বাসে যাতায়াত মানেই যেন একরাশ ভোগান্তির গল্প। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নারী যাত্রীদের হয়রানি, এমনকি চলন্ত বাসে ডাকাতির মতো ভয়ানক ঘটনাও আমাদের দেশে নতুন নয়। পর্যটন নগরী কক্সবাজারে এই চিরচেনা সমস্যার এক অভিনব ডিজিটাল সমাধান নিয়ে এসেছে জেলা পুলিশ। ‘অনলাইন বাস টার্মিনাল’ নামে একটি ওয়েবসাইট (https://www.obtcoxsbazar.com)) ও মোবাইল অ্যাপস এখন যাত্রীদের দিচ্ছে স্বস্তি আর নিরাপত্তার নতুন আশ্বাস।
কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী ১২৬টি পরিবহন সংস্থার প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাস এবং তাদের দুই হাজারের বেশি চালক ও সহকারীর ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য এখন এক ক্লিকেই মিলছে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। শুধু তাই নয়, শহরের ভেতরে চলাচলকারী প্রায় ৩ হাজার টমটম, মাইক্রোবাস ও কারের তথ্যও এখানে সংরক্ষিত। ফলে কক্সবাজারে আসা পর্যটক বা সাধারণ যাত্রী – কাউকেই আর পরিবহন সংক্রান্ত তথ্যের জন্য বা দর কষাকষির ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে না।
ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করলেই দেখা যায় কক্সবাজারে চলাচলকারী সব বাসের সময়সূচি, কাউন্টারগুলোর ফোন নম্বর এবং ভাড়ার হালনাগাদ তালিকা। এমনকি বাসের টিকিট কাটার সুবিধাও রয়েছে এখানে। সিলেটের ব্যবসায়ী কামরুল হাসান এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, “কোন বাস কখন ছাড়বে, ভাড়া কত, কাউন্টারের নম্বর – এসব তথ্য পেতে আর বেগ পেতে হয়নি।”
এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা। অনলাইন বাস টার্মিনাল অ্যাপস ও ওয়েবসাইটে রয়েছে ‘ইমার্জেন্সি অ্যালার্ট’ বাটন। চলন্ত বাসে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে যেমন দুর্ঘটনা, ডাকাতি বা যৌন হয়রানির শিকার হলে যাত্রী এই বাটনে ক্লিক করলেই তার বর্তমান অবস্থান (গুগল ম্যাপ লোকেশনসহ) তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের কাছে পৌঁছে যায়। পুলিশ তখন বাসের নম্বর, চালক ও সুপারভাইজারের তথ্য যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. জসিম উদ্দীন চৌধুরী এটিকে দেশের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীরা তাৎক্ষণিক অভিযোগ করে প্রতিকার পাচ্ছেন।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে চলন্ত বাসে অপরাধমূলক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেখানে প্রতিটি বাসে ‘প্যানিক বাটন’ বসানোর কথা ভাবা হচ্ছে, সেখানে কক্সবাজারের এই ‘ইমার্জেন্সি অ্যালার্ট’ সিস্টেমকে更 বাস্তবসম্মত ও সহজলভ্য সমাধান হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, আকস্মিক বিপদে বাসের নির্দিষ্ট প্যানিক বাটন পর্যন্ত পৌঁছানো যাত্রীর জন্য কঠিন হতে পারে, কিন্তু নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ।
যাত্রীরা বাসে বসেই চালকের বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, সেবার মান বা যেকোনো হয়রানির বিষয়ে সরাসরি রেটিং, রিভিউ বা ছবিসহ অভিযোগ জানাতে পারেন। এই অভিযোগ মুহূর্তেই ট্রাফিক পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন সংস্থার কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়। এর ভিত্তিতে পুলিশ অভিযোগ যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়। যাত্রীদের দেওয়া রেটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিবহনগুলোর সার্বিক মান নির্ধারিত হয়, যা মালিকপক্ষকেও সেবার মান উন্নত করতে উৎসাহিত করছে। গ্রিনলাইন পরিবহনের পরিচালক সুলতান আহমদ জানান, এই অ্যাপসের কারণে পরিবহন মালিক-চালক-কর্মচারীরা আগের চেয়ে বেশি সতর্ক হয়েছেন।
শুধু বাস নয়, কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর স্থানীয় যাতায়াতের জন্যও রয়েছে সমাধান। অনলাইন বাস টার্মিনালের সাথে যুক্ত ‘কক্সক্যাব’ [www.coxscab.com] সার্ভিসের মাধ্যমে যাত্রীরা বাস বা ট্রেন থেকে নামার আগেই হোটেলে যাওয়ার জন্য টমটম, মাইক্রোবাস বা কার ভাড়া করে রাখতে পারেন। এমনকি হোটেল বুকিংয়ের সুবিধাও রয়েছে। বিশেষ করে নতুন চালু হওয়া আইকনিক রেলস্টেশন থেকে কলাতলীর হোটেলগুলোতে যাতায়াতে পর্যটকদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, এই সেবা তা অনেকাংশে লাঘব করতে পারে। ঢাকার ব্যবসায়ী ছৈয়দুল মোস্তফা জানান, তিনি ঢাকা থেকেই এই অ্যাপ ব্যবহার করে বাস টিকিট ও হোটেল বুকিং সম্পন্ন করেছেন, যা তার ভ্রমণকে সহজ করেছে।
এতসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রচারণার অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবাটি এখনো অনেক পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীর কাছে পৌঁছায়নি। শ্যামলী পরিবহনের ব্যবস্থাপক খোরশেদ আলম জানান, এ বিষয়ে অনেকেই জানেন না। তবে সম্প্রতি কলাতলী মোড়সহ সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অ্যাপসটির সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে, যা সচেতনতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের এই ‘অনলাইন বাস টার্মিনাল’ উদ্যোগটি শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিই কমায়নি, বরং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সঠিক প্রচারণা ও দেশব্যাপী এই মডেল অনুসরণের মাধ্যমে গণপরিবহনে যাত্রীদের সুরক্ষা ও সেবার মানোন্নয়নে এটি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।
