সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

বাহরাইনে নিহত তারেকের বাড়িতে কান্নার রোল, ঈদ নেই তাসমিমদের

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

চারপাশে ঈদের আনন্দ-উৎসবের জোয়ার। ঈদের খুশিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট-বড় সবাই। মেতে আছে হইহুল্লোড়, আড্ডা-গল্প আর আলাপে। তবে উচ্ছ্বাসের এই রং বিন্দুমাত্র স্পর্শ করেনি কলেজপড়ুয়া তাসমিম তামান্না ও তার পরিবারকে। বরং পরিবারটি ডুবে আছে চরম বিষাদে। ঈদের দিনে তাদের ঘরের সদস্যদের সঙ্গী কেবলই নিঃশব্দ কান্না আর বুকফাটা কষ্ট।

তাসমিম তামান্নাদের ঈদের খুশি কেড়ে নিয়েছে এখন থেকে বহুদূরের এক যুদ্ধ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ। এই যুদ্ধেই অকালে প্রাণ গেছে তাসমিমের বাবা বাহরাইনপ্রবাসী আবুল মহসিন তারেকের (৪৮)। মৃত্যুর ২০ দিন পার হলেও এখনো বাবার মরদেহ বুঝে পায়নি তাসমিম তামান্না। বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় প্রবাসী আবুল মহসিন তারেকের লাশ পড়ে আছে বাহরাইনের হাসপাতালের মর্গে।

নিহত আবুল মহসিন তারেকের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজিমপুর ইউনিয়নে। ২৭ বছর আগে তিনি বাহরাইনে যান। দেশে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও মেয়ে তাসমিম তামান্না। তাসমিম তামান্না নগরের বেপজা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে।

বাহরাইনের রাজধানী মানামার আরসি ড্রাইডক নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন আবুল মহসিন তারেক। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ১ মার্চ রাতে বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন তিনি।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন আজ শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরে আবুল মহসিন তারেকের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে ঈদের আনন্দ, রঙিন পোশাক আর শুভেচ্ছার ভিড়। কিন্তু সেই আনন্দ যেন এই পরিবারটিকে ছুঁতে পারেনি। বাসার ভেতরটায় এখন শুধু শোকের ভারী আবহ। আত্মীয়স্বজন আসছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন—তবু শূন্যতা কিছুতেই কাটছে না।

তাসমিম তামান্নাদের এবারের ঈদের গল্প এমন করুণ হওয়ার কথা ছিল না। ২৭ বছর ধরে প্রবাসে থাকা আবুল মহসিন তারেকের গত ১৫ বছরে দেশে ঈদ করা হয়নি। তাই এবার দেশেই পবিত্র ঈদুল ফিতর ও পবিত্র ঈদুল আজহা পালনের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও মেয়ে তাসমিম তামান্নাসহ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপও করে রেখেছিলেন। জানিয়েছিলেন, ছুটি পেলেই রোজার মধ্যে দেশে আসবেন। তবে যুদ্ধ একদিকে আবুল মহসিন তারেকের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে, তেমনি দেশে থাকা পরিবারের সব স্বপ্ন-সাধ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছে।

ঈদের দিন ঘুরেফিরে বাবার স্মৃতি মনে পড়ছে তাসমিম তামান্নার। এসব স্মৃতির কথা স্মরণ করতে গিয়ে কখনো নীরবে, কখনো ডুকরে কেঁদে উঠছিল এই তরুণী। আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের বউবাজার কেতুরা মসজিদ গলি এলাকায় আলোকচিত্রী সৌরভ দাশের ক্যামেরায় ধরা পড়ে বাবার ছবি বুকে নিয়ে তাসমিম তামান্নার বোবা কান্নার সেই বেদনাবিধুর দৃশ্য।

ঈদের সময় বাবাকে কাছে না পাওয়ার একটি চাপা কষ্ট সব সময় ছিল তাসমিম তামান্নার। মেয়ের এমন দুঃখের কথা জানতেন বাবা আবুল মহসিন তারেক। তাই চাঁদরাত থেকে শুরু করে ঈদের দিন ও পরদিন—মেয়ের সঙ্গে দফায় দফায় ভিডিও কলে কথা বলতেন তিনি। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অনুরোধ করে মেয়ের কাছে নিয়ে আসতেন। মেয়ের ঈদের আনন্দে যাতে কোনো ভাটা না পড়ে, সে জন্য আগেই স্ত্রী রোকেয়া বেগমের কাছে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। তা দিয়ে কেনা হতো নতুন জামা–জুতা। একই সঙ্গে ঈদের সালামিও দিতে ভুলতেন না তিনি।

