দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় আবারও আধিপত্য বিস্তার করেছে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২টিতেই বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় এবং জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য সমমনা দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে বিএনপি তাদের হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধার করেছে।
তবে সামগ্রিক বিজয়ের মধ্যেও কিছু জায়গায় হোঁচট খেয়েছে দলটি। বিশেষ করে জামায়াত অধ্যুষিত সাতকানিয়া-লোহাগাড়া এবং বাঁশখালীতে শেষ হাসি হাসতে পারেনি ধানের শীষ। বিদ্রোহীর কারণে বাঁশখালী হাতছাড়া হলেও বাকি আসনগুলোতে বিএনপির বিজয় ছিল অনেকটা একপেশে।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে বিএনপির যে দাপট ছিল, এবারের ফলাফল তাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১২টি আসনে জয়ী হয়েছিল। এবারের নির্বাচনেও সেই সংখ্যা স্পর্শ করেছে দলটি। এমনকি স্থগিত থাকা দুটি আসনের (ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ড) ফলাফল যদি শেষ পর্যন্ত বিএনপির পক্ষে আসে, তবে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৩টি আসনে জয় পেয়েছিল, যা ছিল দলের জন্য বড় ধাক্কা। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে কোণঠাসা হয়ে পড়া দলটি ২০২৬ সালে এসে আবারও নিজেদের পূর্ণ শক্তি জানান দিল।
জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি এবং বাঁশখালীর সমীকরণ
বিএনপির জয়জয়কারের মধ্যেও ব্যতিক্রম ছিল চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসন। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনটি ঐতিহ্যগতভাবেই জামায়াতে ইসলামীর ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। সেখানে বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমীন ১ লাখ ৩০ হাজার ভোট পেলেও জামায়াতের হেভিওয়েট প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর কাছে ৫১ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে বিএনপির হারের মূল কারণ ছিল দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থী। এখানে ধানের শীষের মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী ৮৩ হাজার ১০৫ ভোট পেলেও বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ লেয়াকত আলী (ফুটবল প্রতীক) ৫৫ হাজার ৪৯২ ভোট কেটে নেওয়ায় লাভবান হয়েছে জামায়াত। ফলে ৯৩ হাজার ১৬৭ ভোট পেয়ে এই আসনে জয়ী হন জামায়াতের মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।
ঝুলে আছে দুই আসনের ভাগ্য
আইনি জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর ও আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা নিয়ে আপিল বিভাগে জামায়াতের প্রার্থীদের করা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় নির্বাচন কমিশন এখনই গেজেট প্রকাশ করতে পারছে না। তবে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এই দুই আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।
নগর ও জেলায় একচ্ছত্র আধিপত্য
চট্টগ্রাম নগরীর ৪টি আসনের সব কটিতেই জয় পেয়েছে বিএনপি। কোতোয়ালি, ডবলমুরিং, বন্দর-পতেঙ্গা ও পাহাড়তলী-হালিশহর—সবখানেই ধানের শীষের প্রার্থীরা জামায়াত ও অন্যান্য দলের প্রার্থীদের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছেন। উত্তর চট্টগ্রামের ৭টির মধ্যে ৫টি এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৫টির মধ্যে ৩টি আসন বিএনপির দখলে এসেছে।
বিজয়ী প্রার্থীরা কে কত ভোট পেলেন
চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই): নুরুল আমিন (বিএনপি) ১,২৮,৭৯৯ ভোট।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ): মোস্তফা কামাল পাশা (বিএনপি) ৭৩,০৩৭ ভোট।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী): মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (বিএনপি) ১,৪৭,০৫৪ ভোট।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান): গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী (বিএনপি) ১,১২,২৩৭ ভোট।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া): হুমাম কাদের চৌধুরী (বিএনপি) ১,০১,৪৪৫ ভোট।
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী): এরশাদ উল্লাহ (বিএনপি) ১,৬১,৭৩৭ ভোট।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি): আবু সুফিয়ান (বিএনপি) ১,০৯,৩৮৮ ভোট।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং): সাঈদ আল নোমান তূর্য (বিএনপি) ১,২২,৯৭৮ ভোট।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর): আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (বিএনপি) ১,১৫,০২১ ভোট।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া): এনামুল হক এনাম (বিএনপি) ১,৩৫,০৪৪ ভোট।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা): সরোয়ার জামাল নিজাম (বিএনপি) ১,২৬,১৯২ ভোট।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ): জসীম উদ্দীন আহমেদ (বিএনপি) ৭৬,৪৯৩ ভোট।
