সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

চট্টলাবাসীর আবেগে সিক্ত তারেক রহমান

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চট্টগ্রামের মাটিতে পা রাখলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রবিবার দুপুরে বন্দরনগরীর ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় তিনি যখন মঞ্চে উঠলেন, তখন পুরো মাঠ স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আয়োজিত এই মহাসমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন যে, নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে দেশের জনমানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কঠোর হস্তে দুর্নীতি মোকাবিলা করা হবে। দুর্নীতিবাজ যেই হোক, এমনকি দলের ভেতরের কেউ হলেও তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্তু সময়ের অভাবে শেষ করতে পারেননি, আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সেই স্বপ্ন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

রবিবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে পলোগ্রাউন্ডের জনসমাবেশস্থলে প্রবেশ করেন তারেক রহমান। এর আগে তিনি সর্বশেষ ২০০৫ সালের ৬ মে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দলের চেয়ারম্যান হিসেবে চট্টগ্রামের কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দিলেন তিনি। মঞ্চে উঠে তিনি শুরুতেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘অনারা ক্যান আছন?’ এরপর মঞ্চের ওপারে থাকা লাখো জনতা সমস্বরে উত্তর দেন, ‘ভালা আছি’। এরপর কুশল বিনিময় শেষে তিনি তাঁর নীতিনির্ধারণী ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য শুরু করেন।

বক্তৃতার শুরুতেই তারেক রহমান দুর্নীতি দমনের প্রশ্নে তাঁর দলের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনরুল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিএনপি অতীতে প্রমাণ করেছে যে একমাত্র তাদের পক্ষেই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আগামীতে যেকোনো মূল্যে বিএনপি সরকার দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে—এই দুটি বিষয় হলো দেশের মানুষের কাছে তাঁর প্রধান কমিটমেন্ট। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকার দেশকে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করেছিল, কিন্তু ২০০১ সালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে দেশকে সেই দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে বের করে এনেছিলেন। তিনি হাজারো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে শপথ করে বলেন, তাদের গৃহীত পরিকল্পনা কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা দুর্নীতির মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে, তবে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পরিবর্তনের ডাক দিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্যের সত্যিকার পরিবর্তন ঘটাতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
চট্টলাবাসীর আবেগে সিক্ত তারেক রহমান: কথা দিলেন খালেদার অসমাপ্ত ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’র কাজ সমাপ্ত করার
চট্টগ্রামের সাথে নিজের ও তাঁর পরিবারের গভীর আবেগের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এই সেই চট্টগ্রামের পুণ্যভূমি, যেখান থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং এই মাটিতেই তিনি শহীদ হয়েছিলেন। এই চট্টগ্রামেই দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রামের উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছরে বাণিজ্যিক রাজধানীর ব্যাপারে কেউ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বিএনপি আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারলে খালেদা জিয়ার নেওয়া সেই অসমাপ্ত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে। এর ফলে শুধু চট্টগ্রাম নয়, সমগ্র দেশের মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হবে। তিনি বলেন, এই এলাকার মানুষ যাতে ব্যাংকিং সুবিধাসহ সব কাজ এখানে বসেই সেরে নিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

এর আগে রবিবার সকাল ১০টায় নগরীর হোটেল র‍্যাডিসন ব্লু-তে ‘দ্য প্ল্যান: ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হন। সেখানে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এক বিশাল পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তারেক রহমান ঘোষণা দেন, আগামী ৫ বছরে সারাদেশে ৫০ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। তিনি বলেন, প্রায় ২০ কোটি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার জন্য বায়ুদূষণের সাথে লড়াই করতে হবে এবং এজন্য নার্সারিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা হবে। এছাড়া দেশের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় এবং পানি নিষ্কাশনের পথ থাকে না। এই সমস্যা সমাধানে খাল কাটা কর্মসূচিতে সবাইকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ সহজীকরণ এবং বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্টুডেন্ট লোন’ চালু করার পরিকল্পনার কথাও তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।

পলোগ্রাউন্ডের বিশাল এই সমাবেশে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ও পার্বত্য জেলার দলীয় প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, পাহাড় বা সমতল, ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্ম—সকলের সমন্বয়ে একটি প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। মঞ্চে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক নেতা। মঞ্চের প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়াও ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য সুকোমল বড়ুয়া, গোলাম আকবর খন্দকার ও এস এম ফজলুল হক। আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক এম নাজিম উদ্দীন, নারী বিষয়ক সম্পাদক বেগম নুরে আরা সাফা, এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য উদয় কুমার বড়ুয়া, ম্যামাসিং ও আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ।

আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের প্রার্থী সাঈদ নোমান, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী সারোয়ার নিজাম, চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী আবু সুফিয়ান ও মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ, কক্সবাজার-৪ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ শাহাজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৬ আসনের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ আসনের প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, খাগড়াছড়ির প্রার্থী আব্দুল ওয়াদুদ ভুইঁয়া, কক্সবাজারের প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল, চট্টগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মোস্তফা কামাল, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন, চট্টগ্রাম-১২ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ এনামুল হক, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা এবং চট্টগ্রাম-১ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিন।

