সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

বঙ্গোপসাগরের মরণফাঁদ

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

প্রতি বছর হাজারো মানুষ সমুদ্রপথে জীবন বাজি রেখে মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড রুটে পাচার চক্রের প্রথম ধাপটি শুরু হয় এই বন্দরনগরী থেকেই

ভাঙা তিন পায়ের একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে রহিম মিয়া (৩৪) কথা বলছিলেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা এই দিনমজুরের হাতের আঙুলগুলো এখনো কিছুটা বাঁকা- দীর্ঘদিন দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকার ক্ষত। তিনি বলেন, “নৌকায় পানি ছিল না। তিনদিন। আমরা সমুদ্রের লবণ পানি চেটে বাঁচার চেষ্টা করেছি।” মাঝপথে একটু থামলেন। তারপর আস্তে বললেন, “পাশের লোকটা মারা গেলে দালালরা তাকে পানিতে ফেলে দিল। কেউ কিছু বলতে পারিনি।”

রহিম ২০২৫ সালের মার্চে বাড়ি ফিরেছেন- হাতে কিছু নেই, মাথায় সাড়ে তিন লাখ টাকার ঋণ। মালয়েশিয়ায় ভালো কাজের স্বপ্ন দেখিয়ে এলাকার এক দালাল তাকে সমুদ্রের পথে পাঠিয়েছিল।

রহিম একা নন।

২০২৫ সালটি আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পার হওয়ার চেষ্টায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির বছর হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এই অঞ্চলে কমপক্ষে ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা মৃত হয়েছেন এবং ৬ হাজার ৫০০টিরও বেশি সমুদ্রযাত্রার চেষ্টা হয়েছে। তবে এই রুটে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরাও পাচার চক্রের শিকার হচ্ছেন।”

মৃত্যুর পথের মানচিত্র

বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে মানব পাচারে প্রধান দুটি রুট ব্যবহার হয়। একটি সমুদ্রে সরাসরি মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়ার দিকে। আরেকটি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া। দ্বিতীয় রুটটিই চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং বেশি মরণঘাতী।

এই রুটে যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রাম থেকে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন জেলা থেকে দালালরা প্রথমে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একত্র করে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে। এরপর তাদের কক্সবাজারে পাঠানো হয়। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, কাটাবনিয়া ও টেকনাফের হারিয়াখালি উপকূল থেকে ছোট মাছ ধরার নৌকায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড থেকে আসা বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তোলা হয়। উখিয়ার বদমতলি এবং চোয়াংখালি, জবাগান, ইনানি, মানখালি, রেজুব্রিজ, খোনারপাড়া ও সেপ্তখালি এই রুটে পাচারের নিরাপদ স্পট হিসেবে পরিচিত।

থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জঙ্গলের ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। সেখানে আরও দুই থেকে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে নির্যাতন, কখনো মৃত্যু।

এই পথে একজন যাত্রীর কাছ থেকে দালালরা আদায় করে আড়াই থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত। সমুদ্রে এই যাত্রা ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত চলে, কখনো দুই মাস পর্যন্তও। খাবার ও পানি থাকে ন্যূনতম। নৌকায় থাকে কয়েকশো মানুষ। যারা মারা যায় তাদের নিক্ষেপ করা হয় সমুদ্রে।

চট্টগ্রাম কেন এই চক্রের প্রবেশদ্বার

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান এই চক্রকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে এটি দেশের প্রধান বন্দরনগরী- এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের আসা-যাওয়া, তাই অপরিচিত মুখ কেউ সন্দেহ করে না। অপরদিকে কক্সবাজার থেকে এর দূরত্ব মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, বাঁশখালী, আনোয়ারা ও সন্দ্বীপের মতো উপকূলীয় উপজেলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আবাসস্থল। এখানকার মানুষের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার চল বংশপরম্পরায়। এই সামাজিক আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগায় পাচার চক্র।

হাইকোর্টের আইনজীবী মামুনুল হক চৌধুরী বলেছেন, “চট্টগ্রাম বা টেকনাফে অনেক সময় পাচারের জন্য কিছু হোস্টেল থাকে। সেখানে পাচারের শিকার মানুষদের কয়েকদিন বা সপ্তাহ রেখে পরে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে পাঠানো হয়।”

