চট্টগ্রামের নাম নিলেই যেন অবচেতনভাবেই নাকে ভেসে আসে সুস্বাদু মেজবানি মাংসের ঘ্রাণ। হাজার বছরের লালিত এই ঐতিহ্য একসময় কেবল পারিবারিক বা সামাজিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে এই আপ্যায়ন একসময় মিশে যায় চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আর রাজনীতিতে এই উৎসবমুখর মেলবন্ধনের রূপকার হিসেবে সবার আগে উচ্চারিত হয় নগর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল নোমানের নাম।
১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর, ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোতোয়ালি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমবার মন্ত্রিত্বের স্বাদ পান তিনি। সেই অভাবনীয় বিজয় উদযাপনে আব্দুল্লাহ আল নোমান বিশাল পরিসরে যে মেজবানি ধারার সূচনা করেছিলেন, তা আজ বন্দরনগরীর রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
মাঝে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, শারীরিক অসুস্থতা ও করোনা মহামারির কারণে এই ঐতিহ্যে কিছুটা ভাটা পড়লেও, বাবার সেই বর্ণাঢ্য ধারা পরম মমতায় ধরে রেখেছেন তাঁর একমাত্র ছেলে ও বর্তমান সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। নিজের বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাঈদ আল নোমান জানান, তাঁর বাবা আমৃত্যু জনগণের জন্যই রাজনীতি করে গেছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবার সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে গিয়ে এলাকার মানুষের সেই আনন্দ ভাগ করে নিতে বাবার মতোই মেজবানের আয়োজন করেছেন তিনি। অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ঈদের পরদিন এই আয়োজন রাখা হয়েছে, যাতে দলমতনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ সেখানে অংশ নিতে পারে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ১৪টিতেই অভাবনীয় জয় পেয়েছে বিএনপি। দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণ দলটির নেতাকর্মীদের জন্য এবারের ঈদকে করে তুলেছে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। তাই বিজয়ের আনন্দ আর ঈদের উৎসব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে মেজবানের বিশাল আয়োজনে। নেতাদের ঘরে ঘরে এখন মেজবানি মাংসের সুবাস।
সাঈদ আল নোমানের পাশাপাশি দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও মেতেছেন এই উৎসবের আয়োজনে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বরাবরের মতোই এবার ঈদের পরদিন নগর বিএনপি কার্যালয়সংলগ্ন স্মরণিকা কমিউনিটি সেন্টারে নেতাকর্মীদের জন্য মেজবানের বিশাল আয়োজন করেছেন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান তাঁর মেজবানের জন্য বেছে নিয়েছেন কেবি কনভেনশন সেন্টারকে। পিছিয়ে নেই চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহও। ঈদের পরদিন চান্দগাঁওয়ে নিজের পৈতৃক নিবাসে তিনিও এক বড় মেজবানের আয়োজন রেখেছেন। পাশাপাশি, চট্টগ্রাম-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও দলের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী ঈদের দিনই তাঁর পৈতৃক নিবাসে মেজবানি মাংস দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের আপ্যায়নের ঘোষণা দিয়ে উৎসবের আমেজকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।
মেজবানের এই পুনর্জাগরণ কেবল একটি ভোজসভা নয়, এটি যেন তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্বের এক মহামিলন। প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল নোমানের ছায়াসঙ্গী ও দেশের অন্যতম শ্রমিক নেতা এ এম নাজিম উদ্দিন পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে জানান, সারা শহরে নেতাকর্মীরা স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করে পরের দিন যখন একসঙ্গে এক পাতে খেতে বসতেন, সেই দৃশ্যটি আব্দুল্লাহ আল নোমানকে ভীষণ আনন্দ দিত। তিনি নিজ হাতে কর্মীদের পাতে মেজবানের মাংস তুলে দিতেন।
এ এম নাজিম উদ্দিন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে উল্লেখ করেন যে, নোমান ভাই ছিলেন আপাদমস্তক একজন কর্মীবান্ধব নেতা এবং তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা অপূরণীয়। তবে বাবার সেই ফেলে যাওয়া ঐতিহ্য আজ সাঈদ আল নোমান সগৌরবে রক্ষা করছেন, যা পুরনো কর্মীদের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিয়েছে।
সাধারণ নেতাকর্মীদের মতে, রাজনীতির মাঠে এই মেজবানি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ দলের ভিত্তিকে আরও মজবুত করবে। চট্টগ্রামের রাজপথে আজ শুধুই বিজয়ের উল্লাস আর মেজবানি ঐক্যের এক নতুন দিনের সূচনা।
