সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

‘আমার স্বামীকে একইভাবে পাঠিয়েছিল, ছেলেকে যেতে দেব না’

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

ঋণের চক্র, দুর্বল প্রশাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি- তিনটি মিলে গড়ে তুলেছে পাচারের এক অপ্রতিরোধ্য দুর্গ; কিন্তু সমাধানের পথও আছে।

রেনু বেগম (৪২) রাতে ঘুমাতে পারেন না। তার স্বামী জাকির হোসেন গত বছর মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে সমুদ্রে হারিয়ে গেছেন। হাতে আছে তিন লাখ টাকার ঋণ- সুদে-আসলে এখন পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। মহাজন প্রতি মাসে আসেন।

আর ইদানিং আরেকটা ভয় যোগ হয়েছে- তার ১৯ বছরের ছেলে রাহাতকেও এলাকার সেই পরিচিত দালাল ভিড়াতে চাইছে। “মালয়েশিয়ায় পাঠাব, টাকা পাঠালে তোমার ঋণ শোধ হয়ে যাবে”- একই কথা, একই প্রলোভন।

“ওরা কি ভাবে আমি আর জানি না?” রেনু বেগমের চোখ লাল হয়ে ওঠে। “আমার স্বামীকে একইভাবে পাঠিয়েছিল।”

রেনু বেগম চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার একটি উপকূলীয় গ্রামের মানুষ। তার গল্প বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের প্রতিচ্ছবি। প্রথমবার গেলেন স্বামী- মারা গেলেন বা ফিরলেন ঋণ নিয়ে। তারপর একই চক্র পরের প্রজন্মকে ধরতে আসে।

যে চক্র থামছে না: ফেরত আসা মানুষের অদৃশ্য কান্না

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৮৯১ জন প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ২৯, পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ।

কিন্তু এই সরকারি সংখ্যা প্রকৃত বাস্তবের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান সাবধান করেছেন, “ফেরত আসা অভিবাসীদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি হতে পারে। কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে, কেউ শারীরিক জটিলতা নিয়ে ফেরেন, কেউ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। অনেকে অত্যন্ত জটিল সমস্যায় পড়েন।”

ব্র্যাকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, গত ছয় বছরে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, শোষণ ও কষ্টের মুখে পড়ে ৪ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন, এর মধ্যে শুধু নারীই ছিলেন ৬৭ হাজার ১৯৯ জন। এই মানুষগুলো ফিরে আসেন নীরবে। কেউ লজ্জায় মুখ খোলেন না।

শরিফুল হাসান এই সামাজিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন: “অনেক ফেরত আসা অভিবাসী সামাজিক কলঙ্কের শিকার হন এবং কর্মসংস্থান পেতে মারাত্মক কষ্ট করেন, এটি তাদের সমাজে পুনরায় মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে অনেক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক করে তোলে।”

ঋণের ফাঁদে দ্বিতীয় জীবন: পাচারের ব্যবসায়িক মডেল

যারা ফেরেন, তাদের বেশিরভাগই ফেরেন ঋণগ্রস্ত হয়ে। বিদেশ যাওয়ার জন্য দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার করেছিলেন। ফিরে এসে সেই ঋণ শোধ করার চাপে তারা আবার যাওয়ার চেষ্টা করেন। আর তখনই পাচার চক্র দ্বিতীয়বার তাদের ধরে।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে কাজ করা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাঠকর্মী আজহাদুল ইসলাম বলেন, “আমরা দেখেছি, একই ব্যক্তি দুইবার বা তিনবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রতিবার আরও বেশি ঋণ করে, আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথে।”

তিনি আরও বলেন, “ঋণ পরিশোধের চাপ এবং ‘বিফলে যাওয়ার লজ্জা’- এই দুটো মিলে মানুষকে আবার সেই পথে ঠেলে দেয়। আর দালালরা ঠিক এই মুহূর্তটার অপেক্ষায় থাকে।”

এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পিত। পাচার চক্রের ব্যবসায়িক মডেলই হলো ঋণবন্দীত্ব তৈরি করা এবং সেই ঋণকে নতুন ফাঁদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা।