এই প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহের সময় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও বন্দর এলাকায় এরকম অন্তত দুটি অস্থায়ী আশ্রয়ের ঠিকানার সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা কক্সবাজারে পাঠানোর আগে কয়েকদিন অপেক্ষা করেন। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, এই ঠিকানাগুলো দেখতে সাধারণ ভাড়া ঘর, কিন্তু ভেতরে থাকেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ২০-৩০ জন মানুষ।

চক্রটি কীভাবে কাজ করে: সাত ধাপের মৃত্যুযাত্রা

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের একটি গবেষণায় বাংলাদেশে মানব পাচারের চারটি প্রধান পদ্ধতি চিহ্নিত করা হয়েছে: অভ্যন্তরীণ পাচার, সীমান্ত পার হয়ে স্থলপথে পাচার, সমুদ্রপথে পাচার এবং আকাশপথে পাচার। সমুদ্রপথের পাচারটি সবচেয়ে মরণঘাতী।

এই সমুদ্রপথের চক্রে প্রতিটি ধাপে আলাদা মানুষ, আলাদা দায়িত্ব- কিন্তু সবাই একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের অংশ:

প্রথম ধাপ- স্থানীয় দালাল: গ্রামপর্যায়ের মানুষ, যাকে সবাই চেনে। সে বিদেশে ভালো কাজ, মোটা বেতনের গল্প শোনায়। প্রথম অগ্রিম নেয়।

দ্বিতীয় ধাপ- চট্টগ্রামের সংগ্রহস্থল: বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষদের একত্র করে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট ঠিকানায় রাখা হয়।

তৃতীয় ধাপ- কক্সবাজারে স্থানান্তর: রাতের আঁধারে গাড়িতে কক্সবাজার।

চতুর্থ ধাপ- উপকূলের ট্রানজিট পয়েন্ট: কুতুবদিয়া বা টেকনাফের নির্দিষ্ট পয়েন্টে ছোট মাছ ধরার নৌকায় রওনা।

পঞ্চম ধাপ- বড় নৌকায় হস্তান্তর: সেন্ট মার্টিনের কাছে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড থেকে আসা বড় বোটে তোলা।

ষষ্ঠ ধাপ- থাইল্যান্ডের জঙ্গল ক্যাম্প: মুক্তিপণ, নির্যাতন।

সপ্তম ধাপ- মালয়েশিয়া: কখনো কাজ, কখনো ঋণবন্দিত্ব।

এই সাত ধাপের প্রতিটিতে টাকার লেনদেন হয়। পুরো চেইনে কোটি কোটি টাকা ঘোরে। তাছাড়া সম্প্রতি ফেসবুকও পাচারের হাতিয়ার হয়েছে। ব্র্যাকের এই গবেষণা বলছে, “অনেককেই ফেসবুকের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা হয়। এজেন্টরা ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়, ভুয়া ভিসা তৈরি করে। ভুক্তভোগীরা ফিরে এসে মামলা করলেও প্রকৃত পাচারকারী, যারা বিদেশে থাকে, তারা কখনো ধরা পড়ে না।”

সালেহার গল্প: পরিবার যা আর আগের মতো নেই

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এক ছোট গ্রামে সালেহা বেগম (২৮) তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন। তার স্বামী আলম (৩৬) গত বছর দালালের কথায় মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য সমুদ্রপথে রওনা হয়েছিলেন। তিনি আর ফেরেননি।

“শেষে একটা ফোন এসেছিল। অচেনা নম্বর থেকে। বলল, নৌকা ডুবে গেছে। আলম পানিতে পড়েছে।” সালেহার গলা কাঁপে। “তারপর থেকে ওই নম্বরে কল দিই- বন্ধ।”

সালেহার স্বামীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এলাকার সেলিম নামের এক ব্যক্তি, যে নিজেকে “ভিসা এজেন্ট” বলে পরিচয় দেয়। পরিবার তার হাতে তিন লাখ টাকা তুলে দিয়েছিল- পুরোটাই ধার করা। ঋণদাতা প্রতি মাসে আসেন।

