। বাবা আমান উল্লাহ না থাকায় জিল্লুর রহমানের সংসারে কোনো শান্তি নেই। পরিবার খুব আর্থিক কষ্টের মধ্যে আছে। বাবা আমান উল্লাহকে উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন জিল্লুর রহমান।

অভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জিল্লুর রহমান। জিল্লুর রহমান বলেন, যাঁরা ফিরে এসেছেন তাঁদের সঙ্গে জিল্লুর রহমানের কথা হয়েছে। সেই জেলেরা জিল্লুর রহমানকে জানিয়েছেন, আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যাওয়ার পর একেকজনকে একেক জায়গায় রাখে। তাঁরা চারজন এক ক্যাম্পে ছিলেন। তাঁদের চারজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমান উল্লাহর ব্যাপারে তাঁরা আর কিছু জানেন না।

একই অবস্থা টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সাজেদা বেগমের। সাজেদা বেগমের স্বামী আবদুস শুকুর ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আরাকান আর্মির হাতে বন্দি। সাজেদা বেগম বলছিলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে স্বামী আবদুস শুকুর অপহৃত হওয়ার পর বিজিবি ও উপজেলা প্রশাসনকে সাজেদা বেগম লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে আরকান আর্মির বন্দিশালা থেকে ৭৩ জেলে ফিরে এলেও সাজেদা বেগমের স্বামী আবদুস শুকুর ফেরেননি। ছয় মাসের মধ্যে একবারও স্বামী আবদুস শুকুরের সঙ্গে সাজেদা বেগমের যোগাযোগ হয়নি।

সাজেদা বেগম বলেন, নিজের দেশের সীমানার মধ্যে মাছ ধরাও এখন নিরাপদ না। আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়। সরকার নিরাপত্তা দিতে পারে না। অবিলম্বে স্বামী আবদুস শুকুরকে উদ্ধারে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান সাজেদা বেগম।

ঘরে ঘরে কান্নার রোল

টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন জেলেপাড়ায় অনেক পরিবারই এখন আরাকান আর্মির আতঙ্কে ভুগছে। পরিবারের কর্তা বা সন্তান সাগরে মাছ ধরতে গেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত ওই পরিবারগুলো দুশ্চিন্তায় থাকে। স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন তাঁরা।

শাহ পরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়ার মাহামুদুল্লাহর ট্রলারে করে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মাছ শিকারে যান মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম, মোহাম্মদ আব্বাস ও আবুল হোসন। এক মাসের বেশি সময় পার হলেও মাহামুদুল্লাহর ট্রলারে যাওয়া মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম, মোহাম্মদ আব্বাস ও আবুল হোসনের কোনো খোঁজ নেই।

নিখোঁজ জেলে মোহাম্মদ আব্বাসের স্ত্রী শামসুন্নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, স্বামী মোহাম্মদ আব্বাস এবং মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম ও আবুল হোসন বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন—তা শামসুন্নাহার জানেন না। আরকান আর্মি বাংলাদেশের জেলেদের ধরে নিয়ে গেলে অনেক সময় মিয়ানমারের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে জেলেদের ছবি প্রকাশিত হয়। এখনো পর্যন্ত মোহাম্মদ শাহেদ, মোহাম্মদ ইউনুস, শাহ আলম, মোহাম্মদ আব্বাস ও আবুল হোসনের ছবি কেউ কোথাও দেখেননি।

শামসুন্নাহার বলেন, দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে শামসুন্নাহারের কষ্টের জীবন যাচ্ছে। স্বামী মোহাম্মদ আব্বাসই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। ছেলেমেয়েরা শুধু জিজ্ঞেস করে, বাবা মোহাম্মদ আব্বাস কবে আসবে।

একই পাড়ার নিখোঁজ জেলে আবুল হোসেনের স্ত্রী খুরশিদা বেগম বলেন, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য আবুল হোসেনকে হারিয়ে এখন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন খুরশিদা বেগম। স্বামী আবুল হোসেনের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন খুরশিদা বেগম। টাকার অভাবে খুরশিদা বেগমের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

জেলেরা কি মিয়ানমারে ঢুকছেন?