এই ভয়ঙ্কর চক্র আরও স্পষ্ট হয় ব্র্যাকের তথ্যে: গত দশ বছরে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসীকে বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এদের প্রায় সকলেই অনথিভুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। “তাদের পুনর্মিলন টেকসই করতে হলে মানসিক স্বাস্থ্য এবং বিদেশে অর্জিত দক্ষতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।”

চট্টগ্রামে ‘সেফ হাউস’: পাচারের অদৃশ্য স্টপওভার

এই অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরের বেশ কিছু এলাকায়, বিশেষত বন্দর-সংলগ্ন এলাকায় কথিত “সেফ হাউস” বা অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এখানে কয়েকদিন রাখা হয় কক্সবাজারে পাঠানোর আগে।

আইনজীবী মামুনুল হক চৌধুরী বলেছেন, “আগে পাচারকারীরা দাবি করতেন ‘আমি পাচারকারী না’। এখন নতুন অধ্যাদেশে এই উপায় বন্ধ হবে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সেফ হাউসগুলো শনাক্ত করার কাজ কি হচ্ছে?

এই প্রশ্ন নিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানার এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট তথ্য এখন হাতে নেই।”

থানার কাছে তথ্য নেই- অথচ স্থানীয় মানুষ কিছুটা জানেন। এই ব্যবধানটিই পাচার চক্রকে নিরাপদ রাখে।

নতুন অধ্যাদেশের খসড়া: ৯৫ শতাংশ খালাসের দেশে নতুন আইনের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

নভেম্বর ২০২৫-এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫”-এর খসড়া জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে। মন্তব্য জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল ১৯ নভেম্বর ২০২৫। অধ্যাদেশটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়।

কিন্তু এই আইনের আশার আলো বোঝার আগে একটি ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান দেখা দরকার।

দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধান বলছে, ২০২৫ সালে মানব পাচারের ২৪৫টি নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ২৩৬টিতেই আসামিরা খালাস পেয়েছেন- মুক্তি পেয়েছেন ৮৫৭ জন অভিযুক্ত। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ১৪১টির মধ্যে ১৩২টি মামলায় খালাস, মুক্তি পেয়েছেন ৫৩৫ জন। এই বছরই ৯৫ শতাংশেরও বেশি মামলায় আসামিরা বেকসুর খালাস।

আদালতের ভেতরে কী হচ্ছে? মানব পাচার ট্রাইব্যুনালের একজন স্টেনোগ্রাফার ফয়সাল হোসেন স্বীকার করেছেন, “মীমাংসা হয়ে যায়। সাক্ষীরা হারিয়ে যান। প্রমাণ নষ্ট হয়। শক্ত প্রয়োগ ছাড়া রায় দেওয়া সম্ভব হয় না।”

এই ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করেছেন ব্র্যাকের শরিফুল হাসান: “পাচার মামলার বিচারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। এই মুহূর্তে পুলিশ পাচার মামলাগুলোকে তাদের মূল মনোযোগের বিষয় হিসেবে দেখে না।”

তাহলে নতুন অধ্যাদেশ কতটা কাজের? নতুন আইন প্রণয়নে কারিগরি সহায়তা দেওয়া সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বলছে, নতুন অধ্যাদেশ তদন্তকারীদের ক্ষমতা শক্তিশালী করেছে, মামলা বিচারে পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করেছে, সাক্ষী সুরক্ষা উন্নত করেছে এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ প্রত্যাহার করতে চাপ দেওয়া বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শরিফুল হাসান নতুন আইনের প্রশংসা করেছেন, কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জটির দিকে আঙুল তুলেছেন: “কাগজে আইন থাকলে কাজ হয় না। বিশেষত যেসব সম্প্রদায়ের মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন, সেখানে টেকসই সচেতনতামূলক কার্যক্রম দরকার।”