এই প্রতিবেদনের জন্য সেলিমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তিনি বলেন, “আমি কোনো বিদেশ পাঠানোর কাজ করি না।” কিন্তু যখন আলমের নাম বলা হয়, তিনি ফোন রেখে দেন। পরে আর ফোন তোলেননি।

সালেহার মতো পরিবারের সংখ্যা নিয়ে ব্র্যাকের তথ্য বলছে: “ফেরত আসা অভিবাসীদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি হতে পারে। কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে, কেউ শারীরিক জটিলতা নিয়ে ফেরেন। অনেকে জটিল সমস্যায় পড়েন।”

সংখ্যায় ভয়াবহতা: রাষ্ট্রের সাড়া অপ্রতুল

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হয়ে ১ হাজার ৮৯১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৭৫ এবং ২০২২ সালে ছিল ৬ হাজার ২৯- মাত্র কয়েক বছরে কী বিপুল সংখ্যা।

কক্সবাজার জেলায় গত বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর- মাত্র তিন মাসে ৮৬টি মানবপাচারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে সারা দেশে ১৩৭টি মানব পাচারের মামলা দায়ের হয়েছে, যার ৪৪ শতাংশ ভুক্তভোগীই কক্সবাজার জেলার। ২২০২৪ সালে পাচারের উদ্দেশ্যে ১৫০টি বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় ৬৫৭ জনের বেশি রোহিঙ্গা মারা গেছেন।

মামলা হচ্ছে, কিন্তু বিচার হচ্ছে না- এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। দ্য ডেইলি স্টারের একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ২৪৫টি মামলার মধ্যে ২৩৬টিতে আসামিরা খালাস পেয়েছেন- মুক্তি পেয়েছেন ৮৫৭ জন অভিযুক্ত। ২০২৪ সালে ৩৬৩টির মধ্যে ৩৪২টি মামলায় খালাস, মুক্তি পেয়েছেন ১ হাজার ২৫০ জন। ২০২৩ সালে ৪৩৬টির মধ্যে ৪১৫টি মামলায় খালাস পেয়েছেন ১ হাজার ৬১৭ জন।

এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, পাচারকারীরা কেন সাহস করে এই কাজ করতে পারছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান সরাসরি বলেছেন, “অনিয়মিত পথে বাংলাদেশ ছাড়ার মরিয়া চেষ্টা অব্যাহত আছে, অথচ রাষ্ট্রের সাড়া অনেক পিছিয়ে আছে। পাচারের বিরুদ্ধে কোনো ট্রাফিকারকে বিচারের মুখে আনা না হওয়ায় নেটওয়ার্ক আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।”

ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি মামলায় ৭১ জন পাচারকারীর বিরুদ্ধে সাজা হয়েছে।

আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের ট্রাফিকিং ইন পার্সন্স রিপোর্ট এবং ইউরোপীয় আশ্রয় সংস্থা ইইউএএ-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘের ইউএনওডিসি ২০২৫ সালে নিশ্চিত করেছে: আর্থ-সামাজিক দুর্দশা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে সস্তা শ্রমের চাহিদা বাংলাদেশিদের পাচার ও চোরাচালানের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ গ্লোবাল স্লেভারি ইন্ডেক্স ২০২৩ অনুযায়ী, বিশ্বে ১৬০টি দেশের মধ্যে ৫৬তম এবং এশিয়া-প্যাসিফিকে ২৭টি দেশের মধ্যে ৯তম স্থানে রয়েছে ‘আধুনিক দাসত্বের’ প্রকোপে।

বৈধ পথ বন্ধ থাকায় ভিড় বাড়ছে মৃত্যুর রুটে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ মোট ৩৩.৩৩ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে- এটি সর্বকালের রেকর্ড। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশির বিদেশে শ্রম দেওয়ার গল্প।

