সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

মার্কিন মুলুকে বাংলাদেশি পোশাকের জয়জয়কার, তবে শুল্কের খাঁড়ায় শঙ্কা!

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

বছরের শুরুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রীতিমতো তাক লাগিয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) একক বৃহত্তম এই রপ্তানি গন্তব্যে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৬ শতাংশেরও বেশি। খোদ মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যানেই এই ঈর্ষণীয় সাফল্যের চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধির হারে বিশ্বের শীর্ষ পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোকেও পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।

মঙ্গলবার (৬ মে) প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (ওটেক্সা) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশ থেকে ২২২ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পোশাক কিনেছে মার্কিনীরা। গত বছরের একই সময়ে এই অঙ্কটা ছিল ১৭৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

শুধু বাংলাদেশই নয়, সামগ্রিকভাবেই এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ, যার মোট অর্থমূল্য ২ হাজার ৪ কোটি ডলারেরও বেশি। এই বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী চীন থেকে আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ (প্রায় ৩৬০ কোটি ডলার) এবং ভিয়েতনাম থেকে বেড়েছে ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ (প্রায় ১৩২১ কোটি ডলার)। এছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মেক্সিকো, কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকেও আমদানি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই দৌড়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

কিন্তু এমন চোখ ধাঁধানো সাফল্যের পরও স্বস্তিতে নেই দেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে মার্কিন প্রশাসনের নতুন ‘পাল্টা শুল্ক’ নীতি। গত ২ এপ্রিল বিভিন্ন দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হারে এই শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসার পর তা ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হলেও, প্রতিটি দেশের ওপরই ১০ শতাংশ হারে একটি পাল্টা শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। এই অতিরিক্ত শুল্ক বিদ্যমান ১৫ শতাংশ গড় শুল্কের বোঝার ওপর নতুন খাঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে।

রপ্তানিকারকরা জানাচ্ছেন, এই অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের দায় এককভাবে নিতে নারাজ মার্কিন ক্রেতারা। তারা চাইছেন, এই বোঝার একটি অংশ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পুরোটাই, বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা বহন করুক। ফলে, এই শুল্কের যাঁতাকলে রপ্তানির এই দুরন্ত গতি ধরে রাখা যাবে কিনা, তা নিয়েই এখন বড় সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল এই প্রসঙ্গে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি যেখানে ১০ শতাংশের মতো বেড়েছে, সেখানে আমাদের প্রবৃদ্ধি ২৬ শতাংশের বেশি, এটা নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। পণ্যের দাম ও পরিমাণেও আমরা ভালো অবস্থানে আছি। তবে নতুন শুল্কের প্রভাব কী হবে, তা বুঝতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। আগামী দিনগুলোর পরিসংখ্যানেই এর আসল চিত্রটা ফুটে উঠবে।”

ইউনিটপ্রতি পণ্যের দামেও একটি মিশ্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পণ্যের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১২ শতাংশ, যেখানে ভিয়েতনামের ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং চীনের ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, ভারত ও পাকিস্তানের পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে।

দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার মনে করেন, এই নতুন পরিস্থিতিতে মুনাফার হার কমে আসবে। তিনি বলেন, “আমাদের উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে হবে, যার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস অপরিহার্য। এরই মধ্যে মার্কিন খুচরা বাজারে শুল্কের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, ক্রেতারা কিছুটা রক্ষণশীল হচ্ছেন, বিক্রিও কমেছে। এর ফলে আমাদের ওপর পণ্যের দামে আরও চাপ আসবে।” তবে, বছর শেষে পণ্যের মোট পরিমাণে হয়তো খুব বেশি হেরফের হবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে, বছরের শুরুতে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের যে দুর্বার যাত্রা শুরু হয়েছিল, নতুন শুল্ক নীতির মুখে তা কতটা টেকসই হবে, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মাঝে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

মার্কিন মুলুকে বাংলাদেশি পোশাকের জয়জয়কার, তবে শুল্কের খাঁড়ায় শঙ্কা!