এছাড়াও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ (যিনি অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন), সদস্য সচিব মোহাম্মদ নাজিমুর রহমান, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জেরি প্রো চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া এবং রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দ্বীপন দেওয়ান তালুকদার।

সমাবেশকে ঘিরে জনমনে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। সকাল থেকেই পলোগ্রাউন্ড মাঠে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন নেতাকর্মীরা। মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে সকাল ১০টার মধ্যেই। সমাবেশের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন কৃষক দলের দুই কর্মী নেপাল চন্দ্র দাশ ও সাইদুল ইসলাম। মীরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন থেকে আসা এই দুই ব্যক্তি নিজেদের পুরো শরীরে পাকা ধান লাগিয়ে ‘জীবন্ত ধানের শীষ’ সেজে সমাবেশে হাজির হন। তাদের দেখে উপস্থিত জনতা ও নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই তাদের সাথে ছবি তুলতে ভিড় করেন। মীরসরাই উপজেলা কৃষক দলের সহসভাপতি তৌহিদ্দোজা জানান, ধানের শীষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁরা এমন ভিন্নধর্মী সাজে সজ্জিত হয়েছেন।

সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন শারীরিক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি বড় দলও। প্রায় ২০০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে সমাবেশে উপস্থিত হন। তাদের পক্ষে বধির সৈয়দ আবুল হাসনাত ও গোলাম মোস্তফা জানান, তাঁরা তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের সমস্যার কথা জানাতে চান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদের জন্য অনেক কিছু করেছিলেন, সেই ভালোবাসার টানেই তাঁরা এই জনসমুদ্রে শামিল হয়েছেন।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগরীতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রায় দুই হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি পুরো এলাকাকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন—এই তিন জোনে ভাগ করা হয়েছিল। মঞ্চ ও তার আশপাশ ছিল রেড জোনের আওতায়, যেখানে কেবল সিনিয়র নেতা ও প্রার্থীরা প্রবেশ করতে পেরেছেন। তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন এবং রেডিসন ব্লুতে রাত্রিযাপন করেন।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তারেক রহমান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গকারী ওয়াসিম আকরামসহ অসংখ্য শহীদের ত্যাগের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের জীবনের মূল্য দিতে হলে এবং বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে হলে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। চট্টগ্রাম সফর শেষে তিনি ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক পথসভায় অংশ নেবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

চট্টলাবাসীর আবেগে সিক্ত তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৩০

দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চট্টগ্রামের মাটিতে পা রাখলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রবিবার দুপুরে বন্দরনগরীর ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় তিনি যখন মঞ্চে উঠলেন, তখন পুরো মাঠ স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আয়োজিত এই মহাসমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন যে, নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে দেশের জনমানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কঠোর হস্তে দুর্নীতি মোকাবিলা করা হবে। দুর্নীতিবাজ যেই হোক, এমনকি দলের ভেতরের কেউ হলেও তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্তু সময়ের অভাবে শেষ করতে পারেননি, আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সেই স্বপ্ন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

রবিবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে পলোগ্রাউন্ডের জনসমাবেশস্থলে প্রবেশ করেন তারেক রহমান। এর আগে তিনি সর্বশেষ ২০০৫ সালের ৬ মে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দলের চেয়ারম্যান হিসেবে চট্টগ্রামের কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দিলেন তিনি। মঞ্চে উঠে তিনি শুরুতেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘অনারা ক্যান আছন?’ এরপর মঞ্চের ওপারে থাকা লাখো জনতা সমস্বরে উত্তর দেন, ‘ভালা আছি’। এরপর কুশল বিনিময় শেষে তিনি তাঁর নীতিনির্ধারণী ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য শুরু করেন।

বক্তৃতার শুরুতেই তারেক রহমান দুর্নীতি দমনের প্রশ্নে তাঁর দলের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনরুল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিএনপি অতীতে প্রমাণ করেছে যে একমাত্র তাদের পক্ষেই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আগামীতে যেকোনো মূল্যে বিএনপি সরকার দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে—এই দুটি বিষয় হলো দেশের মানুষের কাছে তাঁর প্রধান কমিটমেন্ট। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকার দেশকে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করেছিল, কিন্তু ২০০১ সালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে দেশকে সেই দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে বের করে এনেছিলেন। তিনি হাজারো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে শপথ করে বলেন, তাদের গৃহীত পরিকল্পনা কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা দুর্নীতির মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে, তবে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পরিবর্তনের ডাক দিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্যের সত্যিকার পরিবর্তন ঘটাতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
চট্টলাবাসীর আবেগে সিক্ত তারেক রহমান: কথা দিলেন খালেদার অসমাপ্ত ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’র কাজ সমাপ্ত করার
চট্টগ্রামের সাথে নিজের ও তাঁর পরিবারের গভীর আবেগের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এই সেই চট্টগ্রামের পুণ্যভূমি, যেখান থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং এই মাটিতেই তিনি শহীদ হয়েছিলেন। এই চট্টগ্রামেই দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রামের উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছরে বাণিজ্যিক রাজধানীর ব্যাপারে কেউ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বিএনপি আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারলে খালেদা জিয়ার নেওয়া সেই অসমাপ্ত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে। এর ফলে শুধু চট্টগ্রাম নয়, সমগ্র দেশের মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হবে। তিনি বলেন, এই এলাকার মানুষ যাতে ব্যাংকিং সুবিধাসহ সব কাজ এখানে বসেই সেরে নিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

