সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

নারীর ক্ষমতায়নে আসছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কী এই কার্ড?

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে হাঁপিয়ে ওঠা দেশের মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে আসছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জর্জরিত অর্থনীতিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। মূলত নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনকে পাখির চোখ করে আগামী ১০ মার্চ পরীক্ষামূলকভাবে দেশজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে এই কর্মসূচি। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১০০টির মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু থাকলেও দ্বৈততা ও দুর্নীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

১৪ স্থানে শুরু হচ্ছে পাইলট প্রকল্প

ইতোমধ্যে ১৪টি স্থানে পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর কড়াইল ও ভাষানটেক বাগানবাড়ি বস্তি, রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ।

সুনামগঞ্জ জেলার সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় জানান, তাঁদের চার সদস্যের ওয়ার্ড কমিটি গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করেছে। জরিপ ও ডেটা এন্ট্রির কাজ প্রায় শেষ, তাই ১০ মার্চ থেকেই সুনামগঞ্জে কর্মসূচি শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী। একই ধরনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার দায়িত্বে থাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মিল্টন মুহুরি।

আগামী ৯ মার্চের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড মুদ্রণের কাজ শেষ হবে। ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের দিনই সুবিধাভোগীদের মুঠোফোনে প্রথম মাসের নগদ সহায়তার অর্থ পৌঁছে যাবে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করবে পাঁচ স্তরের কমিটি

উপকারভোগী নির্বাচন ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌর এবং ওয়ার্ড কমিটি কাজ করবে। এসব কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবেন অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা কমিটি, যার সদস্যসচিব হবেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কারিগরি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা কমিটিও কাজ করবে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় মূল দায়িত্বে থাকলেও নারী ও শিশু, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থ ও পরিকল্পনাসহ মোট ১৪টি মন্ত্রণালয় এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে। তিনি জানান, প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারগুলো এই কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।

কারা পাবেন এই কার্ড?

ফ্যামিলি কার্ড মূলত একটি একীভূত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। পরিবারের মা অথবা নারীপ্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হবে, যাঁর বয়স অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি হতে হবে। কার্ডে নাগরিকের যাবতীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সুবিধাভোগী নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না; বরং বৈজ্ঞানিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পরিবারের আর্থিক শ্রেণি নির্ধারণ করা হবে।

আর্থিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

প্রাথমিক পর্যায়ের চার মাসের এই প্রকল্পে ৪০ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়ার জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে নগদ অর্থ সহায়তা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে। বাজেটঘাটতি এড়াতে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং দ্বৈত কর্মসূচি বাতিল করে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন হায়দার মনে করেন, চলমান কর্মসূচির ত্রুটি ও স্বজনপ্রীতি দূর করে এই কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট ধারায় আনা সম্ভব হবে। এতে সম্পদের অপচয় রোধ হবে এবং প্রকৃত অভাবীরা সাহায্য পাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার পদক্ষেপ। তবে দেশব্যাপী এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ও প্রশাসনিক ব্যয়ের প্রয়োজন হবে, যা বিশাল এক আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

নারীর ক্ষমতায়নে আসছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কী এই কার্ড?

নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ মার্চ ২০২৬, ১২:১০

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে হাঁপিয়ে ওঠা দেশের মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে আসছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জর্জরিত অর্থনীতিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। মূলত নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনকে পাখির চোখ করে আগামী ১০ মার্চ পরীক্ষামূলকভাবে দেশজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে এই কর্মসূচি। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১০০টির মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু থাকলেও দ্বৈততা ও দুর্নীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

১৪ স্থানে শুরু হচ্ছে পাইলট প্রকল্প

ইতোমধ্যে ১৪টি স্থানে পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর কড়াইল ও ভাষানটেক বাগানবাড়ি বস্তি, রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ।

সুনামগঞ্জ জেলার সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় জানান, তাঁদের চার সদস্যের ওয়ার্ড কমিটি গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করেছে। জরিপ ও ডেটা এন্ট্রির কাজ প্রায় শেষ, তাই ১০ মার্চ থেকেই সুনামগঞ্জে কর্মসূচি শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী। একই ধরনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার দায়িত্বে থাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মিল্টন মুহুরি।

আগামী ৯ মার্চের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড মুদ্রণের কাজ শেষ হবে। ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের দিনই সুবিধাভোগীদের মুঠোফোনে প্রথম মাসের নগদ সহায়তার অর্থ পৌঁছে যাবে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করবে পাঁচ স্তরের কমিটি

উপকারভোগী নির্বাচন ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌর এবং ওয়ার্ড কমিটি কাজ করবে। এসব কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবেন অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা কমিটি, যার সদস্যসচিব হবেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কারিগরি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা কমিটিও কাজ করবে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় মূল দায়িত্বে থাকলেও নারী ও শিশু, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থ ও পরিকল্পনাসহ মোট ১৪টি মন্ত্রণালয় এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে। তিনি জানান, প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারগুলো এই কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।

কারা পাবেন এই কার্ড?

ফ্যামিলি কার্ড মূলত একটি একীভূত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। পরিবারের মা অথবা নারীপ্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হবে, যাঁর বয়স অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি হতে হবে। কার্ডে নাগরিকের যাবতীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সুবিধাভোগী নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না; বরং বৈজ্ঞানিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পরিবারের আর্থিক শ্রেণি নির্ধারণ করা হবে।

আর্থিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

প্রাথমিক পর্যায়ের চার মাসের এই প্রকল্পে ৪০ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়ার জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে নগদ অর্থ সহায়তা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে। বাজেটঘাটতি এড়াতে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং দ্বৈত কর্মসূচি বাতিল করে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন হায়দার মনে করেন, চলমান কর্মসূচির ত্রুটি ও স্বজনপ্রীতি দূর করে এই কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট ধারায় আনা সম্ভব হবে। এতে সম্পদের অপচয় রোধ হবে এবং প্রকৃত অভাবীরা সাহায্য পাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার পদক্ষেপ। তবে দেশব্যাপী এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ও প্রশাসনিক ব্যয়ের প্রয়োজন হবে, যা বিশাল এক আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।