সে কথা স্মরণ করে তাসমিম তামান্না বলে, ঈদের সময় তো বাবাকে কাছে পেতাম না। তারপরও আমার যাতে মন খারাপ না হয়, কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ না থাকে, তার সব ব্যবস্থা করতেন তিনি। বারবার ভিডিও কল দিতেন। ভিডিও কলে বাবাকে সালাম করতাম। এরপর বাবার পাঠানো টাকা আমাকে সালামি হিসেবে দিত মা।

মুঠোফোনের স্মৃতিবক্সে জমা বাবার সঙ্গে নানা ধরনের ছবি দেখাতে থাকে তাসমিম তামান্না। এসবের ফাঁকে বাবা যেমন তার ঈদকে রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য নানা চেষ্টা করতেন, তেমনি তারও চেষ্টার কমতি ছিল না বাবার ঈদকে বর্ণিল করার জন্য।

তাসমিম তামান্না আরও বলে, বাবা সব সময় আমাকে হাতখরচের টাকা দিতেন। নানা উসিলায় বাবার কাছ থেকে টাকা নিতাম। এসব টাকা প্রয়োজন ছাড়া খরচ করতাম না। কিছু টাকা জমিয়ে রাখতাম। এই জমানো টাকা দিয়ে প্রতিবছর বাবার জন্য ঈদের সময় পাঞ্জাবি কিনতাম। তা বাবার কাছে পাঠিয়ে দিতাম। গত বছরও দিয়েছিলাম। আমার কেনা পাঞ্জাবি পরে বাবা ঈদের নামাজ পড়েছিলেন। কিন্তু এবার তো আরও বড় স্বপ্ন ছিল, বাবা দেশে আসবেন। একসঙ্গে মার্কেটে গিয়ে বাবাকে পছন্দের পাঞ্জাবি কিনে দেব। কিন্তু যুদ্ধ তো আমার বাবাকে কেড়ে নিল, আমার ঈদের আনন্দও কেড়ে নিয়েছে।

বোন রোকেয়া বেগম ও ভাগনি তাসমিম তামান্নাকে সান্ত্বনা দিতে ঈদের আগের রাতে চলে আসেন আবুল মহসিন তারেকের শ্যালক রিয়াজ উদ্দিন সোহরাব। ভগ্নিপতির এমন করুণ মৃত্যু এখনো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তাঁর। ঘরজুড়ে ভগ্নিপতির নানা স্মৃতিস্মারক ঘুরে ঘুরে দেখান তিনি।

রিয়াজ উদ্দিন সোহরাব বলেন, আগে কত আনন্দ হতো আমাদের। ঈদের সময় দুলাভাই ভিডিও কলে আমাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন। দেশে আসতে পারেন না, এ জন্য আমাদের ঈদের আগেই তাঁর বাসায় চলে আসতে বলতেন। এবার তো তাঁকে বলতে হয়নি। আমরা এসেছি। চারপাশে ঈদের আনন্দ। কিন্তু আমাদের তার কিছুই নেই। এমন হতাশার ঈদ কখনো আসেনি।

প্রবাসী আবুল মহসিন তারেককে জীবিত ফিরে পাবেন না—এমন বাস্তবতা মেনে নিয়েছে তাঁর আত্মীয়স্বজন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু এখনো মেনে নিতে পারছেন না রোকেয়া বেগম। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে কার্যত নীরব হয়ে গেছেন তিনি। নিজের কক্ষে প্রায় সময় চুপচাপ থাকেন। চারপাশে আছেন আত্মীয়স্বজন, কিন্তু চাপা কান্নাই তাঁর একমাত্র সঙ্গী।

জীবিত বাবাকে পাবে না, কিন্তু মৃত বাবার মরদেহ যেন দ্রুত দেশে নিয়ে আসা হয়—সরকারের প্রতি সেই আকুল আবেদন জানিয়েছে তাসমিম তামান্না। অন্তত যাতে বাবার শেষ স্পর্শটুকু নিতে পারে সে।

তাসমিম তামান্নার ঈদ এখন আর ঈদ নেই। নতুন জামা থাকলেও তা পরার ইচ্ছা নেই তার। তার ভাষ্য, আমার বাবাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু যেন আর কোনো মেয়েকে এভাবে বাবাকে হারাতে না হয়।

একটি পরিবারের ঈদ আজ থমকে গেছে যুদ্ধের নির্মমতায়। যে ঈদ হওয়ার কথা ছিল পুনর্মিলনের, তা হয়ে উঠেছে চিরবিদায়ের স্মৃতি। ঈদের আনন্দের মধ্যেও এই ঘরের নীরবতা অন্য সবাইকে যেন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—যুদ্ধ কি কখনো কোনো পরিবারের সুখ বয়ে আনে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

