রাত তখন একটা। সীতাকুণ্ডের আলীনগর স্কুলে স্থাপিত যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্যরা। নিস্তব্ধ রাত। হঠাৎ চারপাশের পাহাড়ি টিনের ঘর থেকে শুরু হলো গুলিবর্ষণ।
পরিকল্পিত। সুচিন্তিত। মারাত্মক।
টিনের দেয়াল ও চালে ছোট ছোট ছিদ্র করে আগে থেকেই ফায়ারিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যৌথ বাহিনী পাল্টা অবস্থান নেয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গোলাগুলি। পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এদিকে গোলাগুলির মধ্যেই সন্ত্রাসীদের আরেকটি দল হামলা চালায় পাশের নির্মাণাধীন যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে। সেখানে রাখা একটি এক্সকাভেটর ব্যবহার করে ভেঙে ফেলা হয় ভবনের বিভিন্ন অংশ।
রবিবার (২৪ মে) মধ্যরাতের এই ঘটনায় আবারও প্রমাণ হলো, জঙ্গল সলিমপুরে এখনও সন্ত্রাসীদের আধিপত্য শেষ হয়নি। এখানে এখনও রাষ্ট্রের চেয়ে বড় অন্য এক শক্তি।
‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর স্থানীয়দের কাছে বহুদিন ধরেই পরিচিত ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ হিসেবে। এখানে রাষ্ট্রের আইন-কানুনের চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বিশাল অবৈধ বসতি। প্লট বাণিজ্য। চাঁদাবাজি। সশস্ত্র আধিপত্য। বছরের পর বছর ধরে এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন এক জনপদে পরিণত হয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি র্যাবের অভিযানে কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব নিহত ও আরও তিন সদস্য আহত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে যৌথ বাহিনীর বড় অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার ও একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে দাবি করা হয়, জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে এসেছে রাষ্ট্রের হাতে।
কিন্তু রবিবার মধ্যরাতের হামলা প্রমাণ করল, সেই দাবি ছিল অকাল।
যে ক্যাম্পের উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল সাত দিন পর
রবিবার রাতে যে নির্মাণাধীন ক্যাম্পটি ভেঙে ফেলা হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সেটির উদ্বোধনের কথা ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্বোধনের সাত দিন আগে সেই ক্যাম্প ভেঙে ফেলা। এটি কোনো সাধারণ সন্ত্রাসী কার্যক্রম নয়। এটি একটি বার্তা। রাষ্ট্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ।
র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “রবিবার রাত ১টার দিকে ইয়াছিন গ্রুপের ২০০ থেকে ৩০০ সশস্ত্র ব্যক্তি যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল।”
দুইশো থেকে তিনশো সশস্ত্র ব্যক্তি। অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। পরিকল্পিত হামলা। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর: এক্সকাভেটর দিয়ে ক্যাম্প ভেঙে ফেলার সাহস।
এটি কোনো বিক্ষিপ্ত সন্ত্রাসী দল নয়। এটি একটি সংগঠিত বাহিনী।
কীভাবে জন্ম নিল এই সন্ত্রাসী রাজ্য
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠে অবৈধ বসতি ও প্লট বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক।
অভিযোগ রয়েছে, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন ৩৪টি পাহাড় কেটে প্রায় ৫৮৬ একর সরকারি জমিতে প্রায় ১৪ হাজার প্লট তৈরি করেছে। অন্যদিকে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি’ আরও তিনটি পাহাড় কেটে ২৩৬ একর জমিতে আড়াই হাজারের বেশি প্লট তৈরি করেছে।
এসব প্লট ৫ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
ভূমি অফিসের জরিপে অন্তত ৩৭টি পাহাড় কাটার প্রমাণ মিলেছে।
পাহাড় কাটাকে কেন্দ্র করে চালু রয়েছে কথিত ‘টোকেন সিস্টেম’। প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে টোকেন কিনে পাহাড় কাটার অনুমতি নেওয়া হয়। পরে সেই জমি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আলী আক্কাস থেকে ইয়াছিন
স্থানীয়দের দাবি, নব্বইয়ের দশকে দুর্ধর্ষ ভূমিদস্যু আলী আক্কাস প্রথম এ এলাকায় আধিপত্য গড়ে তোলেন। তার হাত ধরেই শুরু হয় পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখল।