অভিবাসন গবেষণা সংস্থা রামরু-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক প্রফেসর সি.আর. আব্রার, যিনি বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন, পূর্বে এক সেমিনারে বলেছিলেন: “মনে রাখতে হবে, দেশে ও বিদেশে পাচারকারীরা একটি অত্যন্ত ক্ষমতাধর গোষ্ঠী।” এই ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়তে শুধু আইন নয়, চাই প্রকৃত রাজনৈতিক সংকল্প।

মালয়েশিয়ায় পরিস্থিতি: গন্তব্যেও কোনো নিশ্চয়তা নেই

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের ট্রাফিকিং রিপোর্ট বলছে, মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ নথিভুক্ত এবং তারও বেশি অনথিভুক্ত অভিবাসী শ্রমিক কাজ করেন। বাংলাদেশ তাদের অন্যতম প্রধান উৎস দেশ। এদের একটি বড় অংশ ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণ, কৃষি ও গৃহকর্মে নিয়োজিত।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় গৃহকর্মীদের ২৯ শতাংশ মূলত বিদেশি গৃহকর্মীরা, যারা জোরপূর্বক শ্রমের মতো পরিস্থিতিতে কাজ করেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “মালয়েশিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ও দুর্নীতি পাচারবিরোধী প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে এবং পাচারকারীদের দায়মুক্তিতে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে, যা অভিবাসী শ্রমিকদের পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।”

মালয়েশিয়ায় নভেম্বর ২০২৫-এ লংকাউইয়ের কাছে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত থেকে একটি জাহাজ থেকে উদ্ধার করা মানুষদের ছবি ভাইরাল হয়। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের।

এই পরিস্থিতিতে ব্র্যাকের শরিফুল হাসান জানিয়েছেন, “শুধু মামলা করা ও কিছু মানুষকে গ্রেফতার করে মালয়েশিয়ায় চিঠি পাঠানো কোনো কাজে আসবে না। বাংলাদেশ সরকারকে মালয়েশিয়ার সঙ্গে মিলে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। মালয়েশিয়ায় নতুন নিয়োগ শুরুর আগে, উভয় দেশে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা যে কোনো সত্তার তদন্ত হওয়া উচিত।”

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ওকাপ চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম এই চিত্র দেখে প্রশ্ন রেখেছেন: “বৈধ অভিবাসীরাও পাচারের শিকার হচ্ছেন, অথচ তারা কোনো আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না। কিছু সরকারি কর্মকর্তা পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। যে নেটওয়ার্কে রক্ষকরাই অন্তর্ভুক্ত, তার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করবেন?”

শরিফুল হাসান আরও উদ্বিগ্ন এজন্য যে, পাচারবিরোধী কাজে যারা মাঠে আছেন, তারাও হুমকিতে পড়ছেন। তিনি বলেছেন, “আমি নিশ্চিত, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অধিকার আন্দোলনকারীদের বদনাম করতে ও দমন করতে কাজ করছে। নীতিনির্ধারকদের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা।”

ব্র্যাকের পুনর্বাসন প্রচেষ্টা: যা হচ্ছে, কিন্তু যথেষ্ট নয়

এই সংকটের মোকাবেলায় ব্র্যাক সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের অধীনে ৪০টি উপজেলায় ১০ হাজার ফেরত অভিবাসীকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন সেবা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।

শরিফুল হাসান এই প্রকল্পের লক্ষ্য সম্পর্কে বলেছেন, “ব্র্যাক শুধু বিমানবন্দরে সহায়তা করে না, ফেরত আসা মানুষ যেন আবার উঠে দাঁড়াতে পারে, উপার্জন করতে পারে এবং ভালোভাবে বাঁচতে পারে, সেজন্য আমরা তাদের পাশে থাকি।”

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ব্র্যাক চট্টগ্রামে এই সেবা সম্প্রসারিত করতে চাইছে, কারণ চট্টগ্রাম একটি উচ্চ অভিবাসনপ্রবণ ও উচ্চ রেমিটেন্স-অর্জনকারী জেলা। এই সম্প্রসারণের জন্য জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সঙ্গে সরকার-বেসরকারি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।