এর আগে রবিবার সকাল ১০টায় নগরীর হোটেল র‍্যাডিসন ব্লু-তে ‘দ্য প্ল্যান: ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হন। সেখানে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এক বিশাল পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তারেক রহমান ঘোষণা দেন, আগামী ৫ বছরে সারাদেশে ৫০ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। তিনি বলেন, প্রায় ২০ কোটি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার জন্য বায়ুদূষণের সাথে লড়াই করতে হবে এবং এজন্য নার্সারিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা হবে। এছাড়া দেশের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় এবং পানি নিষ্কাশনের পথ থাকে না। এই সমস্যা সমাধানে খাল কাটা কর্মসূচিতে সবাইকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ সহজীকরণ এবং বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্টুডেন্ট লোন’ চালু করার পরিকল্পনার কথাও তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।

পলোগ্রাউন্ডের বিশাল এই সমাবেশে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ও পার্বত্য জেলার দলীয় প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, পাহাড় বা সমতল, ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্ম—সকলের সমন্বয়ে একটি প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। মঞ্চে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক নেতা। মঞ্চের প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়াও ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য সুকোমল বড়ুয়া, গোলাম আকবর খন্দকার ও এস এম ফজলুল হক। আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক এম নাজিম উদ্দীন, নারী বিষয়ক সম্পাদক বেগম নুরে আরা সাফা, এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য উদয় কুমার বড়ুয়া, ম্যামাসিং ও আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ।

আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের প্রার্থী সাঈদ নোমান, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী সারোয়ার নিজাম, চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী আবু সুফিয়ান ও মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ, কক্সবাজার-৪ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ শাহাজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৬ আসনের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ আসনের প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, খাগড়াছড়ির প্রার্থী আব্দুল ওয়াদুদ ভুইঁয়া, কক্সবাজারের প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল, চট্টগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মোস্তফা কামাল, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন, চট্টগ্রাম-১২ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ এনামুল হক, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা এবং চট্টগ্রাম-১ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিন।

এছাড়াও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ (যিনি অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন), সদস্য সচিব মোহাম্মদ নাজিমুর রহমান, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জেরি প্রো চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া এবং রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দ্বীপন দেওয়ান তালুকদার।

সমাবেশকে ঘিরে জনমনে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। সকাল থেকেই পলোগ্রাউন্ড মাঠে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন নেতাকর্মীরা। মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে সকাল ১০টার মধ্যেই। সমাবেশের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন কৃষক দলের দুই কর্মী নেপাল চন্দ্র দাশ ও সাইদুল ইসলাম। মীরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন থেকে আসা এই দুই ব্যক্তি নিজেদের পুরো শরীরে পাকা ধান লাগিয়ে ‘জীবন্ত ধানের শীষ’ সেজে সমাবেশে হাজির হন। তাদের দেখে উপস্থিত জনতা ও নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই তাদের সাথে ছবি তুলতে ভিড় করেন। মীরসরাই উপজেলা কৃষক দলের সহসভাপতি তৌহিদ্দোজা জানান, ধানের শীষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁরা এমন ভিন্নধর্মী সাজে সজ্জিত হয়েছেন।

সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন শারীরিক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি বড় দলও। প্রায় ২০০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে সমাবেশে উপস্থিত হন। তাদের পক্ষে বধির সৈয়দ আবুল হাসনাত ও গোলাম মোস্তফা জানান, তাঁরা তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের সমস্যার কথা জানাতে চান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদের জন্য অনেক কিছু করেছিলেন, সেই ভালোবাসার টানেই তাঁরা এই জনসমুদ্রে শামিল হয়েছেন।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগরীতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রায় দুই হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি পুরো এলাকাকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন—এই তিন জোনে ভাগ করা হয়েছিল। মঞ্চ ও তার আশপাশ ছিল রেড জোনের আওতায়, যেখানে কেবল সিনিয়র নেতা ও প্রার্থীরা প্রবেশ করতে পেরেছেন। তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন এবং রেডিসন ব্লুতে রাত্রিযাপন করেন।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তারেক রহমান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গকারী ওয়াসিম আকরামসহ অসংখ্য শহীদের ত্যাগের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের জীবনের মূল্য দিতে হলে এবং বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে হলে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। চট্টগ্রাম সফর শেষে তিনি ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক পথসভায় অংশ নেবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।