দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ক্রমশ প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ২৮ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৫৫ জন।
মানবাধিকার সংস্থাটির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, সহিংসতার মাত্রা ততই বাড়ছে। ২১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জানুয়ারি—মাত্র এই সাত দিনেই ৪২টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় ৪ জন নিহত এবং ৩৫৩ জন আহত হয়েছেন। এর আগে ২০২৫ সালের শেষ চার মাসেও (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
গণমাধ্যম ও পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ের অধিকাংশ সংঘর্ষই ঘটছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের মধ্যে। কোথাও কোথাও বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলও রক্তক্ষয়ী রূপ নিচ্ছে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় একটি ফেরিঘাট উদ্বোধন কেন্দ্র করে স্লোগান দেওয়া নিয়ে বিএনপি ও এনসিপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১২ জন আহত হন।
এই ঘটনার পর ১১ দলীয় জোটের নোয়াখালী-৬ আসনের প্রার্থী ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হান্নান মাসুদ হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে দুই ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও একই আসনের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান শামীম দাবি করেছেন, এনসিপির কর্মীরাই তাদের কর্মসূচিতে হামলা চালিয়েছে। হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম জানিয়েছেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে আছে এবং পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও জেলায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে ২৭ জানুয়ারি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়া নিয়ে ফেসবুকে প্রচারণার জেরে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষে ১২ জন আহত হন। ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে নজরুল ইসলাম (৪০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি নেতা সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক ছিলেন।
এছাড়া গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজতুরী বাজার এলাকায় জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিএনপি এটিকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দাবি করলেও পুলিশ বলছে এর পেছনে চাঁদাবাজি জড়িত। এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের নেতা ফরিদ সরকারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ২০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ৭৩টি ছিল প্রতিপক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম শুক্রবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের ৫০ বছরের নির্বাচনী ইতিহাস বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’। বাংলাদেশে সহিংসতা ছাড়া কোনো নির্বাচন হয়নি, ২০১৪ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করা হবে এবং কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা হলে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হবে বলে তিনি জানান।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ৮ জানুয়ারি থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের ১৯২টি ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে ১১৯টি মামলা হয়েছে এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ১২ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর আমরা আশা করেছিলাম এবারের নির্বাচন উৎসবমুখর হবে। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণু আচরণ অপ্রত্যাশিত। সহিংসতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রবিমুখ হতে পারেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তীতে এক আদেশে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং দলটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