‘অমি প্রবাসী’ অ্যাপেও ব্র্যাক ফেরত অভিবাসীদের নিবন্ধনের সুবিধা চালু করেছে, যেখানে তারা দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী পরিষেবা পাবেন।

কিন্তু এই উদ্যোগগুলো চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে- সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, বাঁশখালী, আনোয়ারা, সন্দ্বীপে- প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রায় নেই।

সিস্টেমের তিনটি কাঠামোগত ব্যর্থতা

এই অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মানবপাচারের সমস্যা টিকে থাকার পেছনে তিনটি কাঠামোগত কারণ আছে:

প্রথম ব্যর্থতা- বৈধ পথের সংকীর্ণতা: মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ চাহিদার তুলনায় সীমিত। যখন বৈধ পথে সুযোগ কম থাকে, মানুষ অবৈধ পথে ঝোঁকেন। পাচারকারীরা ঠিক এই ফাঁকটি ব্যবহার করে।

দ্বিতীয় ব্যর্থতা- বিচারের অনুপস্থিতি: ২০২৫ সালে ৯৫ শতাংশেরও বেশি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। এই বিচারহীনতাই পাচার চক্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তৃতীয় ব্যর্থতা- ফেরত আসা শ্রমিকের পুনর্বাসনের অভাব: যারা প্রতারিত হয়ে ফিরে আসছেন, তাদের জন্য কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কর্মসূচি নেই। ঋণ পরিশোধের চাপে তারা আবার একই পথে যান।

সমাধানের পাঁচটি পথ

বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এই অনুসন্ধান পাঁচটি করণীয় চিহ্নিত করেছে:

এক- বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করতে হবে: মালয়েশিয়াসহ প্রধান শ্রমবাজারের দেশগুলোর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) কর্মসংস্থান চুক্তি বাড়াতে হবে। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে, “সমাধান হলো শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশেই অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা- শুধু গ্রেফতার ও বিতাড়ন নয়।”

দুই- পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে বিনিয়োগ করতে হবে: শুধু উদ্ধার করলে হবে না। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং ঋণমুক্তির ব্যবস্থা না করলে তারা আবার সেই ফাঁদে পড়বেন। ব্র্যাকের পুনর্বাসন মডেল সরকারি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।

তিন- স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে: শুধু ছোট আসামি গ্রেফতার নয়, সিন্ডিকেটের মূল মস্তিষ্কদের বিচার না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। ব্র্যাক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যৌথ অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে।

চার- উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে: মাদ্রাসা, স্কুল, ইউনিয়ন পরিষদ অফিস- সব জায়গায় এই বার্তা পৌঁছাতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সচেতন করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক ক্ষেত্রে পরিবারই সিদ্ধান্ত নেয়।

পাঁচ- ফেরত আসা অভিবাসীদের জন্য আলাদা সহায়তা তহবিল: সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যেখান থেকে ঋণগ্রস্ত ফেরত অভিবাসীরা স্বল্প সুদে বা বিনা সুদে ঋণ সহায়তা পাবেন যেন তারা দ্বিতীয়বার সেই পথে যেতে বাধ্য না হন।

রেনু বেগমের সংকল্প

রেনু বেগম একজন গ্রামীণ নারী, স্বামীহারা, ঋণগ্রস্ত, ভয়ের মধ্যে বাস করছেন, তবু হাল ছাড়েননি। তিনি বলেছেন, “আমার ছেলেকে যেতে দেব না।”

এই সংকল্পটুকুই হতে পারে পরিবর্তনের শুরু।

কিন্তু রেনু বেগমের মতো মানুষকে একা লড়তে হবে না, সেই নিশ্চয়তা দেওয়াই রাষ্ট্রের দায়।

বঙ্গোপসাগরের ঢেউ থামানো যাবে না। কিন্তু মানুষকে সেই ঢেউয়ে ঠেলে দেওয়ার চক্রটি থামানো যাবে, যদি সদিচ্ছা থাকে।

শেষ

প্রথম পর্ব: বঙ্গোপসাগরের মরণফাঁদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

