ইরানের শাহেদ সিরিজের ‘কামিকাজে’ বা আত্মঘাতী ড্রোন আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এখন এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম। জ্বালানিসাশ্রয়ী ইঞ্জিন, রাডার ফাঁকি দেওয়ার অদ্ভুত সক্ষমতা এবং ৪০ থেকে ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহনের ক্ষমতা—সব মিলিয়ে এই ড্রোন শত্রুপক্ষের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, একেকটি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। সস্তা হওয়ায় বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করে যেকোনো দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সহজেই বোকা বানানো সম্ভব হচ্ছে।
আকাশ প্রতিরক্ষায় ড্রোনের ঢেউ
শাহেদ-১৩১ ও ১৩৬ সিরিজের এই ড্রোনগুলো মূলত সাধারণ মানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই কাজ করে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইরান এগুলোকেই প্রতিরোধের প্রধান ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। শত শত মাইল পথ অনায়াসে পাড়ি দিয়ে সামরিক ঘাঁটি, তেল শোধনাগার ও বেসামরিক স্থাপনায় নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে এসব ড্রোন। হাইপারসনিক গতি বা অত্যাধুনিক স্টিলথ প্রযুক্তি না থাকলেও, এই ড্রোনের মূল শক্তি হলো এর বিশাল সংখ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়টের মতো অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখতে ইরান একসঙ্গে শত শত ড্রোনের ‘ঢেউ’ পাঠায়।
ইরানের চতুর রণকৌশল
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইরানের রণকৌশল হলো এই ‘উড়ন্ত ক্ষেপণাস্ত্র’ দিয়ে প্রথমে প্রতিপক্ষের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অকেজো করে দেওয়া। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যখন সস্তা ড্রোন ঠেকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই বড় ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মূল হামলা চালানো হয়, যাতে অনায়াসেই লক্ষ্যভেদ সফল হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি ড্রোন ছুড়েছে। তবে মার্কিন প্রযুক্তির প্যাট্রিয়ট বা থাড ব্যবস্থার কার্যকারিতাও নেহায়েত কম নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এসব ড্রোনের ৯০ শতাংশের বেশি রুখে দিতে পেরেছে। কোনো কোনো দেশ এই সাফল্যের হার ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত বলেও দাবি করেছে।
অর্থনৈতিক যুদ্ধে জয়ী শাহেদ
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বেশির ভাগ ড্রোন ভূপাতিত করা হলেও দিন শেষে তা ইরানের জন্যই একধরনের জয়। কারণ, মাত্র ২০ হাজার ডলার মূল্যের একটি সাধারণ ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় ৪০ লাখ (৪ মিলিয়ন) ডলারের শক্তিশালী রকেট খরচ করতে হয়। চার বছর আগে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব এই বড় সমস্যার কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না। সস্তা ড্রোনের উৎপাদন খরচের সঙ্গে একে ঠেকানোর আকাশচুম্বী খরচের এই বিশাল ব্যবধানই এখন পশ্চিমাদের প্রধান মাথাব্যথা।
কী আছে এই শাহেদ ড্রোনে?
সহজ কথায়, শাহেদ-১৩১ বা ১৩৬ হলো ছোট ডেল্টা-উইংবিশিষ্ট একধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। এর পেছনে একটি প্রপেলারচালিত ইঞ্জিন থাকে। ফারসি শব্দ ‘শাহেদ’-এর অর্থ হলো সাক্ষী। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ইরানের ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ’ এই ড্রোন তৈরি শুরু করে। নিখুঁতভাবে লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম এই ড্রোনে উৎক্ষেপণের সময় এককালীন ব্যবহারযোগ্য একটি ‘রকেট-বুস্টার’ যুক্ত থাকে। নির্দিষ্ট উচ্চতায় ওঠার পর বুস্টারটি খসে পড়ে এবং এর ফোর-সিলিন্ডার পিস্টন ইঞ্জিন সচল হয়। জেট ইঞ্জিনের বদলে প্রপেলার ব্যবহারের ফলে এর গতি কিছুটা কমে যায়, যা ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার।
ধীরগতির হলেও এই ড্রোন অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে এবং লক্ষ্যবস্তুর ওপর চক্কর দিয়ে ছোঁ মেরে আঘাত হানতে পারে। এর মাথায় ৬০ থেকে ৯০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করা সম্ভব। আকৃতিতে ছোট হওয়ায় ইরানের যেকোনো জায়গা থেকেই এটি উৎক্ষেপণ করা যায়।
শনাক্ত করা কঠিন কেন?
সস্তা ও কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি এসব ড্রোন রাডারে শনাক্ত করাও বেশ কঠিন। খুব সহজে উৎক্ষেপণ করা যায় বলে ঠিক কোথা থেকে ড্রোনটি ওড়ানো হয়েছে, তা ধরা প্রায় অসম্ভব। তবে ওড়ার সময় এর পিস্টন ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শব্দ থেকে অনেক সময় উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। রাশিয়া অবশ্য এই প্রযুক্তিতে আরও পরিবর্তন এনেছে। ফলে এগুলো এখন রাতের অন্ধকারেও সমান কার্যকর এবং এদের ডানা রাডার ফাঁকি দিতে আরও বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছে।
গত ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধে এই ড্রোন বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধেও রাশিয়া ব্যাপক হারে এই ড্রোন ব্যবহার করছে। তবে ইউক্রেন এই ড্রোন মোকাবিলায় একটি দক্ষ ‘অ্যান্টি-ড্রোন স্কোয়াড’ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পশ্চিম এশিয়ায় তাঁর এই বিশেষ দল মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে শর্ত হিসেবে তিনি পশ্চিমাদের ভ্লাদিমির পুতিনকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করার কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা চাল: আত্মঘাতী ‘লুকাস’
শাহেদ ড্রোনের এই অভাবনীয় রণকৌশলগত সাফল্য দেখে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও এখন একই ধরনের সস্তা ও কার্যকর ড্রোন তৈরির পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই ‘নতুন’ যুদ্ধে ওয়াশিংটন এখন ইরানের শাহেদ ড্রোনের অনুকরণে তৈরি নিজস্ব সংস্করণ মাঠে নামিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই ড্রোনগুলোর নাম দিয়েছে ‘লুকাস’ বা লো কস্ট আনক্রিউড কমব্যাট সিস্টেম। এগুলো মূলত একমুখী বা আত্মঘাতী ড্রোন।
একেকটি লুকাস ড্রোনের উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার। শাহেদের মতোই এটি নিখুঁত নিশানায় লক্ষ্যবস্তুর ওপর চক্কর কেটে সুযোগ বুঝে আঘাত হানতে পারে। গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র এই কৌশলগত পরিবর্তনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে এবং পশ্চিম এশিয়ায় ‘টাস্কফোর্স স্করপিয়ন স্ট্রাইক’ নামে তাদের প্রথম আত্মঘাতী ড্রোনের স্কোয়াড্রন চালু করে।
