চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসিতে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। দৈনিক শোধনক্ষমতা অনুযায়ী এই মজুত দিয়ে আরও ২০ থেকে ২২ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব।
তবে নির্ধারিত সময়ে নতুন চালান না এলে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগারটির উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ায় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়েও ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে তেল আনতে গিয়ে একটি জাহাজ আটকে থাকায় এই অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, নরডিক পলুকস নামের ওই জাহাজে গত ৩ মার্চ অপরিশোধিত তেল তোলা হয়। জাহাজটি রওনা দিলেও পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় আবার রাস তানুরা টার্মিনালে ফিরে যেতে হয়েছে এবং বর্তমানে সেটি সেখানেই অবস্থান করছে।
চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার। আমদানি করা অপরিশোধিত তেল এখানে শোধন করে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, ন্যাফথাসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করা হয়।
পরে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে সেগুলো ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। রিফাইনারি সূত্র জানায়, শোধনাগারটির মোট সংরক্ষণের সক্ষমতা প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টন এবং বর্তমানে মজুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল।
এই শোধনাগারে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টন পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল শোধন করা যায়।
সার্বিক বিষয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত জানান, অপরিশোধিত তেলের বড় অংশই হরমুজ প্রণালি পার হয়ে আসে। এখন এই প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা চলছে।
মো. শরীফ হাসনাত আরও জানান, তাদের কাছে যে তেল রয়েছে, সেটি দিয়ে ২০ থেকে ২২ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। এর মধ্যে নতুন চালান না এলে উৎপাদনে চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে দেশের জ্বালানি সরবরাহ অপরিশোধিত তেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয় বলে উল্লেখ করেন মো. শরীফ হাসনাত।
মো. শরীফ হাসনাত জানান, মোট আমদানির ৮০ শতাংশই পরিশোধিত তেল। ফলে এই মুহূর্তে বড় সংকটের আশঙ্কা নেই, তবে জাহাজটি পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও স্বস্তিদায়ক হতো।
রিফাইনারি সূত্র জানায়, বর্তমানে মজুত থাকা অপরিশোধিত তেল থেকে প্রায় ৪০ হাজার টন ডিজেল, ১৫ থেকে ২০ হাজার টন পেট্রল ও অকটেন এবং প্রায় ৩০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল উৎপাদন করা সম্ভব।
জাহাজের সূচি নিয়ে সংশয়
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হয়। এরপর ইরান পাল্টা হামলা চালালে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ ঘিরে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অপরিশোধিত তেলের বড় অংশই এই প্রণালি ব্যবহার করে দেশে আসে।
বিপিসি সূত্র জানায়, প্রতিবছর ৭ থেকে ৮ লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড তেল সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকো থেকে আমদানি করা হয়। এই তেল সাধারণত রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে জাহাজে তোলা হয়।
অন্যদিকে, প্রায় একই পরিমাণ মারবান ক্রুড অয়েল সরবরাহ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক)। এই তেল অনেক সময় ফুজাইরাহ বন্দর ব্যবহার করেও পাঠানো যায়, যেখানে হরমুজ প্রণালি পার হতে হয় না।
বিপিসির আমদানি সূচি অনুযায়ী, চলতি বছর রাস তানুরা থেকে এপ্রিল, জুন, জুলাই, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বরে আরও ছয়টি জাহাজে করে প্রায় ৬ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসার কথা রয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব চালান নির্ধারিত সময়ে আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে দেশীয় শোধনাগারের উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
কারণ, দেশে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় শতভাগ এবং অকটেনের বড় অংশই দেশীয় শোধনাগার ও কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত হয়। ফলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে গেলে এসব জ্বালানির উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে রিফাইনারি ও বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দেশে পরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিভিন্ন উৎস থেকে আসছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই।
পরিশোধিত তেলই বেশি আমদানি
বাংলাদেশে মূলত পরিশোধিত ও অপরিশোধিত—এই দুই ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই পরিশোধিত জ্বালানি তেল, যা সরাসরি ব্যবহার করা হয়।
এসব তেল মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ওমান, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকায় ৪৭ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে প্রায় ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায় ১৫ লাখ ১০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়েছে, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে।
এছাড়া স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করেও কিছু জ্বালানি উৎপাদন করা হয়। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রায় ১৪ লাখ ৯৬ হাজার টন পণ্য উৎপাদন করেছে, যার মধ্যে ডিজেল ছিল প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানান, মোট আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, বাকি ৮০ শতাংশই পরিশোধিত তেল।
অনিন্দ্য ইসলাম আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত ও চীনের মতো দেশ থেকেও সরবরাহ আসছে। এ কারণে আপাতত জ্বালানি তেল নিয়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই।
বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন অনিন্দ্য ইসলাম।
অনিন্দ্য ইসলাম জানান, এর অংশ হিসেবে ব্রুনেই থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফলে অপরিশোধিত তেল না এলেও এ মুহূর্তে সংকটে পড়তে হচ্ছে না।