‘আমার স্বামীকে একইভাবে পাঠিয়েছিল, ছেলেকে যেতে দেব না’

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:৩৫

ঋণের চক্র, দুর্বল প্রশাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি- তিনটি মিলে গড়ে তুলেছে পাচারের এক অপ্রতিরোধ্য দুর্গ; কিন্তু সমাধানের পথও আছে।

রেনু বেগম (৪২) রাতে ঘুমাতে পারেন না। তার স্বামী জাকির হোসেন গত বছর মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে সমুদ্রে হারিয়ে গেছেন। হাতে আছে তিন লাখ টাকার ঋণ- সুদে-আসলে এখন পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। মহাজন প্রতি মাসে আসেন।

আর ইদানিং আরেকটা ভয় যোগ হয়েছে- তার ১৯ বছরের ছেলে রাহাতকেও এলাকার সেই পরিচিত দালাল ভিড়াতে চাইছে। “মালয়েশিয়ায় পাঠাব, টাকা পাঠালে তোমার ঋণ শোধ হয়ে যাবে”- একই কথা, একই প্রলোভন।

“ওরা কি ভাবে আমি আর জানি না?” রেনু বেগমের চোখ লাল হয়ে ওঠে। “আমার স্বামীকে একইভাবে পাঠিয়েছিল।”

রেনু বেগম চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার একটি উপকূলীয় গ্রামের মানুষ। তার গল্প বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের প্রতিচ্ছবি। প্রথমবার গেলেন স্বামী- মারা গেলেন বা ফিরলেন ঋণ নিয়ে। তারপর একই চক্র পরের প্রজন্মকে ধরতে আসে।

যে চক্র থামছে না: ফেরত আসা মানুষের অদৃশ্য কান্না

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৮৯১ জন প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ২৯, পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ।

কিন্তু এই সরকারি সংখ্যা প্রকৃত বাস্তবের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান সাবধান করেছেন, “ফেরত আসা অভিবাসীদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি হতে পারে। কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে, কেউ শারীরিক জটিলতা নিয়ে ফেরেন, কেউ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। অনেকে অত্যন্ত জটিল সমস্যায় পড়েন।”

ব্র্যাকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, গত ছয় বছরে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, শোষণ ও কষ্টের মুখে পড়ে ৪ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন, এর মধ্যে শুধু নারীই ছিলেন ৬৭ হাজার ১৯৯ জন। এই মানুষগুলো ফিরে আসেন নীরবে। কেউ লজ্জায় মুখ খোলেন না।

শরিফুল হাসান এই সামাজিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন: “অনেক ফেরত আসা অভিবাসী সামাজিক কলঙ্কের শিকার হন এবং কর্মসংস্থান পেতে মারাত্মক কষ্ট করেন, এটি তাদের সমাজে পুনরায় মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে অনেক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক করে তোলে।”

ঋণের ফাঁদে দ্বিতীয় জীবন: পাচারের ব্যবসায়িক মডেল

যারা ফেরেন, তাদের বেশিরভাগই ফেরেন ঋণগ্রস্ত হয়ে। বিদেশ যাওয়ার জন্য দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার করেছিলেন। ফিরে এসে সেই ঋণ শোধ করার চাপে তারা আবার যাওয়ার চেষ্টা করেন। আর তখনই পাচার চক্র দ্বিতীয়বার তাদের ধরে।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে কাজ করা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাঠকর্মী আজহাদুল ইসলাম বলেন, “আমরা দেখেছি, একই ব্যক্তি দুইবার বা তিনবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রতিবার আরও বেশি ঋণ করে, আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথে।”

তিনি আরও বলেন, “ঋণ পরিশোধের চাপ এবং ‘বিফলে যাওয়ার লজ্জা’- এই দুটো মিলে মানুষকে আবার সেই পথে ঠেলে দেয়। আর দালালরা ঠিক এই মুহূর্তটার অপেক্ষায় থাকে।”

এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পিত। পাচার চক্রের ব্যবসায়িক মডেলই হলো ঋণবন্দীত্ব তৈরি করা এবং সেই ঋণকে নতুন ফাঁদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা।

