দেশের সর্বোচ্চ সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা বিসিএসে লাখো প্রার্থী আবেদন করলেও যোগ্য প্রার্থীর অভাবে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকছে। বিশেষ করে টেকনিক্যাল ও পেশাগত ক্যাডারে এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সর্বশেষ ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে এই সংকটের করুণ চিত্র সামনে এসেছে। গত ২৮ জুন প্রকাশিত এই ফলে তিন হাজার ৪৮৭টি ক্যাডার পদের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) মাত্র এক হাজার ৩২০ জনকে সুপারিশ করেছে।
এর ফলে দুই হাজার ১৬৭টি বা প্রায় ৬২ দশমিক ১ শতাংশ ক্যাডার পদ শূন্য থেকে গেছে। অথচ এই বিসিএসে অংশ নিতে প্রায় পৌনে চার লাখ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছিলেন।
প্রথম দফায় ক্যাডারের পাশাপাশি আরও ২০১ জনকে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। তবে সংশোধিত ফলে প্রাণিসম্পদ (লাইভস্টক) ক্যাডারে নতুন করে আরও ১৪ জনকে সুপারিশ করা হয়েছে।
পিএসসি সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি বিসিএস পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করতে রাষ্ট্রের অন্তত ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা ব্যয় হয়।
যোগ্য প্রার্থীর অভাবে পদ শূন্য থাকায় একদিকে বেকারত্বের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম জানান, চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষা ও প্রাণিসম্পদসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্যাডারে পর্যাপ্ত যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রার্থীরা নির্ধারিত ন্যূনতম নম্বর অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ায় কমিশনের পক্ষে মানদণ্ড শিথিল করার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
সংকটের উদাহরণ হিসেবে শিক্ষা ক্যাডারের বাংলা বিষয়ের প্রভাষক পদের কথা বলা যায়। ১৩২টি পদের বিপরীতে ১৫ হাজার ১৬৮ জন আবেদন করলেও চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ১০ জন।
ওই বিষয়ে প্রিলিমিনারিতে ১৭৬ জন এবং লিখিত পরীক্ষায় মাত্র ১৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও চারবারের বিসিএস পরীক্ষার্থী শাহেদুল আকবর রণ জানান, ৪৭তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতে মাত্র ১০ হাজার ৬৪৪ জনকে উত্তীর্ণ করা হয়।
পরে লিখিত পরীক্ষায় তিন হাজার ৬৩১ জন এবং মৌখিক পরীক্ষা শেষে ক্যাডারে মাত্র এক হাজার ৩২০ জন সুপারিশ পান।
আগের বিসিএসগুলোর চূড়ান্ত ফলেও প্রার্থী সুপারিশের সংখ্যা কমতে দেখা গেছে। ৪৬তম বিসিএসে এক হাজার ৪৫৭ জন, ৪৫তমে এক হাজার ৮০৭ জন, ৪৪তমে এক হাজার ৬৮১ জন এবং ৪৩তমে দুই হাজার ৬৪ জনকে সুপারিশ করা হয়েছিল।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার জানান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও চিকিৎসার মতো খাতে সরকারি ও বেসরকারি চাকরির সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান থাকায় মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এই ব্যবধান না কমালে টেকনিক্যাল ক্যাডারে শূন্য পদ পূরণে সমস্যা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি মনে করেন।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষক মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া জানান, রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে নিয়োগ পরীক্ষার কাঠামো, প্রার্থী নির্বাচনের নীতি এবং সামগ্রিক বাছাই প্রক্রিয়াকে সময়োপযোগী করে পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
অন্যথায় প্রতিবছরই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ শূন্য থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