কিন্তু এই স্বপ্নের পথ সবার জন্য সমান নয়। মালয়েশিয়া বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত বা সীমিত করেছে। বৈধ পথে যেতে না পেরে দরিদ্র মানুষ অবৈধ পথ বেছে নেন। আর সেই সুযোগটিই কাজে লাগায় পাচার চক্র।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়া স্থগিত থাকায় গ্রামের তরুণরা মৃত্যুঝুঁকির পথেই যাচ্ছেন। সমুদ্রযাত্রা, থাইল্যান্ডের জঙ্গল ক্যাম্প আর দালালের শোষণ- এটাই এখন তাদের একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মালয়েশিয়া প্রসঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান সরাসরি বলেছেন, “শুধু মামলা করা ও কিছু মানুষকে গ্রেফতার করে মালয়েশিয়ায় চিঠি পাঠানো কোনো কাজে আসবে না। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকার মিলে তদন্ত করতে হবে, কতজন বাংলাদেশি চাকরির নামে প্রতারিত ও শোষণের শিকার হয়েছেন। মালয়েশিয়ায় নতুন নিয়োগ শুরুর আগে, উভয় দেশে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা যে কোনো সত্তার তদন্ত হওয়া উচিত।”

এছাড়া ব্র্যাকের নভেম্বর ২০২৫ সালের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করা হয়েছে, নেপাল হয়ে কানাডা ও ইউরোপ পাঠানোর নামে একটি পাচার চক্র বাংলাদেশি তরুণদের ফাঁদে ফেলছে। নেপালে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে পরিবার থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

কেউ বলছে না: কারা ধরা পড়ছে না

চলতি বছরের জানুয়ারিতে টেকনাফের বাহারছড়া উপকূলে নৌবাহিনীর অভিযানে এক পাচারকারীসহ ১৮ জনকে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, ধরা পড়া ব্যক্তিরা মূলত সিন্ডিকেটের নিচুস্তরের চালক বা রক্ষক। মূল মস্তিষ্করা ধরা পড়ে না, কারণ তাদের রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষা।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ওকাপ চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেছেন, “বৈধ অভিবাসীরাও পাচারের শিকার হচ্ছেন, অথচ তারা কোনো আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না। কিছু সরকারি কর্মকর্তা পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। যে নেটওয়ার্কে রক্ষকরাই অন্তর্ভুক্ত, তার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করবেন?”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “মানব পাচারের বিরুদ্ধে আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সিন্ডিকেটের মাথাদের বিচার হচ্ছে, নিচের স্তরের গ্রেফতার শুধু পরিসংখ্যান পূরণ করে।”

বিএমইটি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসে ২১৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে, মাত্র ১৬১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকিগুলো ঝুলে থাকে- আর এই অনিষ্পত্তির সুযোগ নেয় পাচার চক্র।

সমাধানের কথা

নভেম্বর ২০২৫-এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫”-এর খসড়া প্রকাশ করে জনমত চাওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশটি এখন চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায়। ব্র্যাকের শরিফুল হাসান এই আইনি পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলছেন, কিন্তু সতর্ক করছেন: “কাগজে আইন থাকলে কাজ হয় না। বিশেষত যেসব সম্প্রদায়ের মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন, সেখানে টেকসই সচেতনতামূলক কার্যক্রম দরকার।”

তিনি আরও বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে সমাধান কোথায়: “সমাধান হলো শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশেই অর্থনৈতিক সুযোগ, শুধু গ্রেফতার ও বিতাড়ন নয়।”

আইওএম বাংলাদেশে “BdeshJaatra” অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে। বিএমইটি-এর হটলাইন নম্বর ১৬৩৫৭-তে ফোন করে বৈধ অভিবাসন বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া সম্ভব।

রহিম এখন

রহিম মিয়া এখন সীতাকুণ্ডে দিনমজুরি করেন। ঋণ শোধ হয়নি। মেয়ে স্কুল যাচ্ছে না- ফি দেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, “যদি জানতাম, যেতাম না। কিন্তু গরিব মানুষকে তো বোঝানো হয়- এই পথেই মুক্তি।”

মুক্তির পথে মৃত্যু আসবে- এটা তাকে কেউ বলেনি।

দ্বিতীয় পর্ব: ‘আমার স্বামীকে একইভাবে পাঠিয়েছিল, ছেলেকে যেতে দেব না’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