এই ভয়ঙ্কর চক্র আরও স্পষ্ট হয় ব্র্যাকের তথ্যে: গত দশ বছরে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসীকে বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এদের প্রায় সকলেই অনথিভুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। “তাদের পুনর্মিলন টেকসই করতে হলে মানসিক স্বাস্থ্য এবং বিদেশে অর্জিত দক্ষতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।”

চট্টগ্রামে ‘সেফ হাউস’: পাচারের অদৃশ্য স্টপওভার

এই অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরের বেশ কিছু এলাকায়, বিশেষত বন্দর-সংলগ্ন এলাকায় কথিত “সেফ হাউস” বা অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এখানে কয়েকদিন রাখা হয় কক্সবাজারে পাঠানোর আগে।

আইনজীবী মামুনুল হক চৌধুরী বলেছেন, “আগে পাচারকারীরা দাবি করতেন ‘আমি পাচারকারী না’। এখন নতুন অধ্যাদেশে এই উপায় বন্ধ হবে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সেফ হাউসগুলো শনাক্ত করার কাজ কি হচ্ছে?

এই প্রশ্ন নিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানার এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট তথ্য এখন হাতে নেই।”

থানার কাছে তথ্য নেই- অথচ স্থানীয় মানুষ কিছুটা জানেন। এই ব্যবধানটিই পাচার চক্রকে নিরাপদ রাখে।

নতুন অধ্যাদেশের খসড়া: ৯৫ শতাংশ খালাসের দেশে নতুন আইনের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

নভেম্বর ২০২৫-এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫”-এর খসড়া জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে। মন্তব্য জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল ১৯ নভেম্বর ২০২৫। অধ্যাদেশটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়।

কিন্তু এই আইনের আশার আলো বোঝার আগে একটি ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান দেখা দরকার।

দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধান বলছে, ২০২৫ সালে মানব পাচারের ২৪৫টি নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ২৩৬টিতেই আসামিরা খালাস পেয়েছেন- মুক্তি পেয়েছেন ৮৫৭ জন অভিযুক্ত। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ১৪১টির মধ্যে ১৩২টি মামলায় খালাস, মুক্তি পেয়েছেন ৫৩৫ জন। এই বছরই ৯৫ শতাংশেরও বেশি মামলায় আসামিরা বেকসুর খালাস।

আদালতের ভেতরে কী হচ্ছে? মানব পাচার ট্রাইব্যুনালের একজন স্টেনোগ্রাফার ফয়সাল হোসেন স্বীকার করেছেন, “মীমাংসা হয়ে যায়। সাক্ষীরা হারিয়ে যান। প্রমাণ নষ্ট হয়। শক্ত প্রয়োগ ছাড়া রায় দেওয়া সম্ভব হয় না।”

এই ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করেছেন ব্র্যাকের শরিফুল হাসান: “পাচার মামলার বিচারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। এই মুহূর্তে পুলিশ পাচার মামলাগুলোকে তাদের মূল মনোযোগের বিষয় হিসেবে দেখে না।”

তাহলে নতুন অধ্যাদেশ কতটা কাজের? নতুন আইন প্রণয়নে কারিগরি সহায়তা দেওয়া সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বলছে, নতুন অধ্যাদেশ তদন্তকারীদের ক্ষমতা শক্তিশালী করেছে, মামলা বিচারে পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করেছে, সাক্ষী সুরক্ষা উন্নত করেছে এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ প্রত্যাহার করতে চাপ দেওয়া বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

শরিফুল হাসান নতুন আইনের প্রশংসা করেছেন, কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জটির দিকে আঙুল তুলেছেন: “কাগজে আইন থাকলে কাজ হয় না। বিশেষত যেসব সম্প্রদায়ের মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন, সেখানে টেকসই সচেতনতামূলক কার্যক্রম দরকার।”

