সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

চট্টগ্রাম ওয়াসা: মিটার নষ্ট আট মাস, বিল এল ৮০ হাজার

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

শাহনাজ আক্তারের স্বামী নেই। পটিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আদু তালুকদারের বাড়িতে কোনোমতে সংসার চালান তিনি। কয়েক দিন আগে হাতে পেলেন একটি কাগজ- চট্টগ্রাম ওয়াসার বিল, ১০ হাজার ৬৮১ টাকা। একসঙ্গে। কোনো আগাম নোটিস নেই, কোনো মাসিক বিল নেই- সংযোগ নেওয়ার পর থেকে একটি বিলও পাননি তিনি। এখন এক ধাক্কায় দশ হাজারের বেশি।

“এত টাকা কোথা থেকে আনব?”- প্রশ্নটা করতে করতে চোখ ভিজে এল শাহনাজের।

শুধু শাহনাজ নন। পটিয়ায় ওয়াসার শত শত গ্রাহকের এখন একই অবস্থা। কারও বিল এসেছে ৮৮ হাজার টাকা, কারও এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে পটিয়া ওয়াসা কার্যালয়ে তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংস্থার সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পটিয়ার ইন্দ্রপুল এলাকার ওয়াসা কার্যালয়ের সামনে ভিড় জমছে বিপাকে পড়া মানুষদের।

মিটার নষ্ট আট মাস, বিল এল ৮০ হাজার

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাসাসের সেক্রেটারি নাছির উদ্দীন পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তাঁর বাড়ির ওয়াসার মিটারটি আট মাস ধরে বিকল। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বারবার। কোনো ব্যবস্থা হয়নি। সপ্তাহখানেক আগে ডাকপিয়নের হাত থেকে যে খামটি পেলেন, তাতে লেখা ৮০ হাজার টাকার বেশি।

একই রকম অভিজ্ঞতা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস এলাকার বাসিন্দা আহমদ নবীর। তাঁর বিল এসেছে ৮৮ হাজার ২৬৪ টাকা।

পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সামশুল আলম বলেন, “সংযোগ নেওয়ার পর অনেকবার ওয়াসা কার্যালয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছি- বিল দেওয়া হচ্ছে না কেন? এক বছর পর এসে দিল এক লাখ এক হাজার ৭২০ টাকার বিল। এই টাকা কোথা থেকে আসবে?”

কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো

চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) পটিয়ায় কাজ শুরু করে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। এরপর থেকে পৌরসভার আটটি ওয়ার্ডে আড়াই হাজারের বেশি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের আগস্টের মাঝামাঝি থেকে গ্রাহকদের কাছে বিল পাঠানো শুরু হয়। তারপর থেকেই আসতে শুরু করে অভিযোগের স্রোত।

পটিয়া ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া শাকিল বলেন, নিচু স্থানে মিটার বসানোর কারণে পানি ঢুকে অনেক মিটার নষ্ট হয়েছে। সেগুলো অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে মিটার নষ্টের দায় কার- সেই প্রশ্নের সরাসরি জবাব মেলেনি। মিটার নষ্ট থাকলেও কেন গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিল দেওয়া হলো, সে বিষয়ে রাজস্ব বিভাগের দিকে দায় ঠেলে দিলেন তিনি।

আরও একটি তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াসার নিয়ম অনুযায়ী, সংযোগ নেওয়ার পর মিটার বুঝে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন এক ইউনিট হিসেবে বিল যুক্ত হয়- পানি ব্যবহার না করলেও। অর্থাৎ বাড়িতে কেউ না থাকলেও, মিটার নষ্ট থাকলেও- বিল চলতেই থাকবে। এই নিয়মের কথা সংযোগ নেওয়ার সময় কতজন গ্রাহককে জানানো হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।

পটিয়া ওয়াসার রাজস্ব তত্ত্বাবধায়ক মো. সালাহ উদ্দিন জানান, জমা পড়া তিন শতাধিক অভিযোগের বিলগুলো কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কিস্তির সুযোগ- এটুকুই এখন পাওয়া গেছে। কিন্তু যে বিল এসেছে, সেটা আদৌ সঠিক কি না, নষ্ট মিটারের হিসাব কীভাবে কষা হয়েছে, এত মাস ধরে বিল না দিয়ে একসঙ্গে দেওয়ার পেছনে কোনো পদ্ধতিগত ত্রুটি আছে কি না- এই প্রশ্নগুলোর জবাব এখনো মেলেনি।

শাহনাজ আক্তার আবার পটিয়া ওয়াসা কার্যালয়ে যাবেন। সঙ্গে থাকবেন আরও অনেকে। তাঁদের হাতে থাকবে সেই কাগজগুলো- যে বিল তাঁরা বোঝেন না, মানতে পারেন না, কিন্তু না দিলেও পারবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