বঙ্গোপসাগরের মরণফাঁদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:২০

প্রতি বছর হাজারো মানুষ সমুদ্রপথে জীবন বাজি রেখে মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড রুটে পাচার চক্রের প্রথম ধাপটি শুরু হয় এই বন্দরনগরী থেকেই

ভাঙা তিন পায়ের একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে রহিম মিয়া (৩৪) কথা বলছিলেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা এই দিনমজুরের হাতের আঙুলগুলো এখনো কিছুটা বাঁকা- দীর্ঘদিন দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকার ক্ষত। তিনি বলেন, “নৌকায় পানি ছিল না। তিনদিন। আমরা সমুদ্রের লবণ পানি চেটে বাঁচার চেষ্টা করেছি।” মাঝপথে একটু থামলেন। তারপর আস্তে বললেন, “পাশের লোকটা মারা গেলে দালালরা তাকে পানিতে ফেলে দিল। কেউ কিছু বলতে পারিনি।”

রহিম ২০২৫ সালের মার্চে বাড়ি ফিরেছেন- হাতে কিছু নেই, মাথায় সাড়ে তিন লাখ টাকার ঋণ। মালয়েশিয়ায় ভালো কাজের স্বপ্ন দেখিয়ে এলাকার এক দালাল তাকে সমুদ্রের পথে পাঠিয়েছিল।

রহিম একা নন।

২০২৫ সালটি আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পার হওয়ার চেষ্টায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির বছর হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এই অঞ্চলে কমপক্ষে ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা মৃত হয়েছেন এবং ৬ হাজার ৫০০টিরও বেশি সমুদ্রযাত্রার চেষ্টা হয়েছে। তবে এই রুটে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরাও পাচার চক্রের শিকার হচ্ছেন।”

মৃত্যুর পথের মানচিত্র

বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে মানব পাচারে প্রধান দুটি রুট ব্যবহার হয়। একটি সমুদ্রে সরাসরি মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়ার দিকে। আরেকটি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া। দ্বিতীয় রুটটিই চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং বেশি মরণঘাতী।

এই রুটে যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রাম থেকে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন জেলা থেকে দালালরা প্রথমে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একত্র করে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে। এরপর তাদের কক্সবাজারে পাঠানো হয়। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, কাটাবনিয়া ও টেকনাফের হারিয়াখালি উপকূল থেকে ছোট মাছ ধরার নৌকায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড থেকে আসা বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তোলা হয়। উখিয়ার বদমতলি এবং চোয়াংখালি, জবাগান, ইনানি, মানখালি, রেজুব্রিজ, খোনারপাড়া ও সেপ্তখালি এই রুটে পাচারের নিরাপদ স্পট হিসেবে পরিচিত।

থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জঙ্গলের ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। সেখানে আরও দুই থেকে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে নির্যাতন, কখনো মৃত্যু।

এই পথে একজন যাত্রীর কাছ থেকে দালালরা আদায় করে আড়াই থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত। সমুদ্রে এই যাত্রা ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত চলে, কখনো দুই মাস পর্যন্তও। খাবার ও পানি থাকে ন্যূনতম। নৌকায় থাকে কয়েকশো মানুষ। যারা মারা যায় তাদের নিক্ষেপ করা হয় সমুদ্রে।

চট্টগ্রাম কেন এই চক্রের প্রবেশদ্বার

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান এই চক্রকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে এটি দেশের প্রধান বন্দরনগরী- এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের আসা-যাওয়া, তাই অপরিচিত মুখ কেউ সন্দেহ করে না। অপরদিকে কক্সবাজার থেকে এর দূরত্ব মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, বাঁশখালী, আনোয়ারা ও সন্দ্বীপের মতো উপকূলীয় উপজেলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আবাসস্থল। এখানকার মানুষের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার চল বংশপরম্পরায়। এই সামাজিক আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগায় পাচার চক্র।

হাইকোর্টের আইনজীবী মামুনুল হক চৌধুরী বলেছেন, “চট্টগ্রাম বা টেকনাফে অনেক সময় পাচারের জন্য কিছু হোস্টেল থাকে। সেখানে পাচারের শিকার মানুষদের কয়েকদিন বা সপ্তাহ রেখে পরে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে পাঠানো হয়।”