অভিবাসন গবেষণা সংস্থা রামরু-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক প্রফেসর সি.আর. আব্রার, যিনি বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন, পূর্বে এক সেমিনারে বলেছিলেন: “মনে রাখতে হবে, দেশে ও বিদেশে পাচারকারীরা একটি অত্যন্ত ক্ষমতাধর গোষ্ঠী।” এই ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়তে শুধু আইন নয়, চাই প্রকৃত রাজনৈতিক সংকল্প।

মালয়েশিয়ায় পরিস্থিতি: গন্তব্যেও কোনো নিশ্চয়তা নেই

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের ট্রাফিকিং রিপোর্ট বলছে, মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ নথিভুক্ত এবং তারও বেশি অনথিভুক্ত অভিবাসী শ্রমিক কাজ করেন। বাংলাদেশ তাদের অন্যতম প্রধান উৎস দেশ। এদের একটি বড় অংশ ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণ, কৃষি ও গৃহকর্মে নিয়োজিত।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় গৃহকর্মীদের ২৯ শতাংশ মূলত বিদেশি গৃহকর্মীরা, যারা জোরপূর্বক শ্রমের মতো পরিস্থিতিতে কাজ করেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “মালয়েশিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ও দুর্নীতি পাচারবিরোধী প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে এবং পাচারকারীদের দায়মুক্তিতে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে, যা অভিবাসী শ্রমিকদের পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।”

মালয়েশিয়ায় নভেম্বর ২০২৫-এ লংকাউইয়ের কাছে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত থেকে একটি জাহাজ থেকে উদ্ধার করা মানুষদের ছবি ভাইরাল হয়। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের।

এই পরিস্থিতিতে ব্র্যাকের শরিফুল হাসান জানিয়েছেন, “শুধু মামলা করা ও কিছু মানুষকে গ্রেফতার করে মালয়েশিয়ায় চিঠি পাঠানো কোনো কাজে আসবে না। বাংলাদেশ সরকারকে মালয়েশিয়ার সঙ্গে মিলে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। মালয়েশিয়ায় নতুন নিয়োগ শুরুর আগে, উভয় দেশে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা যে কোনো সত্তার তদন্ত হওয়া উচিত।”

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ওকাপ চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম এই চিত্র দেখে প্রশ্ন রেখেছেন: “বৈধ অভিবাসীরাও পাচারের শিকার হচ্ছেন, অথচ তারা কোনো আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না। কিছু সরকারি কর্মকর্তা পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। যে নেটওয়ার্কে রক্ষকরাই অন্তর্ভুক্ত, তার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করবেন?”

শরিফুল হাসান আরও উদ্বিগ্ন এজন্য যে, পাচারবিরোধী কাজে যারা মাঠে আছেন, তারাও হুমকিতে পড়ছেন। তিনি বলেছেন, “আমি নিশ্চিত, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অধিকার আন্দোলনকারীদের বদনাম করতে ও দমন করতে কাজ করছে। নীতিনির্ধারকদের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা।”

ব্র্যাকের পুনর্বাসন প্রচেষ্টা: যা হচ্ছে, কিন্তু যথেষ্ট নয়

এই সংকটের মোকাবেলায় ব্র্যাক সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের অধীনে ৪০টি উপজেলায় ১০ হাজার ফেরত অভিবাসীকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন সেবা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।

শরিফুল হাসান এই প্রকল্পের লক্ষ্য সম্পর্কে বলেছেন, “ব্র্যাক শুধু বিমানবন্দরে সহায়তা করে না, ফেরত আসা মানুষ যেন আবার উঠে দাঁড়াতে পারে, উপার্জন করতে পারে এবং ভালোভাবে বাঁচতে পারে, সেজন্য আমরা তাদের পাশে থাকি।”

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ব্র্যাক চট্টগ্রামে এই সেবা সম্প্রসারিত করতে চাইছে, কারণ চট্টগ্রাম একটি উচ্চ অভিবাসনপ্রবণ ও উচ্চ রেমিটেন্স-অর্জনকারী জেলা। এই সম্প্রসারণের জন্য জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সঙ্গে সরকার-বেসরকারি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।