নিজস্ব প্রতিবেদক
৯ মে ২০২৫, ১০:৪১

বছরের শুরুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রীতিমতো তাক লাগিয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) একক বৃহত্তম এই রপ্তানি গন্তব্যে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৬ শতাংশেরও বেশি। খোদ মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যানেই এই ঈর্ষণীয় সাফল্যের চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধির হারে বিশ্বের শীর্ষ পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোকেও পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।

মঙ্গলবার (৬ মে) প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (ওটেক্সা) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশ থেকে ২২২ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পোশাক কিনেছে মার্কিনীরা। গত বছরের একই সময়ে এই অঙ্কটা ছিল ১৭৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

শুধু বাংলাদেশই নয়, সামগ্রিকভাবেই এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ, যার মোট অর্থমূল্য ২ হাজার ৪ কোটি ডলারেরও বেশি। এই বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী চীন থেকে আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ (প্রায় ৩৬০ কোটি ডলার) এবং ভিয়েতনাম থেকে বেড়েছে ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ (প্রায় ১৩২১ কোটি ডলার)। এছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মেক্সিকো, কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকেও আমদানি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই দৌড়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

কিন্তু এমন চোখ ধাঁধানো সাফল্যের পরও স্বস্তিতে নেই দেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে মার্কিন প্রশাসনের নতুন ‘পাল্টা শুল্ক’ নীতি। গত ২ এপ্রিল বিভিন্ন দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হারে এই শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসার পর তা ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হলেও, প্রতিটি দেশের ওপরই ১০ শতাংশ হারে একটি পাল্টা শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। এই অতিরিক্ত শুল্ক বিদ্যমান ১৫ শতাংশ গড় শুল্কের বোঝার ওপর নতুন খাঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে।

রপ্তানিকারকরা জানাচ্ছেন, এই অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের দায় এককভাবে নিতে নারাজ মার্কিন ক্রেতারা। তারা চাইছেন, এই বোঝার একটি অংশ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পুরোটাই, বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা বহন করুক। ফলে, এই শুল্কের যাঁতাকলে রপ্তানির এই দুরন্ত গতি ধরে রাখা যাবে কিনা, তা নিয়েই এখন বড় সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল এই প্রসঙ্গে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি যেখানে ১০ শতাংশের মতো বেড়েছে, সেখানে আমাদের প্রবৃদ্ধি ২৬ শতাংশের বেশি, এটা নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। পণ্যের দাম ও পরিমাণেও আমরা ভালো অবস্থানে আছি। তবে নতুন শুল্কের প্রভাব কী হবে, তা বুঝতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। আগামী দিনগুলোর পরিসংখ্যানেই এর আসল চিত্রটা ফুটে উঠবে।”

ইউনিটপ্রতি পণ্যের দামেও একটি মিশ্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পণ্যের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১২ শতাংশ, যেখানে ভিয়েতনামের ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং চীনের ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, ভারত ও পাকিস্তানের পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে।

দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার মনে করেন, এই নতুন পরিস্থিতিতে মুনাফার হার কমে আসবে। তিনি বলেন, “আমাদের উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে হবে, যার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস অপরিহার্য। এরই মধ্যে মার্কিন খুচরা বাজারে শুল্কের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, ক্রেতারা কিছুটা রক্ষণশীল হচ্ছেন, বিক্রিও কমেছে। এর ফলে আমাদের ওপর পণ্যের দামে আরও চাপ আসবে।” তবে, বছর শেষে পণ্যের মোট পরিমাণে হয়তো খুব বেশি হেরফের হবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে, বছরের শুরুতে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের যে দুর্বার যাত্রা শুরু হয়েছিল, নতুন শুল্ক নীতির মুখে তা কতটা টেকসই হবে, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মাঝে।