এই প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহের সময় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও বন্দর এলাকায় এরকম অন্তত দুটি অস্থায়ী আশ্রয়ের ঠিকানার সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা কক্সবাজারে পাঠানোর আগে কয়েকদিন অপেক্ষা করেন। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, এই ঠিকানাগুলো দেখতে সাধারণ ভাড়া ঘর, কিন্তু ভেতরে থাকেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ২০-৩০ জন মানুষ।

চক্রটি কীভাবে কাজ করে: সাত ধাপের মৃত্যুযাত্রা

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের একটি গবেষণায় বাংলাদেশে মানব পাচারের চারটি প্রধান পদ্ধতি চিহ্নিত করা হয়েছে: অভ্যন্তরীণ পাচার, সীমান্ত পার হয়ে স্থলপথে পাচার, সমুদ্রপথে পাচার এবং আকাশপথে পাচার। সমুদ্রপথের পাচারটি সবচেয়ে মরণঘাতী।

এই সমুদ্রপথের চক্রে প্রতিটি ধাপে আলাদা মানুষ, আলাদা দায়িত্ব- কিন্তু সবাই একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের অংশ:

প্রথম ধাপ- স্থানীয় দালাল: গ্রামপর্যায়ের মানুষ, যাকে সবাই চেনে। সে বিদেশে ভালো কাজ, মোটা বেতনের গল্প শোনায়। প্রথম অগ্রিম নেয়।

দ্বিতীয় ধাপ- চট্টগ্রামের সংগ্রহস্থল: বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষদের একত্র করে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট ঠিকানায় রাখা হয়।

তৃতীয় ধাপ- কক্সবাজারে স্থানান্তর: রাতের আঁধারে গাড়িতে কক্সবাজার।

চতুর্থ ধাপ- উপকূলের ট্রানজিট পয়েন্ট: কুতুবদিয়া বা টেকনাফের নির্দিষ্ট পয়েন্টে ছোট মাছ ধরার নৌকায় রওনা।

পঞ্চম ধাপ- বড় নৌকায় হস্তান্তর: সেন্ট মার্টিনের কাছে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড থেকে আসা বড় বোটে তোলা।

ষষ্ঠ ধাপ- থাইল্যান্ডের জঙ্গল ক্যাম্প: মুক্তিপণ, নির্যাতন।

সপ্তম ধাপ- মালয়েশিয়া: কখনো কাজ, কখনো ঋণবন্দিত্ব।

এই সাত ধাপের প্রতিটিতে টাকার লেনদেন হয়। পুরো চেইনে কোটি কোটি টাকা ঘোরে। তাছাড়া সম্প্রতি ফেসবুকও পাচারের হাতিয়ার হয়েছে। ব্র্যাকের এই গবেষণা বলছে, “অনেককেই ফেসবুকের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা হয়। এজেন্টরা ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়, ভুয়া ভিসা তৈরি করে। ভুক্তভোগীরা ফিরে এসে মামলা করলেও প্রকৃত পাচারকারী, যারা বিদেশে থাকে, তারা কখনো ধরা পড়ে না।”

সালেহার গল্প: পরিবার যা আর আগের মতো নেই

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এক ছোট গ্রামে সালেহা বেগম (২৮) তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন। তার স্বামী আলম (৩৬) গত বছর দালালের কথায় মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য সমুদ্রপথে রওনা হয়েছিলেন। তিনি আর ফেরেননি।

“শেষে একটা ফোন এসেছিল। অচেনা নম্বর থেকে। বলল, নৌকা ডুবে গেছে। আলম পানিতে পড়েছে।” সালেহার গলা কাঁপে। “তারপর থেকে ওই নম্বরে কল দিই- বন্ধ।”

সালেহার স্বামীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এলাকার সেলিম নামের এক ব্যক্তি, যে নিজেকে “ভিসা এজেন্ট” বলে পরিচয় দেয়। পরিবার তার হাতে তিন লাখ টাকা তুলে দিয়েছিল- পুরোটাই ধার করা। ঋণদাতা প্রতি মাসে আসেন।

