সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

‘নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত’, গুম থেকে ফেরা ব্যক্তিদের বর্ণনায় ভয়াবহ নির্যাতন

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

গুমের শিকার ব্যক্তিদের ওপর র‌্যাবের গোপন বন্দিশালায় ‘ওয়াটারবোর্ডিং’-এর মতো ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হতো বলে তথ্য উঠে এসেছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে। এতে অস্বাস্থ্যকর সেলে আটকে রেখে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং ঘূর্ণায়মান চেয়ারে বসিয়ে ঘোরানোসহ নানা পদ্ধতিতে বন্দীদের ওপর চালানো নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।

গত ৪ জুন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি তুলে দেওয়া হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ৮৫০টি অভিযোগ বিশ্লেষণ করে ২৫৩ জন গুমের শিকার ব্যক্তির ওপর চালানো নির্যাতনের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে র‌্যাবের বন্দিশালা থেকে ফিরে আসা এক তরুণের জবানবন্দি উল্লেখ করে বলা হয়, তার মুখের ওপর গামছা দিয়ে জগ ভর্তি করে পানি ঢালা হতো, যাতে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত।

নির্যাতনের জন্য ‘ঘূর্ণায়মান চেয়ার’ ব্যবহারেরও একাধিক বিবরণ পাওয়া গেছে, যা র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) ব্যবহার করা হতো। ভুক্তভোগীরা জানান, এই চেয়ারে বসিয়ে দ্রুতগতিতে ঘোরানো হতো, যাতে অনেকে বমি করে বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদ্যুতিক শক ছিল র‌্যাবের দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত নির্যাতন পদ্ধতি। এক ভুক্তভোগী জানান, প্রস্রাব করার সময় তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। নারী বন্দীদের ওপর আরও ভয়ানক ও লজ্জাজনক নির্যাতন চালানো হতো বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা আরও জানান, তাদের দিনের পর দিন অস্বাস্থ্যকর ও অন্ধকার সেলে বন্দী রাখা হতো, যেখানে থাকা, খাওয়া ও শৌচাগারের জায়গা ছিল একইসঙ্গে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে চলত নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি, যা শৌচাগার ব্যবহারের সময়ও বন্ধ হতো না।

মুক্তি পেলেও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ট্রমায় ভুগছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০১৯ সালে অপহৃত ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ২০ মাস পর ফিরে এলেও আর ‘স্বাভাবিক’ হতে পারেনি। তার বাবা জানান, ছেলে এখন একা একা হাসে এবং ঠিকমতো কথা বলে না।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “গুম হওয়া ব্যক্তিদের নির্যাতন সম্পর্কে আমাদের যতটুকু ধারণা ছিল, বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা না শুনলে সেটি কল্পনাও করা যাবে না। নির্যাতনের এমন কোনো পদ্ধতি ছিল না, যেটা প্রয়োগ করা হয়নি।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

‘নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত’, গুম থেকে ফেরা ব্যক্তিদের বর্ণনায় ভয়াবহ নির্যাতন

নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ জুলাই ২০২৫, ১০:৪৩

গুমের শিকার ব্যক্তিদের ওপর র‌্যাবের গোপন বন্দিশালায় ‘ওয়াটারবোর্ডিং’-এর মতো ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হতো বলে তথ্য উঠে এসেছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে। এতে অস্বাস্থ্যকর সেলে আটকে রেখে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং ঘূর্ণায়মান চেয়ারে বসিয়ে ঘোরানোসহ নানা পদ্ধতিতে বন্দীদের ওপর চালানো নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।

গত ৪ জুন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি তুলে দেওয়া হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ৮৫০টি অভিযোগ বিশ্লেষণ করে ২৫৩ জন গুমের শিকার ব্যক্তির ওপর চালানো নির্যাতনের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে র‌্যাবের বন্দিশালা থেকে ফিরে আসা এক তরুণের জবানবন্দি উল্লেখ করে বলা হয়, তার মুখের ওপর গামছা দিয়ে জগ ভর্তি করে পানি ঢালা হতো, যাতে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত।

নির্যাতনের জন্য ‘ঘূর্ণায়মান চেয়ার’ ব্যবহারেরও একাধিক বিবরণ পাওয়া গেছে, যা র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) ব্যবহার করা হতো। ভুক্তভোগীরা জানান, এই চেয়ারে বসিয়ে দ্রুতগতিতে ঘোরানো হতো, যাতে অনেকে বমি করে বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদ্যুতিক শক ছিল র‌্যাবের দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত নির্যাতন পদ্ধতি। এক ভুক্তভোগী জানান, প্রস্রাব করার সময় তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। নারী বন্দীদের ওপর আরও ভয়ানক ও লজ্জাজনক নির্যাতন চালানো হতো বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা আরও জানান, তাদের দিনের পর দিন অস্বাস্থ্যকর ও অন্ধকার সেলে বন্দী রাখা হতো, যেখানে থাকা, খাওয়া ও শৌচাগারের জায়গা ছিল একইসঙ্গে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে চলত নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি, যা শৌচাগার ব্যবহারের সময়ও বন্ধ হতো না।

মুক্তি পেলেও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ট্রমায় ভুগছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০১৯ সালে অপহৃত ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ২০ মাস পর ফিরে এলেও আর ‘স্বাভাবিক’ হতে পারেনি। তার বাবা জানান, ছেলে এখন একা একা হাসে এবং ঠিকমতো কথা বলে না।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “গুম হওয়া ব্যক্তিদের নির্যাতন সম্পর্কে আমাদের যতটুকু ধারণা ছিল, বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা না শুনলে সেটি কল্পনাও করা যাবে না। নির্যাতনের এমন কোনো পদ্ধতি ছিল না, যেটা প্রয়োগ করা হয়নি।”