সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

ঋণখেলাপি ইস্যুতে দুই এমপির শপথ আটকে, বাকি ৯ জনের কী হবে?

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্তত ৪৫ ঋণখেলাপির মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন, যারা সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিষ্পত্তি না হওয়ায় চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসনের দুই বিজয়ীর আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে আগামীকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সংশোধিত আরপিওতে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি কারও বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি বা হলফনামায় তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে পারবে ইসি। ফলে আদালতের স্থগিতাদেশ উঠে গেলে বা মেয়াদ শেষ হলে এবং ব্যাংক পুনরায় খেলাপি দেখালে এই সংসদ সদস্যদের পদ হারানোর ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ঋণের তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) দুটি তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠায়। একটিতে ৮২ জনকে সরাসরি ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং অন্যটিতে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া ৩১ জনের নাম ছিল। আইনি প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্তভাবে ৩০ জন নির্বাচনে অংশ নেন। এর মধ্যে ১৫ জন আপিল বা আদালতের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন।

স্থগিতাদেশ নিয়ে বিজয়ী যারা

চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী বিএনপির সরোয়ার আলমগীরের মালিকানাধীন এনএফজেড টেরি টেক্সটাইলের নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ২০১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। হাইকোর্টের আদেশে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও আপিল বিভাগে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ফলাফল স্থগিত থাকবে।

একইভাবে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিজয়ী আসলাম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণও খেলাপি ছিল। আদালতের নির্দেশে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার তাকে মনোনয়ন বৈধ করার সময় বলেছিলেন, ‘‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।’’

এছাড়া চট্টগ্রাম-৬ আসনের গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৯ আসনের মো. আবুল কালাম, বগুড়া-১ আসনের কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-৫ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, টাঙ্গাইল-৪ আসনের মো. লুৎফর রহমান, ময়মনসিংহ-৫ আসনের মোহাম্মদ জাকির হোসেন, মৌলভীবাজার-৪ আসনের মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং সিলেট-১ আসনের খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এদের অনেকেরই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। অথচ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা জেলে যায়, আর প্রভাবশালীরা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এটি রাষ্ট্র সংস্কারের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার বিপরীত।’’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘আদালত কি তাহলে যারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ারই যোগ্য নয়, তাদের বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দিলেন? এর মাধ্যমে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে গেছে।’’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করা একটি সাময়িক সমাধান। আশা করি, নির্বাচিতরা ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতপশিলের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়মিত করবেন।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

ঋণখেলাপি ইস্যুতে দুই এমপির শপথ আটকে, বাকি ৯ জনের কী হবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:২০

উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্তত ৪৫ ঋণখেলাপির মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন, যারা সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিষ্পত্তি না হওয়ায় চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসনের দুই বিজয়ীর আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে আগামীকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সংশোধিত আরপিওতে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি কারও বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি বা হলফনামায় তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে পারবে ইসি। ফলে আদালতের স্থগিতাদেশ উঠে গেলে বা মেয়াদ শেষ হলে এবং ব্যাংক পুনরায় খেলাপি দেখালে এই সংসদ সদস্যদের পদ হারানোর ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ঋণের তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) দুটি তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠায়। একটিতে ৮২ জনকে সরাসরি ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং অন্যটিতে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া ৩১ জনের নাম ছিল। আইনি প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্তভাবে ৩০ জন নির্বাচনে অংশ নেন। এর মধ্যে ১৫ জন আপিল বা আদালতের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন।

স্থগিতাদেশ নিয়ে বিজয়ী যারা

চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী বিএনপির সরোয়ার আলমগীরের মালিকানাধীন এনএফজেড টেরি টেক্সটাইলের নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ২০১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। হাইকোর্টের আদেশে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও আপিল বিভাগে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ফলাফল স্থগিত থাকবে।

একইভাবে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিজয়ী আসলাম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণও খেলাপি ছিল। আদালতের নির্দেশে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার তাকে মনোনয়ন বৈধ করার সময় বলেছিলেন, ‘‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।’’

এছাড়া চট্টগ্রাম-৬ আসনের গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৯ আসনের মো. আবুল কালাম, বগুড়া-১ আসনের কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-৫ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, টাঙ্গাইল-৪ আসনের মো. লুৎফর রহমান, ময়মনসিংহ-৫ আসনের মোহাম্মদ জাকির হোসেন, মৌলভীবাজার-৪ আসনের মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং সিলেট-১ আসনের খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এদের অনেকেরই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। অথচ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা জেলে যায়, আর প্রভাবশালীরা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এটি রাষ্ট্র সংস্কারের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার বিপরীত।’’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘আদালত কি তাহলে যারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ারই যোগ্য নয়, তাদের বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দিলেন? এর মাধ্যমে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে গেছে।’’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করা একটি সাময়িক সমাধান। আশা করি, নির্বাচিতরা ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতপশিলের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়মিত করবেন।’’