চট্টগ্রাম ওয়াসা: মিটার নষ্ট আট মাস, বিল এল ৮০ হাজার

রবিউল হোসেন
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৯:১৫

শাহনাজ আক্তারের স্বামী নেই। পটিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আদু তালুকদারের বাড়িতে কোনোমতে সংসার চালান তিনি। কয়েক দিন আগে হাতে পেলেন একটি কাগজ- চট্টগ্রাম ওয়াসার বিল, ১০ হাজার ৬৮১ টাকা। একসঙ্গে। কোনো আগাম নোটিস নেই, কোনো মাসিক বিল নেই- সংযোগ নেওয়ার পর থেকে একটি বিলও পাননি তিনি। এখন এক ধাক্কায় দশ হাজারের বেশি।

“এত টাকা কোথা থেকে আনব?”- প্রশ্নটা করতে করতে চোখ ভিজে এল শাহনাজের।

শুধু শাহনাজ নন। পটিয়ায় ওয়াসার শত শত গ্রাহকের এখন একই অবস্থা। কারও বিল এসেছে ৮৮ হাজার টাকা, কারও এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে পটিয়া ওয়াসা কার্যালয়ে তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংস্থার সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পটিয়ার ইন্দ্রপুল এলাকার ওয়াসা কার্যালয়ের সামনে ভিড় জমছে বিপাকে পড়া মানুষদের।

মিটার নষ্ট আট মাস, বিল এল ৮০ হাজার

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাসাসের সেক্রেটারি নাছির উদ্দীন পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তাঁর বাড়ির ওয়াসার মিটারটি আট মাস ধরে বিকল। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বারবার। কোনো ব্যবস্থা হয়নি। সপ্তাহখানেক আগে ডাকপিয়নের হাত থেকে যে খামটি পেলেন, তাতে লেখা ৮০ হাজার টাকার বেশি।

একই রকম অভিজ্ঞতা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস এলাকার বাসিন্দা আহমদ নবীর। তাঁর বিল এসেছে ৮৮ হাজার ২৬৪ টাকা।

পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সামশুল আলম বলেন, “সংযোগ নেওয়ার পর অনেকবার ওয়াসা কার্যালয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছি- বিল দেওয়া হচ্ছে না কেন? এক বছর পর এসে দিল এক লাখ এক হাজার ৭২০ টাকার বিল। এই টাকা কোথা থেকে আসবে?”

কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো

চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) পটিয়ায় কাজ শুরু করে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। এরপর থেকে পৌরসভার আটটি ওয়ার্ডে আড়াই হাজারের বেশি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের আগস্টের মাঝামাঝি থেকে গ্রাহকদের কাছে বিল পাঠানো শুরু হয়। তারপর থেকেই আসতে শুরু করে অভিযোগের স্রোত।

পটিয়া ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া শাকিল বলেন, নিচু স্থানে মিটার বসানোর কারণে পানি ঢুকে অনেক মিটার নষ্ট হয়েছে। সেগুলো অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে মিটার নষ্টের দায় কার- সেই প্রশ্নের সরাসরি জবাব মেলেনি। মিটার নষ্ট থাকলেও কেন গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিল দেওয়া হলো, সে বিষয়ে রাজস্ব বিভাগের দিকে দায় ঠেলে দিলেন তিনি।

আরও একটি তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াসার নিয়ম অনুযায়ী, সংযোগ নেওয়ার পর মিটার বুঝে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন এক ইউনিট হিসেবে বিল যুক্ত হয়- পানি ব্যবহার না করলেও। অর্থাৎ বাড়িতে কেউ না থাকলেও, মিটার নষ্ট থাকলেও- বিল চলতেই থাকবে। এই নিয়মের কথা সংযোগ নেওয়ার সময় কতজন গ্রাহককে জানানো হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।

পটিয়া ওয়াসার রাজস্ব তত্ত্বাবধায়ক মো. সালাহ উদ্দিন জানান, জমা পড়া তিন শতাধিক অভিযোগের বিলগুলো কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কিস্তির সুযোগ- এটুকুই এখন পাওয়া গেছে। কিন্তু যে বিল এসেছে, সেটা আদৌ সঠিক কি না, নষ্ট মিটারের হিসাব কীভাবে কষা হয়েছে, এত মাস ধরে বিল না দিয়ে একসঙ্গে দেওয়ার পেছনে কোনো পদ্ধতিগত ত্রুটি আছে কি না- এই প্রশ্নগুলোর জবাব এখনো মেলেনি।

শাহনাজ আক্তার আবার পটিয়া ওয়াসা কার্যালয়ে যাবেন। সঙ্গে থাকবেন আরও অনেকে। তাঁদের হাতে থাকবে সেই কাগজগুলো- যে বিল তাঁরা বোঝেন না, মানতে পারেন না, কিন্তু না দিলেও পারবেন না।