সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

সিস্টেম লসের আড়ালে সিইউএফএলে কোটি টাকার লোপাট!

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

কারখানা বন্ধ। উৎপাদন নেই। তবু প্রতিদিন ফাইলে জমছে কোটি টাকার ‘সিস্টেম লস’। রক্ষণাবেক্ষণের নামে ব্যয়ের খাতা ফুলছে। আর সেই আড়ালে রাষ্ট্রীয় কারখানার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে পাশের বাজারের দোকানে, বসতবাড়িতে- প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে (সিইউএফএল) চলছে এই অনিয়মের মহোৎসব। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ রেখে একদিকে দৈনিক গড়ে প্রায় দুই কোটি টাকা উৎপাদনজনিত ক্ষতি দেখানো হচ্ছে, অন্যদিকে কাগজ-কলমে কাল্পনিক ‘সিস্টেম লস’ ও ‘রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়’ দেখিয়ে লোপাট হচ্ছে সরকারি রাজস্ব।

বন্ধ কারখানায় চলছে বিদ্যুৎ বিক্রির কারসাজি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিইউএফএলের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য একটি শক্তিশালী ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। নিয়ম ভেঙে সেই প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ কারখানার নিজস্ব মিটার ব্যবহার করে বাইরে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে।

তিনটি সুনির্দিষ্ট মিটারের মাধ্যমে রাঙ্গাদিয়া বাজারের শতাধিক দোকান ও সংলগ্ন বসতবাড়িতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। কারখানা বন্ধ থাকলেও এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহকে ‘সিস্টেম লস’ ও ‘অভ্যন্তরীণ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়’ হিসেবে খাতায় তুলে রাখা হচ্ছে।

ফাইলে বাড়ছে সিস্টেম লসের অঙ্ক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিইউএফএলের একজন প্রধান প্রকৌশলী জানান, ভারী শিল্পে কারখানা চালু বা বন্ধ থাকার সময় কারিগরি কারণে ৫ থেকে ৭ শতাংশ সিস্টেম লস স্বাভাবিক ধরা হয়। কিন্তু সিইউএফএলের ক্ষেত্রে তা কখনো কখনো অস্বাভাবিক রূপ নেয়।

তিনি বলেন, “অনেক সময় যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত ও উৎপাদন ঘাটতি ঢাকতে অনভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনার কারণে সিস্টেম লসের অঙ্কটা ফাইলপত্রে বাড়িয়ে দেখানো হয়।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কারখানা যখন গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে থাকে না, তখনও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের একটি বড় অংশকে ‘সিস্টেম লস’ ও ‘রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়’ হিসেবে ফাইলবন্দি করা হয়।

এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাংবাদিককে প্রবেশে বাধা

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিইউএফএলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই অভিযোগের তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে সরাসরি সিইউএফএল গেটে গেলে নিরাপত্তা রক্ষীরা সাংবাদিক প্রবেশে বাধা দেন। পরে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনো সাড়া দেননি।

তবে এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকের কাছে তিনি বলেছিলেন, “সিস্টেম লসের হিসাব সম্পূর্ণ কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী করা হয়, এখানে কোনো কারসাজির সুযোগ নেই। বাইরে বিদ্যুৎ বিক্রির যে অভিযোগ উঠেছে, তা আমি দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগ

শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন দমাতে কারখানার শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে পকেট কমিটি গঠনের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি এবং দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি কারখানাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভেতরের দুর্নীতি ও অপচয় রোধ না করতে পারলে কারখানা চললেও লোকসান থামবে না।

বিসিআইসির কঠোর হুঁশিয়ারি

সার্বিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদে কোনো ধরনের লুটপাট বা কারসাজি বরদাশত করা হবে না। সিইউএফএলের সিস্টেম লসের নামে ভুয়া হিসাব দেখানো হলে এবং ক্যাপটিভ প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ অবৈধভাবে বিক্রির প্রমাণ মিললে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

তিনি আরও জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জবাবদিহিতাসহ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিসিআইসি থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

সিস্টেম লসের আড়ালে সিইউএফএলে কোটি টাকার লোপাট!