বাহরাইনে নিহত তারেকের বাড়িতে কান্নার রোল, ঈদ নেই তাসমিমদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ মার্চ ২০২৬, ২৩:১০

চারপাশে ঈদের আনন্দ-উৎসবের জোয়ার। ঈদের খুশিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট-বড় সবাই। মেতে আছে হইহুল্লোড়, আড্ডা-গল্প আর আলাপে। তবে উচ্ছ্বাসের এই রং বিন্দুমাত্র স্পর্শ করেনি কলেজপড়ুয়া তাসমিম তামান্না ও তার পরিবারকে। বরং পরিবারটি ডুবে আছে চরম বিষাদে। ঈদের দিনে তাদের ঘরের সদস্যদের সঙ্গী কেবলই নিঃশব্দ কান্না আর বুকফাটা কষ্ট।

তাসমিম তামান্নাদের ঈদের খুশি কেড়ে নিয়েছে এখন থেকে বহুদূরের এক যুদ্ধ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ। এই যুদ্ধেই অকালে প্রাণ গেছে তাসমিমের বাবা বাহরাইনপ্রবাসী আবুল মহসিন তারেকের (৪৮)। মৃত্যুর ২০ দিন পার হলেও এখনো বাবার মরদেহ বুঝে পায়নি তাসমিম তামান্না। বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় প্রবাসী আবুল মহসিন তারেকের লাশ পড়ে আছে বাহরাইনের হাসপাতালের মর্গে।

নিহত আবুল মহসিন তারেকের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজিমপুর ইউনিয়নে। ২৭ বছর আগে তিনি বাহরাইনে যান। দেশে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও মেয়ে তাসমিম তামান্না। তাসমিম তামান্না নগরের বেপজা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে।

বাহরাইনের রাজধানী মানামার আরসি ড্রাইডক নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন আবুল মহসিন তারেক। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ১ মার্চ রাতে বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন তিনি।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন আজ শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরে আবুল মহসিন তারেকের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে ঈদের আনন্দ, রঙিন পোশাক আর শুভেচ্ছার ভিড়। কিন্তু সেই আনন্দ যেন এই পরিবারটিকে ছুঁতে পারেনি। বাসার ভেতরটায় এখন শুধু শোকের ভারী আবহ। আত্মীয়স্বজন আসছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন—তবু শূন্যতা কিছুতেই কাটছে না।

তাসমিম তামান্নাদের এবারের ঈদের গল্প এমন করুণ হওয়ার কথা ছিল না। ২৭ বছর ধরে প্রবাসে থাকা আবুল মহসিন তারেকের গত ১৫ বছরে দেশে ঈদ করা হয়নি। তাই এবার দেশেই পবিত্র ঈদুল ফিতর ও পবিত্র ঈদুল আজহা পালনের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও মেয়ে তাসমিম তামান্নাসহ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপও করে রেখেছিলেন। জানিয়েছিলেন, ছুটি পেলেই রোজার মধ্যে দেশে আসবেন। তবে যুদ্ধ একদিকে আবুল মহসিন তারেকের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে, তেমনি দেশে থাকা পরিবারের সব স্বপ্ন-সাধ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছে।

ঈদের দিন ঘুরেফিরে বাবার স্মৃতি মনে পড়ছে তাসমিম তামান্নার। এসব স্মৃতির কথা স্মরণ করতে গিয়ে কখনো নীরবে, কখনো ডুকরে কেঁদে উঠছিল এই তরুণী। আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের বউবাজার কেতুরা মসজিদ গলি এলাকায় আলোকচিত্রী সৌরভ দাশের ক্যামেরায় ধরা পড়ে বাবার ছবি বুকে নিয়ে তাসমিম তামান্নার বোবা কান্নার সেই বেদনাবিধুর দৃশ্য।

ঈদের সময় বাবাকে কাছে না পাওয়ার একটি চাপা কষ্ট সব সময় ছিল তাসমিম তামান্নার। মেয়ের এমন দুঃখের কথা জানতেন বাবা আবুল মহসিন তারেক। তাই চাঁদরাত থেকে শুরু করে ঈদের দিন ও পরদিন—মেয়ের সঙ্গে দফায় দফায় ভিডিও কলে কথা বলতেন তিনি। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অনুরোধ করে মেয়ের কাছে নিয়ে আসতেন। মেয়ের ঈদের আনন্দে যাতে কোনো ভাটা না পড়ে, সে জন্য আগেই স্ত্রী রোকেয়া বেগমের কাছে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। তা দিয়ে কেনা হতো নতুন জামা–জুতা। একই সঙ্গে ঈদের সালামিও দিতে ভুলতেন না তিনি।

