শুক্রবার সকাল তখন ৯টা। সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারির ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে স্বাভাবিক কাজই চলছিল। শ্রমিক শুভ জলদাস এবং তার সতীর্থরা এমটি রাসি জাহাজের তলায় একটি ট্যাংক কাটছিলেন। হঠাৎ কিছু একটা ঘটল। দেখতে পাওয়া যায় না, গন্ধ টের পাওয়ার আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন একের পর এক শ্রমিক। বর্ণহীন, গন্ধহীন নয়- বরং পচা ডিমের মতো গন্ধওয়ালা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ততক্ষণে গ্রাস করে নিয়েছে নয়টি জীবন।
অথচ এই জাহাজটিকে ভাঙার আগে পাঁচটি সংস্থা পরিদর্শন করে নিরাপদ ঘোষণা করেছিল। সরকারের চারটি সংস্থা এবং একটি বেসরকারি সেফটি এজেন্সি সনদ দিয়েছিল- এই জাহাজ ভাঙা নিরাপদ। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডও অনুমোদন দিয়েছিল। তবু নয় শ্রমিক মারা গেলেন। প্রশ্ন উঠেছে- কোথায় ছিল এই নিরাপত্তার আসল ফাঁক?
কাগজে নিরাপদ, বাস্তবে মৃত্যুফাঁদ
গত বছরের ১১ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি ও বেসরকারি শিপ স্ট্রিপের প্রতিনিধিরা মিলে পরিদর্শন করেন প্রায় ৯৪ হাজার টনের জাহাজ এমটি রাসি। পরের মাসেই মিলল নিরাপত্তা সনদ।
কিন্তু পরিদর্শন প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, সেখানে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো গ্যাস বা পদার্থের উল্লেখ নেই। স্লাজ অয়েল, লুব অয়েল, গ্লাসউল, এসবেস্টস, পেইন্টসহ ১৬ ধরনের পদার্থের কথা আছে—কিন্তু হাইড্রোজেন সালফাইডের নাম নেই। জাহাজ আমদানির সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া বিপজ্জনক পদার্থের তালিকাতেও একই চিত্র।
রহস্য আরও গভীর হয় পরিদর্শনের পদ্ধতি জানলে। পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পরিদর্শন মূলত হয় জাহাজের ডেক থেকে। কেউ জাহাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে চায় না। একেকটি জাহাজের উচ্চতা ৫ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত, কিন্তু পরিদর্শন হয় মাত্র এক-দুই তলা সমান এলাকায়।
ঝুঁকির কারণে পরিদর্শক দল জাহাজের কফারড্যাম এলাকায়ও নামেনি। ডেক থেকে রিফ্লেক্টর দিয়ে দূর থেকে ট্যাংক দেখেই নিরাপত্তা সনদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে- পেশাগত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে বাহ্যিক দৃশ্যমান বিপজ্জনক পদার্থ শনাক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা এখানেই- জাহাজের ভেতরে যেসব বিষাক্ত গ্যাস থাকে, তা খালি চোখে দেখা যায় না। আর জাহাজভাঙার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কাছে গ্যাস শনাক্ত করার মতো যন্ত্রপাতিও নেই।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের উপপ্রধান তোফাজ্জেল হোসাইন বলেছেন, গ্যাস ফ্রি সনদটি এক বছর আগের। তাঁরা শুধু পেট্রোলিয়ামজাতীয় গ্যাস আছে কি না, সেটা দেখেন। পরিদর্শনে হাইড্রোজেন সালফাইডের অস্তিত্ব পাননি বলে জানান তিনি।
কাগজের তালিকায় ছিল না বিষের হদিস
জাহাজটির আইএইচএম (ইনভেন্টরি অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস) তৈরি করেছিল সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান মেটিজফট এশিয়া। তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে- জাহাজের বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে সব স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। সরকারি কর্তৃপক্ষ ও গ্রাহকের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেছে তারা। এবং পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে- এই তথ্যের কারণে কোনো ক্ষতি হলে তারা দায়ী নয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এই কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেন, জাহাজের প্রকৃত মালিকানা লুকিয়ে কিছু কোম্পানি ফ্ল্যাগ পরিবর্তন করে জাহাজ কিনে বাংলাদেশের ইয়ার্ডে বিক্রি করে। এই ‘ক্যাশ বায়ার’রা আইএইচএমের মতো দেখতে একটি নথি জমা দেয়, যেখানে বর্জ্যের প্রকৃত তথ্য থাকে না। আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও শিল্প মন্ত্রণালয় এই অসত্য তালিকা গ্রহণ করে জাহাজ আমদানির অনুমোদন দেয়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে, শ্রমিক মরেন।
শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক শফিউল আলম স্বীকার করেছেন, একটি জাহাজ সম্পূর্ণ না ভাঙা পর্যন্ত কাঠামোর কোথায় কী বিষাক্ত পদার্থ লুকিয়ে আছে, তা জানা যায় না। তিনি বলেছেন, ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষেরও গাফিলতি ছিল—কাজে নামার আগে গ্যাস ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
তদন্তকারীরাও যেতে পারেননি ঘটনাস্থলে
দুর্ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও শিপব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন তিনটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু তিন দিন পার হয়ে গেলেও গ্যাসের তীব্রতার কারণে তদন্তকারীদের কেউ দুর্ঘটনাস্থলে পা রাখতে পারেননি।
শেষমেশ বুয়েটের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খানের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের বিশেষায়িত দল গঠন করা হয়েছে। আজ সোমবার তারা কাজ শুরু করেছেন। তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা।
এদিকে বিলসের হিসাব বলছে ভিন্ন এক নির্মম সত্য। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে মারা গেছেন ১৩৭ শ্রমিক। সর্বশেষ ৯ জনকে যোগ করলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১৪৯। প্রতিটি মৃত্যুর পর তদন্ত কমিটি হয়, সুপারিশ আসে। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামে না।
একটি জাহাজকে নিরাপদ বলার আগে কি সত্যিই নিশ্চিত করা হয় সেটি নিরাপদ? নাকি কাগজে সই করা হয় শুধু, আর ঝুঁকিটা থেকে যায় শ্রমিকের কাঁধে?