ফিরে আসা অনেক জেলে এবং মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই নাফ সীমানায় মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু তার পরও কিছু জেলে ট্রলার নিয়ে সেখানে মাছ ধরতে যান এবং বিপদে পড়েন।

শাহ পরীর দ্বীপ বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান বলেন, নাফ নদীর মোহনায় নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় ডুবোচরের কারণে বাংলাদেশ অংশে পানির গভীরতা কমে গেছে। কিন্তু মিয়ানমারের জলসীমা ঘেঁষে পানির গভীরতা বেশি থাকায় অনেকে ভাটার সময় সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন বলে মোহাম্মদ হাসান জানান।

তবে এর বাইরে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে। মাছ ধরার সময় তীব্র স্রোতে কখনো কখনো নৌকা ভেসে মিয়ানমারের অংশে চলে যায়। একই কথা বলেছেন নৌকার মাঝি নুরুল আলম। মাঝি নুরুল আলমের ভাষায়, আগেও বিভিন্ন সময় বাস্তবতার কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু তখন মিয়ানমার আটকায়নি। এখন আরাকান আর্মি আসার পরে কড়াকড়ি শুরু করেছে বলে মাঝি নুরুল আলম জানান।

সমিতির সভাপতি গফুর আলম বলেন, রাখাইন রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নাফ নদের মিয়ানমার অংশে মাছ ধরায় একধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মি বাংলাদেশি জেলেদেরও মাছ ধরার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করছে বলে গফুর আলম অভিযোগ করেন।

গফুর আলম আরও বলেন, সাগর থেকে মাছ ধরে ফেরার সময় অস্ত্রের মুখে জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। জেলেরা এখন সাগরে যেতে ভয় পান। এভাবে চলতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ করে দিতে হবে।

গফুর আলমের দাবি, বিভিন্ন সময় নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে ট্রলারসহ ধরে নিয়ে যাওয়া অন্তত ১৪০ জেলে আরাকান আর্মির হাতে জিম্মি রয়েছেন। ওই জেলেদের কারও কোনো খোঁজখবর গফুর আলমরা পাচ্ছেন না। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হচ্ছে না। যত দ্রুত সম্ভব আটক জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান গফুর আলম।

এ জন্য মিয়ানমার সীমান্তে নাফ নদী ও সাগরপথে সীমানা চিহ্নিত না থাকাকে ‘মূল সমস্যা’ বলে মনে করেন সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, নাফ নদীর মোহনা এখন কেবল সীমান্ত নয়; এটি হয়ে উঠেছে জেলেদের জীবিকার ঝুঁকি। প্রায় সময় নাফ নদীর মোহনা থেকে জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি।

ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম আরও বলেন, সীমানা চিহ্নিত না থাকায় জেলেরা বুঝতে পারেন না কোন সীমানায় আছেন। এ ছাড়া অনেক সময় জোয়ারের পানিতে ভেসে জেলেরা মিয়ানমারের সীমানায় চলে যান। প্রশাসন ঘাটে গিয়ে জেলেদের সতর্ক করছে। কিন্তু তার পরও কাজ হচ্ছে না বলে আব্দুস সালাম উল্লেখ করেন।

‘সতর্ক থাকতে হবে’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্য দখলের পর প্রায়ই নাফ নদী ও সাগর থেকে বাংলাদেশি জেলেদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম জানান, এখন মিয়ানমারে কত জেলে আটক রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কারণ, অনেক সময় আটক জেলে পরিবারগুলো উপজেলা প্রশাসনকে জানায় না। ধরে নিয়ে যাওয়া জেলেদের ফেরত আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম নিশ্চিত করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, তাঁরা আশাবাদী, অপহৃত জেলেরা দ্রুত ফিরে আসবেন। তবে জেলেদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন তাঁরা বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রম না করেন।