সে কথা স্মরণ করে তাসমিম তামান্না বলে, ঈদের সময় তো বাবাকে কাছে পেতাম না। তারপরও আমার যাতে মন খারাপ না হয়, কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ না থাকে, তার সব ব্যবস্থা করতেন তিনি। বারবার ভিডিও কল দিতেন। ভিডিও কলে বাবাকে সালাম করতাম। এরপর বাবার পাঠানো টাকা আমাকে সালামি হিসেবে দিত মা।

মুঠোফোনের স্মৃতিবক্সে জমা বাবার সঙ্গে নানা ধরনের ছবি দেখাতে থাকে তাসমিম তামান্না। এসবের ফাঁকে বাবা যেমন তার ঈদকে রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য নানা চেষ্টা করতেন, তেমনি তারও চেষ্টার কমতি ছিল না বাবার ঈদকে বর্ণিল করার জন্য।

তাসমিম তামান্না আরও বলে, বাবা সব সময় আমাকে হাতখরচের টাকা দিতেন। নানা উসিলায় বাবার কাছ থেকে টাকা নিতাম। এসব টাকা প্রয়োজন ছাড়া খরচ করতাম না। কিছু টাকা জমিয়ে রাখতাম। এই জমানো টাকা দিয়ে প্রতিবছর বাবার জন্য ঈদের সময় পাঞ্জাবি কিনতাম। তা বাবার কাছে পাঠিয়ে দিতাম। গত বছরও দিয়েছিলাম। আমার কেনা পাঞ্জাবি পরে বাবা ঈদের নামাজ পড়েছিলেন। কিন্তু এবার তো আরও বড় স্বপ্ন ছিল, বাবা দেশে আসবেন। একসঙ্গে মার্কেটে গিয়ে বাবাকে পছন্দের পাঞ্জাবি কিনে দেব। কিন্তু যুদ্ধ তো আমার বাবাকে কেড়ে নিল, আমার ঈদের আনন্দও কেড়ে নিয়েছে।

বোন রোকেয়া বেগম ও ভাগনি তাসমিম তামান্নাকে সান্ত্বনা দিতে ঈদের আগের রাতে চলে আসেন আবুল মহসিন তারেকের শ্যালক রিয়াজ উদ্দিন সোহরাব। ভগ্নিপতির এমন করুণ মৃত্যু এখনো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তাঁর। ঘরজুড়ে ভগ্নিপতির নানা স্মৃতিস্মারক ঘুরে ঘুরে দেখান তিনি।

রিয়াজ উদ্দিন সোহরাব বলেন, আগে কত আনন্দ হতো আমাদের। ঈদের সময় দুলাভাই ভিডিও কলে আমাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন। দেশে আসতে পারেন না, এ জন্য আমাদের ঈদের আগেই তাঁর বাসায় চলে আসতে বলতেন। এবার তো তাঁকে বলতে হয়নি। আমরা এসেছি। চারপাশে ঈদের আনন্দ। কিন্তু আমাদের তার কিছুই নেই। এমন হতাশার ঈদ কখনো আসেনি।

প্রবাসী আবুল মহসিন তারেককে জীবিত ফিরে পাবেন না—এমন বাস্তবতা মেনে নিয়েছে তাঁর আত্মীয়স্বজন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু এখনো মেনে নিতে পারছেন না রোকেয়া বেগম। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে কার্যত নীরব হয়ে গেছেন তিনি। নিজের কক্ষে প্রায় সময় চুপচাপ থাকেন। চারপাশে আছেন আত্মীয়স্বজন, কিন্তু চাপা কান্নাই তাঁর একমাত্র সঙ্গী।

জীবিত বাবাকে পাবে না, কিন্তু মৃত বাবার মরদেহ যেন দ্রুত দেশে নিয়ে আসা হয়—সরকারের প্রতি সেই আকুল আবেদন জানিয়েছে তাসমিম তামান্না। অন্তত যাতে বাবার শেষ স্পর্শটুকু নিতে পারে সে।

তাসমিম তামান্নার ঈদ এখন আর ঈদ নেই। নতুন জামা থাকলেও তা পরার ইচ্ছা নেই তার। তার ভাষ্য, আমার বাবাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু যেন আর কোনো মেয়েকে এভাবে বাবাকে হারাতে না হয়।

একটি পরিবারের ঈদ আজ থমকে গেছে যুদ্ধের নির্মমতায়। যে ঈদ হওয়ার কথা ছিল পুনর্মিলনের, তা হয়ে উঠেছে চিরবিদায়ের স্মৃতি। ঈদের আনন্দের মধ্যেও এই ঘরের নীরবতা অন্য সবাইকে যেন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—যুদ্ধ কি কখনো কোনো পরিবারের সুখ বয়ে আনে?