সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

দুই দশক পর ক্ষমতায় বিএনপি: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বড় বাঁকবদল ঘটল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক বা ২০ বছর পর ভোটের মাধ্যমে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সংসদরে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করেছে দলটি।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্ব। প্রথমবারের মতো তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি এই বিশাল বিজয় অর্জন করল এবং তিনি নিজেও প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন।

তারেক রহমানের অভিষেক ও প্রধানমন্ত্রীর পদ

দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তারেক রহমান। এর মাত্র কয়েক দিন পর, ৩০ ডিসেম্বর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যুর শোক এবং দলের নেতৃত্বের ভার—এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই গত ৯ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

নির্বাচনে তিনি ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন। দলের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তিনিই হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা ইতিমধ্যেই তাঁকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেছেন।

রাজনৈতিক সমীকরণ: মিত্র যখন প্রধান প্রতিপক্ষ

এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিএনপির দীর্ঘকালের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর শেখ হাসিনাসহ দলটির অনেক নেতা ভারতে অবস্থান করছেন এবং দেশে থাকা অধিকাংশ নেতা কারাগারে রয়েছেন। সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় ভোটের মাঠে তাদের অনুপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

এই শূন্যতায় বিএনপির মূল লড়াই হয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী ও মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের অন্যতম শরিক ছিল জামায়াত। তবে এবার তারা আলাদাভাবে লড়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে ৭৮টি আসন পেয়েছে, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে।

ভোটের অঙ্ক ও হেভিওয়েটদের জয়-পরাজয়

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২৯৯টি সংসদীয় আসনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী:

* বিএনপি ও তার মিত্ররা মিলে এখন পর্যন্ত ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে।

* বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা প্রায় সবাই জয়ী হয়েছেন।

* জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ পরাজিত হয়েছেন।

* এনসিপি (জামায়াত জোট) থেকে নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমের মতো ছাত্রনেতারা বিজয়ী হয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) ও এজেডএম রেজওয়ানুল হক (দিনাজপুর-৫) জয়ী হয়েছেন, যদিও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে।

স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনে বিএনপির বিশাল জয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এই বিজয় গণতন্ত্রের, এই বিজয় বাংলাদেশের’। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করবেন।

তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াত। দলটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে:

* ফলাফল তৈরি ও ঘোষণার ধরন পরিষ্কার নয়।

* প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি এবং ফলাফলে গরমিল রয়েছে বলে তাদের মনে হয়েছে।

* অনেক জায়গায় তাদের প্রার্থীরা রহস্যজনকভাবে অল্প ব্যবধানে হেরেছেন।

২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতার ও নির্যাতনের স্মৃতি পেছনে ফেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে। নিয়মানুযায়ী গেজেট প্রকাশের পরই শপথ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করে এবং বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা সংসদে কেমন হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

দুই দশক পর ক্ষমতায় বিএনপি: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:২৩

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বড় বাঁকবদল ঘটল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক বা ২০ বছর পর ভোটের মাধ্যমে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সংসদরে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করেছে দলটি।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্ব। প্রথমবারের মতো তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি এই বিশাল বিজয় অর্জন করল এবং তিনি নিজেও প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন।

তারেক রহমানের অভিষেক ও প্রধানমন্ত্রীর পদ

দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তারেক রহমান। এর মাত্র কয়েক দিন পর, ৩০ ডিসেম্বর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যুর শোক এবং দলের নেতৃত্বের ভার—এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই গত ৯ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

নির্বাচনে তিনি ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন। দলের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তিনিই হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা ইতিমধ্যেই তাঁকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেছেন।

রাজনৈতিক সমীকরণ: মিত্র যখন প্রধান প্রতিপক্ষ

এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিএনপির দীর্ঘকালের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর শেখ হাসিনাসহ দলটির অনেক নেতা ভারতে অবস্থান করছেন এবং দেশে থাকা অধিকাংশ নেতা কারাগারে রয়েছেন। সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় ভোটের মাঠে তাদের অনুপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

এই শূন্যতায় বিএনপির মূল লড়াই হয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী ও মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের অন্যতম শরিক ছিল জামায়াত। তবে এবার তারা আলাদাভাবে লড়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে ৭৮টি আসন পেয়েছে, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে।

ভোটের অঙ্ক ও হেভিওয়েটদের জয়-পরাজয়

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২৯৯টি সংসদীয় আসনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী:

* বিএনপি ও তার মিত্ররা মিলে এখন পর্যন্ত ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে।

* বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা প্রায় সবাই জয়ী হয়েছেন।

* জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ পরাজিত হয়েছেন।

* এনসিপি (জামায়াত জোট) থেকে নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমের মতো ছাত্রনেতারা বিজয়ী হয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) ও এজেডএম রেজওয়ানুল হক (দিনাজপুর-৫) জয়ী হয়েছেন, যদিও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে।

স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনে বিএনপির বিশাল জয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এই বিজয় গণতন্ত্রের, এই বিজয় বাংলাদেশের’। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করবেন।

তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াত। দলটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে:

* ফলাফল তৈরি ও ঘোষণার ধরন পরিষ্কার নয়।

* প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি এবং ফলাফলে গরমিল রয়েছে বলে তাদের মনে হয়েছে।

* অনেক জায়গায় তাদের প্রার্থীরা রহস্যজনকভাবে অল্প ব্যবধানে হেরেছেন।

২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতার ও নির্যাতনের স্মৃতি পেছনে ফেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে। নিয়মানুযায়ী গেজেট প্রকাশের পরই শপথ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করে এবং বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা সংসদে কেমন হয়।