সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

হামের প্রাদুর্ভাবে ২১৩ শিশুর মৃত্যু, দায়ী কারা?

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এক মাস তিন দিনে মোট ২১৩ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন পর্যন্ত হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২২ হাজার ৪০৯ জন, যদিও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশে হঠাৎ এই দুর্যোগ নেমে আসার পেছনে বিগত দুটি সরকার এবং বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৪০৯ জন। এই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ২৭৮ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৪ হাজার ৫২২ জন। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৩৫ জন এবং সন্দেহজনক হামে ১৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। কেবল গত ২৪ ঘণ্টাতেই নিশ্চিত হামে ৮৬ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৯৪২ জন আক্রান্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে হাম রোগ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় টিকার মজুত না থাকা, মাঠ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকট, জনবল ঘাটতি এবং নজরদারির অভাবকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়মিত বিশেষ টিকার ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং রুটিন কার্যক্রমে ১০ থেকে ১৫ ভাগ শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকায় ৫ বছর পর তারা বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিগত দুই সরকারের গাফিলতিতেই হাম ছড়িয়ে পড়ছে। সময়মতো হামের টিকা না দিয়ে তারা ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে। শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তিনি গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। এর আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন, দেশে ৮ বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা কর্মসূচিও হয়নি।

অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাদের সময়ে পর্যাপ্ত টিকার মজুত থাকায় বর্তমান সরকার ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান শুরু করতে পেরেছে। তবে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ আমলে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত দাবি করে স্বাস্থ্য সহকারীরা ২০২৫ সালে বেতন-গ্রেড বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি জিম্মি হয়ে পড়ে এবং মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রমে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে শনাক্তকৃত হাম রোগীদের মধ্যে ৩৪ থেকে ৬০ ভাগের বয়স ৯ মাসের কম। শরীরে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেসহোল্ড অর্জিত না হওয়া, মায়েদের কাছ থেকে যথেষ্ট ইমিউনিটি ট্রান্সফার না হওয়া এবং অপুষ্টি ও ভিটামিন ঘাটতিকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)’ আয়োজিত এক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা চলমান হামের প্রাদুর্ভাবকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, রোগের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করায় এটি এখন ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি’। সরকার চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল ও অতিরিক্ত নিয়োগ দিলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেনি।

আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রান্তিক শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাম রোধে পুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’ কার্যক্রম জোরদার, মাতৃদুগ্ধপান উৎসাহিত করা, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং টিকার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ওপর তিনি জোর দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

হামের প্রাদুর্ভাবে ২১৩ শিশুর মৃত্যু, দায়ী কারা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩০

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এক মাস তিন দিনে মোট ২১৩ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন পর্যন্ত হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২২ হাজার ৪০৯ জন, যদিও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশে হঠাৎ এই দুর্যোগ নেমে আসার পেছনে বিগত দুটি সরকার এবং বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৪০৯ জন। এই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ২৭৮ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৪ হাজার ৫২২ জন। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৩৫ জন এবং সন্দেহজনক হামে ১৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। কেবল গত ২৪ ঘণ্টাতেই নিশ্চিত হামে ৮৬ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৯৪২ জন আক্রান্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে হাম রোগ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় টিকার মজুত না থাকা, মাঠ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকট, জনবল ঘাটতি এবং নজরদারির অভাবকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়মিত বিশেষ টিকার ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং রুটিন কার্যক্রমে ১০ থেকে ১৫ ভাগ শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকায় ৫ বছর পর তারা বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিগত দুই সরকারের গাফিলতিতেই হাম ছড়িয়ে পড়ছে। সময়মতো হামের টিকা না দিয়ে তারা ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে। শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তিনি গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। এর আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন, দেশে ৮ বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা কর্মসূচিও হয়নি।

অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাদের সময়ে পর্যাপ্ত টিকার মজুত থাকায় বর্তমান সরকার ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান শুরু করতে পেরেছে। তবে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ আমলে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত দাবি করে স্বাস্থ্য সহকারীরা ২০২৫ সালে বেতন-গ্রেড বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি জিম্মি হয়ে পড়ে এবং মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রমে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে শনাক্তকৃত হাম রোগীদের মধ্যে ৩৪ থেকে ৬০ ভাগের বয়স ৯ মাসের কম। শরীরে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেসহোল্ড অর্জিত না হওয়া, মায়েদের কাছ থেকে যথেষ্ট ইমিউনিটি ট্রান্সফার না হওয়া এবং অপুষ্টি ও ভিটামিন ঘাটতিকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)’ আয়োজিত এক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা চলমান হামের প্রাদুর্ভাবকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, রোগের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করায় এটি এখন ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি’। সরকার চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল ও অতিরিক্ত নিয়োগ দিলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেনি।

আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রান্তিক শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাম রোধে পুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’ কার্যক্রম জোরদার, মাতৃদুগ্ধপান উৎসাহিত করা, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং টিকার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ওপর তিনি জোর দেন।