সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় বড় রদবদল: ‘সহযোগী’ হলেন ২৮ জন, বাদ পড়ছেন ৩৩৬

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় আনা সংশোধনের পর প্রথমবারের মতো ২৮ ব্যক্তিকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। আগে এদের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ছিল না। একইসঙ্গে যাচাই-বাছাইয়ে ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় ৩৩৬ জনের গেজেট ও ভাতা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে ৮৪ জনকে নতুন করে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জমা পড়া অসংখ্য অভিযোগ ও আবেদনের ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হলেও সারা দেশে বিদ্যমান মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘সহযোগী’—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করার কাজ এখনই শুরু হচ্ছে না। বিশৃঙ্খলা ও বিতর্কের আশঙ্কায় সরকার আপাতত এই ‘শ্রেণিবিন্যাস’ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একাত্তরে যারা সরাসরি রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, কেবল তারাই ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য হবেন। এর বাইরে যারা দেশ-বিদেশে জনমত গঠন, কূটনীতি বা অন্যভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন, তাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ অভিধা দেওয়া হবে।

এই পরিবর্তনের পর গত ছয় মাসে জামুকার পুনর্গঠিত কমিটি ১১টি সভা করেছে। এসব সভায় রিট ও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই শেষে ২৮ জনকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি আগে থেকে ভাতাভোগী ৬৪৩ জনের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের শুনানি হয়। এতে ৩৩৬ জন তাদের মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণের সপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন। ফলে তাদের সনদ ও ভাতা বাতিলের সুপারিশ করা হয়। তবে ৮৪ জন নিজেদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন।

জামুকার ১০১তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রণাঙ্গনের যোদ্ধা, মুজিবনগর সরকারের সদস্য, বীরাঙ্গনা এবং ফিল্ড হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবাকারীদের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ গেজেটে রাখা হবে। অন্যদিকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করা সাংবাদিকসহ অন্যদের ‘সহযোগী’ ক্যাটাগরিতে ফেলার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে বিদ্যমান ২ লাখ ৬ হাজার ২৩১ জন মুক্তিযোদ্ধার সবাইকে এখনই এই দুই ভাগে ভাগ করা হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই আজম বিষয়টি নিয়ে বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সহযোগীদের আলাদা করার কাজটি জটিল। বর্তমানে মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিপ্রাপ্তদের তথ্য যাচাইয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

উপদেষ্টা বলেন, গত ১৫ বছরে মুক্তিযুদ্ধের বহুমুখী প্রচেষ্টাকে এক করে ফেলেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এখন কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের তথ্য যাচাই চলছে। আমরা অনেক ভুয়া সনদ পেয়েছি।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিভিন্ন দপ্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৯০ হাজার ৫২৭ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭২ হাজার ৭৭ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। বাকিদের যাচাই চলছে। ভুয়া সনদে চাকরি নেওয়াদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকার নেবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন উপদেষ্টা।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা পরিবর্তন ও নতুন শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা কমান্ডের আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, যারা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন এবং যারা নিরাপদ দূরত্বে থেকে সহায়তা করেছেন—উভয়কে এক কাতারে ফেলা ঠিক ছিল না। শ্রেণিবিন্যাস জরুরি।

বিপরীত মত দিয়ে সম্মিলিত মুক্তিযোদ্ধা ফোরামের সভাপতি এ এম শফিউর রহমান বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এমন বিভাজন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবমাননাকর হতে পারে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাল মুক্তিবার্তা ও অন্যান্য গেজেটে যুদ্ধক্ষেত্র এবং সহযোগিতার বিষয়টি মিশে আছে। হুট করে এগুলো আলাদা করতে গেলে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই আপাতত অভিযোগভিত্তিক যাচাই-বাছাই ও কোটা সংস্কারেই মনোযোগী সরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় বড় রদবদল: ‘সহযোগী’ হলেন ২৮ জন, বাদ পড়ছেন ৩৩৬

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:২০

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় আনা সংশোধনের পর প্রথমবারের মতো ২৮ ব্যক্তিকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। আগে এদের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ছিল না। একইসঙ্গে যাচাই-বাছাইয়ে ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় ৩৩৬ জনের গেজেট ও ভাতা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে ৮৪ জনকে নতুন করে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জমা পড়া অসংখ্য অভিযোগ ও আবেদনের ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হলেও সারা দেশে বিদ্যমান মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘সহযোগী’—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করার কাজ এখনই শুরু হচ্ছে না। বিশৃঙ্খলা ও বিতর্কের আশঙ্কায় সরকার আপাতত এই ‘শ্রেণিবিন্যাস’ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একাত্তরে যারা সরাসরি রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, কেবল তারাই ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য হবেন। এর বাইরে যারা দেশ-বিদেশে জনমত গঠন, কূটনীতি বা অন্যভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন, তাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ অভিধা দেওয়া হবে।

এই পরিবর্তনের পর গত ছয় মাসে জামুকার পুনর্গঠিত কমিটি ১১টি সভা করেছে। এসব সভায় রিট ও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই শেষে ২৮ জনকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি আগে থেকে ভাতাভোগী ৬৪৩ জনের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের শুনানি হয়। এতে ৩৩৬ জন তাদের মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণের সপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন। ফলে তাদের সনদ ও ভাতা বাতিলের সুপারিশ করা হয়। তবে ৮৪ জন নিজেদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন।

জামুকার ১০১তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রণাঙ্গনের যোদ্ধা, মুজিবনগর সরকারের সদস্য, বীরাঙ্গনা এবং ফিল্ড হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবাকারীদের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ গেজেটে রাখা হবে। অন্যদিকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করা সাংবাদিকসহ অন্যদের ‘সহযোগী’ ক্যাটাগরিতে ফেলার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে বিদ্যমান ২ লাখ ৬ হাজার ২৩১ জন মুক্তিযোদ্ধার সবাইকে এখনই এই দুই ভাগে ভাগ করা হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই আজম বিষয়টি নিয়ে বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সহযোগীদের আলাদা করার কাজটি জটিল। বর্তমানে মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিপ্রাপ্তদের তথ্য যাচাইয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

উপদেষ্টা বলেন, গত ১৫ বছরে মুক্তিযুদ্ধের বহুমুখী প্রচেষ্টাকে এক করে ফেলেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এখন কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের তথ্য যাচাই চলছে। আমরা অনেক ভুয়া সনদ পেয়েছি।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিভিন্ন দপ্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৯০ হাজার ৫২৭ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭২ হাজার ৭৭ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। বাকিদের যাচাই চলছে। ভুয়া সনদে চাকরি নেওয়াদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকার নেবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন উপদেষ্টা।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা পরিবর্তন ও নতুন শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা কমান্ডের আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, যারা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন এবং যারা নিরাপদ দূরত্বে থেকে সহায়তা করেছেন—উভয়কে এক কাতারে ফেলা ঠিক ছিল না। শ্রেণিবিন্যাস জরুরি।

বিপরীত মত দিয়ে সম্মিলিত মুক্তিযোদ্ধা ফোরামের সভাপতি এ এম শফিউর রহমান বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এমন বিভাজন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবমাননাকর হতে পারে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাল মুক্তিবার্তা ও অন্যান্য গেজেটে যুদ্ধক্ষেত্র এবং সহযোগিতার বিষয়টি মিশে আছে। হুট করে এগুলো আলাদা করতে গেলে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই আপাতত অভিযোগভিত্তিক যাচাই-বাছাই ও কোটা সংস্কারেই মনোযোগী সরকার।