২০১০ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারে আলী আক্কাস নিহত হওয়ার পর তার অনুসারীরা এলাকা নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে রোকন মেম্বার, মশিউর, ইয়াছিন, ফারুক, গাজী সাদেক, গফুর মেম্বার, রিপন ও আল আমিন সাগরসহ একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ চলছে।
রবিবারের হামলায় ইয়াছিন গ্রুপ জড়িত বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
২০০৩ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন মোহাম্মদ ইয়াছিন। শুরুতে একটি জুট মিলে চাকরি করলেও পরে জঙ্গল সলিমপুরে বসবাস শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতে।
পুলিশের ভয় আছে—এমন অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য—সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী। পরে পুরো এলাকাই পরিণত হয় সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটিতে।
বারবার হামলার শিকার
রবিবারের ঘটনাই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে জঙ্গল সলিমপুরে।
গত ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি টিম অভিযানে গেলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। সেদিন শহীদ হন র্যাব কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব। আহত হন আরও তিন সদস্য।
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বড়ইতলা এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলার শিকার হন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ওই ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।
২০২২ সালেও র্যাব, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে।
যে টাকার লোভে চলছে রক্তারক্তি
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরে যেই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইয়াছিন, রোকনসহ সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এলাকাটিতে কোটি কোটি টাকার স্বার্থ জড়িত। সেই আধিপত্য ধরে রাখতেই সন্ত্রাসীরা হামলা চালাচ্ছে।”
হিসাব করলে চমকে যেতে হয়। মাত্র দুটি সংগঠন প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ প্লট তৈরি করেছে। প্রতিটি প্লট যদি গড়ে ৭ লাখ টাকা দরেও বিক্রি হয়, তাহলে মোট টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১,৫৫০ কোটি টাকা।
এগারো হাজার কোটি টাকার বেশি।
এই বিশাল অঙ্কের টাকা ছাড়তে কেউ রাজি নয়। তাই মৃত্যু হোক, হামলা হোক, র্যাব ক্যাম্প ভাঙতে হোক—সব করতে প্রস্তুত তারা।
রাষ্ট্র কি পারবে?
লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। কয়েকজন সদস্য সামান্য আহত হলেও কেউ নিহত হননি।”
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “দ্রুত সড়ক নির্মাণ ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি শুধু সড়ক নির্মাণে কাজ হবে? যে সন্ত্রাসীরা এক্সকাভেটর দিয়ে র্যাব ক্যাম্প ভেঙে ফেলতে পারে, তারা সড়কও তো ভেঙে ফেলতে পারে।
জঙ্গল সলিমপুর এখন একটি পরীক্ষা। রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃঢ়তার পরীক্ষা। এবং সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষা।
কারণ এগারো হাজার কোটি টাকার এই অবৈধ ব্যবসা রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া এতদিন চলতে পারে না। এখানে জড়িত আছে প্রভাবশালীরা। জড়িত আছে স্বার্থের জটিল জাল।
রাষ্ট্র কি সেই জাল ছিঁড়তে পারবে?
নাকি আবারও জঙ্গল সলিমপুর থেকে যাবে ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ হিসেবে?
উত্তর পাওয়া যাবে আগামী কয়েক মাসে। যখন দেখা যাবে, ইয়াছিন, রোকনদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যখন দেখা যাবে, ১৬ হাজার প্লটের মালিকানা কার কাছে। যখন দেখা যাবে, এগারো হাজার কোটি টাকার এই কালো টাকা কাদের পকেটে গেছে।
জঙ্গল সলিমপুর এখন রাষ্ট্রের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। হার মানলে এরকম আরও দশটি জঙ্গল সলিমপুর জন্ম নেবে দেশজুড়ে।
জিততেই হবে রাষ্ট্রকে। নইলে আইনের শাসন শুধু একটি কথার কথাই থেকে যাবে।