‘অমি প্রবাসী’ অ্যাপেও ব্র্যাক ফেরত অভিবাসীদের নিবন্ধনের সুবিধা চালু করেছে, যেখানে তারা দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী পরিষেবা পাবেন।

কিন্তু এই উদ্যোগগুলো চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে- সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, বাঁশখালী, আনোয়ারা, সন্দ্বীপে- প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রায় নেই।

সিস্টেমের তিনটি কাঠামোগত ব্যর্থতা

এই অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মানবপাচারের সমস্যা টিকে থাকার পেছনে তিনটি কাঠামোগত কারণ আছে:

প্রথম ব্যর্থতা- বৈধ পথের সংকীর্ণতা: মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ চাহিদার তুলনায় সীমিত। যখন বৈধ পথে সুযোগ কম থাকে, মানুষ অবৈধ পথে ঝোঁকেন। পাচারকারীরা ঠিক এই ফাঁকটি ব্যবহার করে।

দ্বিতীয় ব্যর্থতা- বিচারের অনুপস্থিতি: ২০২৫ সালে ৯৫ শতাংশেরও বেশি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। এই বিচারহীনতাই পাচার চক্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তৃতীয় ব্যর্থতা- ফেরত আসা শ্রমিকের পুনর্বাসনের অভাব: যারা প্রতারিত হয়ে ফিরে আসছেন, তাদের জন্য কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কর্মসূচি নেই। ঋণ পরিশোধের চাপে তারা আবার একই পথে যান।

সমাধানের পাঁচটি পথ

বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এই অনুসন্ধান পাঁচটি করণীয় চিহ্নিত করেছে:

এক- বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করতে হবে: মালয়েশিয়াসহ প্রধান শ্রমবাজারের দেশগুলোর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) কর্মসংস্থান চুক্তি বাড়াতে হবে। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে, “সমাধান হলো শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশেই অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা- শুধু গ্রেফতার ও বিতাড়ন নয়।”

দুই- পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে বিনিয়োগ করতে হবে: শুধু উদ্ধার করলে হবে না। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং ঋণমুক্তির ব্যবস্থা না করলে তারা আবার সেই ফাঁদে পড়বেন। ব্র্যাকের পুনর্বাসন মডেল সরকারি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।

তিন- স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে: শুধু ছোট আসামি গ্রেফতার নয়, সিন্ডিকেটের মূল মস্তিষ্কদের বিচার না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। ব্র্যাক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যৌথ অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে।

চার- উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে: মাদ্রাসা, স্কুল, ইউনিয়ন পরিষদ অফিস- সব জায়গায় এই বার্তা পৌঁছাতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সচেতন করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক ক্ষেত্রে পরিবারই সিদ্ধান্ত নেয়।

পাঁচ- ফেরত আসা অভিবাসীদের জন্য আলাদা সহায়তা তহবিল: সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যেখান থেকে ঋণগ্রস্ত ফেরত অভিবাসীরা স্বল্প সুদে বা বিনা সুদে ঋণ সহায়তা পাবেন যেন তারা দ্বিতীয়বার সেই পথে যেতে বাধ্য না হন।

রেনু বেগমের সংকল্প

রেনু বেগম একজন গ্রামীণ নারী, স্বামীহারা, ঋণগ্রস্ত, ভয়ের মধ্যে বাস করছেন, তবু হাল ছাড়েননি। তিনি বলেছেন, “আমার ছেলেকে যেতে দেব না।”

এই সংকল্পটুকুই হতে পারে পরিবর্তনের শুরু।

কিন্তু রেনু বেগমের মতো মানুষকে একা লড়তে হবে না, সেই নিশ্চয়তা দেওয়াই রাষ্ট্রের দায়।

বঙ্গোপসাগরের ঢেউ থামানো যাবে না। কিন্তু মানুষকে সেই ঢেউয়ে ঠেলে দেওয়ার চক্রটি থামানো যাবে, যদি সদিচ্ছা থাকে।

শেষ

প্রথম পর্ব: বঙ্গোপসাগরের মরণফাঁদ