এই প্রতিবেদনের জন্য সেলিমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তিনি বলেন, “আমি কোনো বিদেশ পাঠানোর কাজ করি না।” কিন্তু যখন আলমের নাম বলা হয়, তিনি ফোন রেখে দেন। পরে আর ফোন তোলেননি।

সালেহার মতো পরিবারের সংখ্যা নিয়ে ব্র্যাকের তথ্য বলছে: “ফেরত আসা অভিবাসীদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি হতে পারে। কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে, কেউ শারীরিক জটিলতা নিয়ে ফেরেন। অনেকে জটিল সমস্যায় পড়েন।”

সংখ্যায় ভয়াবহতা: রাষ্ট্রের সাড়া অপ্রতুল

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হয়ে ১ হাজার ৮৯১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৭৫ এবং ২০২২ সালে ছিল ৬ হাজার ২৯- মাত্র কয়েক বছরে কী বিপুল সংখ্যা।

কক্সবাজার জেলায় গত বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর- মাত্র তিন মাসে ৮৬টি মানবপাচারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে সারা দেশে ১৩৭টি মানব পাচারের মামলা দায়ের হয়েছে, যার ৪৪ শতাংশ ভুক্তভোগীই কক্সবাজার জেলার। ২২০২৪ সালে পাচারের উদ্দেশ্যে ১৫০টি বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় ৬৫৭ জনের বেশি রোহিঙ্গা মারা গেছেন।

মামলা হচ্ছে, কিন্তু বিচার হচ্ছে না- এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। দ্য ডেইলি স্টারের একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ২৪৫টি মামলার মধ্যে ২৩৬টিতে আসামিরা খালাস পেয়েছেন- মুক্তি পেয়েছেন ৮৫৭ জন অভিযুক্ত। ২০২৪ সালে ৩৬৩টির মধ্যে ৩৪২টি মামলায় খালাস, মুক্তি পেয়েছেন ১ হাজার ২৫০ জন। ২০২৩ সালে ৪৩৬টির মধ্যে ৪১৫টি মামলায় খালাস পেয়েছেন ১ হাজার ৬১৭ জন।

এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, পাচারকারীরা কেন সাহস করে এই কাজ করতে পারছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান সরাসরি বলেছেন, “অনিয়মিত পথে বাংলাদেশ ছাড়ার মরিয়া চেষ্টা অব্যাহত আছে, অথচ রাষ্ট্রের সাড়া অনেক পিছিয়ে আছে। পাচারের বিরুদ্ধে কোনো ট্রাফিকারকে বিচারের মুখে আনা না হওয়ায় নেটওয়ার্ক আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।”

ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি মামলায় ৭১ জন পাচারকারীর বিরুদ্ধে সাজা হয়েছে।

আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের ট্রাফিকিং ইন পার্সন্স রিপোর্ট এবং ইউরোপীয় আশ্রয় সংস্থা ইইউএএ-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘের ইউএনওডিসি ২০২৫ সালে নিশ্চিত করেছে: আর্থ-সামাজিক দুর্দশা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে সস্তা শ্রমের চাহিদা বাংলাদেশিদের পাচার ও চোরাচালানের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ গ্লোবাল স্লেভারি ইন্ডেক্স ২০২৩ অনুযায়ী, বিশ্বে ১৬০টি দেশের মধ্যে ৫৬তম এবং এশিয়া-প্যাসিফিকে ২৭টি দেশের মধ্যে ৯তম স্থানে রয়েছে ‘আধুনিক দাসত্বের’ প্রকোপে।

বৈধ পথ বন্ধ থাকায় ভিড় বাড়ছে মৃত্যুর রুটে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ মোট ৩৩.৩৩ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে- এটি সর্বকালের রেকর্ড। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশির বিদেশে শ্রম দেওয়ার গল্প।