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৩১

কারখানা বন্ধ। উৎপাদন নেই। তবু প্রতিদিন ফাইলে জমছে কোটি টাকার ‘সিস্টেম লস’। রক্ষণাবেক্ষণের নামে ব্যয়ের খাতা ফুলছে। আর সেই আড়ালে রাষ্ট্রীয় কারখানার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে পাশের বাজারের দোকানে, বসতবাড়িতে- প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে (সিইউএফএল) চলছে এই অনিয়মের মহোৎসব। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ রেখে একদিকে দৈনিক গড়ে প্রায় দুই কোটি টাকা উৎপাদনজনিত ক্ষতি দেখানো হচ্ছে, অন্যদিকে কাগজ-কলমে কাল্পনিক ‘সিস্টেম লস’ ও ‘রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়’ দেখিয়ে লোপাট হচ্ছে সরকারি রাজস্ব।

বন্ধ কারখানায় চলছে বিদ্যুৎ বিক্রির কারসাজি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিইউএফএলের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য একটি শক্তিশালী ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। নিয়ম ভেঙে সেই প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ কারখানার নিজস্ব মিটার ব্যবহার করে বাইরে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে।

তিনটি সুনির্দিষ্ট মিটারের মাধ্যমে রাঙ্গাদিয়া বাজারের শতাধিক দোকান ও সংলগ্ন বসতবাড়িতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। কারখানা বন্ধ থাকলেও এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহকে ‘সিস্টেম লস’ ও ‘অভ্যন্তরীণ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়’ হিসেবে খাতায় তুলে রাখা হচ্ছে।

ফাইলে বাড়ছে সিস্টেম লসের অঙ্ক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিইউএফএলের একজন প্রধান প্রকৌশলী জানান, ভারী শিল্পে কারখানা চালু বা বন্ধ থাকার সময় কারিগরি কারণে ৫ থেকে ৭ শতাংশ সিস্টেম লস স্বাভাবিক ধরা হয়। কিন্তু সিইউএফএলের ক্ষেত্রে তা কখনো কখনো অস্বাভাবিক রূপ নেয়।

তিনি বলেন, “অনেক সময় যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত ও উৎপাদন ঘাটতি ঢাকতে অনভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনার কারণে সিস্টেম লসের অঙ্কটা ফাইলপত্রে বাড়িয়ে দেখানো হয়।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কারখানা যখন গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে থাকে না, তখনও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের একটি বড় অংশকে ‘সিস্টেম লস’ ও ‘রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়’ হিসেবে ফাইলবন্দি করা হয়।

এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাংবাদিককে প্রবেশে বাধা

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিইউএফএলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই অভিযোগের তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে সরাসরি সিইউএফএল গেটে গেলে নিরাপত্তা রক্ষীরা সাংবাদিক প্রবেশে বাধা দেন। পরে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনো সাড়া দেননি।

তবে এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকের কাছে তিনি বলেছিলেন, “সিস্টেম লসের হিসাব সম্পূর্ণ কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী করা হয়, এখানে কোনো কারসাজির সুযোগ নেই। বাইরে বিদ্যুৎ বিক্রির যে অভিযোগ উঠেছে, তা আমি দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগ

শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন দমাতে কারখানার শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে পকেট কমিটি গঠনের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি এবং দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি কারখানাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভেতরের দুর্নীতি ও অপচয় রোধ না করতে পারলে কারখানা চললেও লোকসান থামবে না।

বিসিআইসির কঠোর হুঁশিয়ারি

সার্বিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদে কোনো ধরনের লুটপাট বা কারসাজি বরদাশত করা হবে না। সিইউএফএলের সিস্টেম লসের নামে ভুয়া হিসাব দেখানো হলে এবং ক্যাপটিভ প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ অবৈধভাবে বিক্রির প্রমাণ মিললে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

তিনি আরও জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জবাবদিহিতাসহ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিসিআইসি থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।