মারারা স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম লাউঞ্জে সেদিন একটি চেয়ারও ভরেনি। খাবার টেবিল সাজানো হয়নি, বুফে বসেনি, পানীয়ের কোনো আয়োজন নেই। ডারউইনের মানুষ তৃতীয় দিনেই বুঝে নিয়েছিলেন- এই টেস্টে আর কিছু দেখার নেই। লাউঞ্জের টিকিট কাটেননি কেউ।
অথচ মাঠে তখনো খেলা চলছে।
চতুর্থ দিন সকালে যে কজন অস্ট্রেলিয়ান দর্শক এসেছিলেন, তারা দুবার হাততালি দিলেন। একবার যখন ইনিংস হার এড়াল তাদের দল, আরেকবার ক্যামেরন গ্রিনের সেঞ্চুরিতে। সেই হাততালি প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না গ্যালারির ফাঁকে।
ওদিকে গ্যালারিজুড়ে একটাই চিৎকার- ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।’
মিরাজের ঘূর্ণিতে ভেঙে পড়ে অস্ট্রেলিয়া
সকালের আলো ফোটার আগেই জানা ছিল দিনটা কোথায় যাবে। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস ৪২৬। অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেছে ২২৮ রানের ঘাটতি নিয়ে, হাতে ৬ উইকেট। ইনিংস হার ঠেকাতে এখনো ৬৭ রান দরকার।
মেহেদী হাসান মিরাজ সেদিন সহজভাবেই কাজ শুরু করলেন। ক্যামেরন গ্রিনের পায়ের কাছের ফুটমার্কগুলো বেছে বেছে বল ফেললেন অফ স্টাম্পের বাইরে। টার্ন নিল, লাফাল, কখনো কানা ছুঁয়ে চলে গেল উইকেটকিপারের গ্লাভসে। লাঞ্চের আগে তিনটি উইকেট।
ইনিংসের ৬০তম ওভারে একটি বল বাঁক খেয়ে সামান্য লাফাল। বো ওয়েবস্টার কট বিহাইন্ড। তারপর ৬৬, ৭৪ আর ৯৬—প্যাট কামিন্স আর নাথান লায়নও ফিরলেন। টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৫তম বার পাঁচ উইকেট।
লাঞ্চ বিরতিতে ব্রেন্ডন জুলিয়ানের প্রশ্নে মিরাজ বললেন সহজ কথা—উইকেট খুঁজিনি প্রতিটি ওভারে, শৃঙ্খলা ধরে রেখেছি শুধু।
গ্রিন একাই লড়লেন ১০৪ রান নিয়ে। কিন্তু বাকি ব্যাটসম্যানরা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতাই সারলেন মাঠে নেমে। দুই ইনিংসে একাই নয়টি উইকেট নিলেন পেসার হাসান মাহমুদ—গ্রিনের উইকেটটিও তার।
শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া থামল ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য মাত্র ৫৭।
ড্রেসিংরুমে আলিঙ্গন, মাঠে বাংলাদেশ
দ্বিতীয় ওভারেই তানজিদ হাসান বোল্ড হলেন হ্যাজলউডের বলে। কিন্তু সাদমান ইসলাম আর মুমিনুল হক মাঠে থাকলেন শেষ পর্যন্ত। ৫৭ রানের লক্ষ্য- শেষটা তো জানাই ছিল।
বো ওয়েবস্টারের বলে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি মারলেন মুমিনুল। সেটিই জয়সূচক রান। সাদমান ২৫, মুমিনুল অপরাজিত ৩০।
গ্যালারিতে তখন বাংলাদেশ প্রবাসীদের হাততালি আর চিৎকারের ঢেউ। ড্রেসিংরুমের সামনে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরছেন ক্রিকেটাররা। অস্ট্রেলিয়ান শিবির পুরোপুরি স্তব্ধ।
ডারউইন সেই মুহূর্তে হয়ে উঠল যেন সত্যিকারের বাংলাদেশ।
২০১৭ সালে মিরপুরে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেবার নিজের মাঠে। এবার ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এসে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে- একদিনেরও বেশি সময় হাতে রেখে।
ইতিহাসের পাতায় বিজয়ীরাই থাকেন। পরাজিতদের নাম আসে কেবল প্রসঙ্গক্রমে।