কিন্তু এই স্বপ্নের পথ সবার জন্য সমান নয়। মালয়েশিয়া বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত বা সীমিত করেছে। বৈধ পথে যেতে না পেরে দরিদ্র মানুষ অবৈধ পথ বেছে নেন। আর সেই সুযোগটিই কাজে লাগায় পাচার চক্র।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়া স্থগিত থাকায় গ্রামের তরুণরা মৃত্যুঝুঁকির পথেই যাচ্ছেন। সমুদ্রযাত্রা, থাইল্যান্ডের জঙ্গল ক্যাম্প আর দালালের শোষণ- এটাই এখন তাদের একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মালয়েশিয়া প্রসঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান সরাসরি বলেছেন, “শুধু মামলা করা ও কিছু মানুষকে গ্রেফতার করে মালয়েশিয়ায় চিঠি পাঠানো কোনো কাজে আসবে না। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকার মিলে তদন্ত করতে হবে, কতজন বাংলাদেশি চাকরির নামে প্রতারিত ও শোষণের শিকার হয়েছেন। মালয়েশিয়ায় নতুন নিয়োগ শুরুর আগে, উভয় দেশে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা যে কোনো সত্তার তদন্ত হওয়া উচিত।”

এছাড়া ব্র্যাকের নভেম্বর ২০২৫ সালের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করা হয়েছে, নেপাল হয়ে কানাডা ও ইউরোপ পাঠানোর নামে একটি পাচার চক্র বাংলাদেশি তরুণদের ফাঁদে ফেলছে। নেপালে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে পরিবার থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

কেউ বলছে না: কারা ধরা পড়ছে না

চলতি বছরের জানুয়ারিতে টেকনাফের বাহারছড়া উপকূলে নৌবাহিনীর অভিযানে এক পাচারকারীসহ ১৮ জনকে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, ধরা পড়া ব্যক্তিরা মূলত সিন্ডিকেটের নিচুস্তরের চালক বা রক্ষক। মূল মস্তিষ্করা ধরা পড়ে না, কারণ তাদের রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষা।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ওকাপ চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেছেন, “বৈধ অভিবাসীরাও পাচারের শিকার হচ্ছেন, অথচ তারা কোনো আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না। কিছু সরকারি কর্মকর্তা পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। যে নেটওয়ার্কে রক্ষকরাই অন্তর্ভুক্ত, তার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করবেন?”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “মানব পাচারের বিরুদ্ধে আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সিন্ডিকেটের মাথাদের বিচার হচ্ছে, নিচের স্তরের গ্রেফতার শুধু পরিসংখ্যান পূরণ করে।”

বিএমইটি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসে ২১৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে, মাত্র ১৬১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকিগুলো ঝুলে থাকে- আর এই অনিষ্পত্তির সুযোগ নেয় পাচার চক্র।

সমাধানের কথা

নভেম্বর ২০২৫-এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫”-এর খসড়া প্রকাশ করে জনমত চাওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশটি এখন চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায়। ব্র্যাকের শরিফুল হাসান এই আইনি পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলছেন, কিন্তু সতর্ক করছেন: “কাগজে আইন থাকলে কাজ হয় না। বিশেষত যেসব সম্প্রদায়ের মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন, সেখানে টেকসই সচেতনতামূলক কার্যক্রম দরকার।”

তিনি আরও বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে সমাধান কোথায়: “সমাধান হলো শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশেই অর্থনৈতিক সুযোগ, শুধু গ্রেফতার ও বিতাড়ন নয়।”

আইওএম বাংলাদেশে “BdeshJaatra” অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে। বিএমইটি-এর হটলাইন নম্বর ১৬৩৫৭-তে ফোন করে বৈধ অভিবাসন বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া সম্ভব।

রহিম এখন

রহিম মিয়া এখন সীতাকুণ্ডে দিনমজুরি করেন। ঋণ শোধ হয়নি। মেয়ে স্কুল যাচ্ছে না- ফি দেওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, “যদি জানতাম, যেতাম না। কিন্তু গরিব মানুষকে তো বোঝানো হয়- এই পথেই মুক্তি।”

মুক্তির পথে মৃত্যু আসবে- এটা তাকে কেউ বলেনি।

দ্বিতীয় পর্ব: ‘আমার স্বামীকে একইভাবে পাঠিয়েছিল, ছেলেকে যেতে দেব না’